বদরুদ্দীন উমরের ৯০ বছর পূর্ণ হলো। ৯০ বছরের এক সম্মানজনক ও সফল দীর্ঘ জীবনযাপন করে এখনো প্রাণবন্ত ও কর্মক্ষম এ বিরল ব্যক্তিত্বের প্রতি জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

বর্ধমানের যে বিখ্যাত পরিবারে ১৯৩১ সালে বদরুদ্দীন উমর জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই পরিবারে একদিকে কংগ্রেস-মুসলিম লীগের যেমন, তেমনি কমিউনিস্ট কর্মীদের নিয়মিত আনাগোনা ছিল। বদরুদ্দীন উমরের পিতা আবুল হাশিম ছিলেন মুসলিম লীগের নেতা এবং চল্লিশের দশকের শেষ দিকে বাংলার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক; আবার মনসুর হাবিবুল্লাহ, সৈয়দ শাহেদুল্লাহ, মাহবুব জায়েদীসহ বাংলার অনেক বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা বের হয়েছেন এ পরিবার থেকে। বদরুদ্দীন উমরের ওপর তার পিতার পাণ্ডিত্যের এমনকি চিন্তাভাবনারও প্রভাব ছিল। দৃষ্টিহীন আবুল হাশিমকে বই পড়ে শোনানোর দায়িত্ব ছিল তার জ্যেষ্ঠ পুত্র উমরের। ছেলেকে তিনি নিয়ে যেতেন নানা রাজনৈতিক সফরেও। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-তে কলকাতায় মুসলিম লীগের জনসভায়ও দুই পুত্রকে নিয়ে যান আবুল হাশিম। আবার বাড়ির বামপন্থী আত্মীয়-স্বজনদের প্রভাবে বর্ধমানে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক ক্লাসেও যেতেন উমর মাঝেমধ্যে।

দেশভাগের পর এক দাঙ্গায় তার বর্ধমানের বাড়িতে আগুন দিলে ক্ষুব্ধ, ব্যথিত আবুল হাশিম পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। এদিকে পিতাকে দর্শনের বই পড়ে শোনাতে শোনাতে তত দিনে উমরের দর্শনের প্রতি বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনে ভর্তি হলেন। ভাষা আন্দোলনের সময়ও পিতার প্রভাবে তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গেই তার যোগাযোগ ছিল। তরুণ উমর ভাষা আন্দোলনের ঘটনাবলি দেখেছেন কাছে থেকে। এ সময় থেকেই তার চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫৭ সালে দর্শনের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করার পর ১৯৫৯ সালে অক্সফোর্ডে দর্শন, অর্থনীতি, রাজনীতি (পিপিই) পড়তে গেলেন। সেখানে মার্ক্সবাদে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়ে ফিরে এলেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় ১৯৬৪ সালে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ প্রবন্ধ দিয়ে বদরুদ্দীন উমর প্রথম আলোচনায় আসেন। এ প্রবন্ধ নিয়ে সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির ডাকসাইটে অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সাজ্জাদ হোসাইনের সঙ্গে তরুণ উমরের বিতর্ক হয়। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে তার তিনটি গ্রন্থ ‘সাম্প্রদায়িকতা’, ‘সংস্কৃতির সংকট’ ও ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ প্রকাশিত হয়। এ বই তিনটি—যেগুলোকে একত্রে একটি ‘ট্রিলজি’ বলা যায়—পূর্ব বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূত্রপাত করে। বইগুলো জনপ্রিয় হয়েছিল এবং বইয়ে আলোচিত প্রসঙ্গগুলো তত্কালীন বিদ্বৎ সমাজে দ্বিজাতি তত্ত্ব ও সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ, বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেছিল। পাঠকের মধ্যে প্রবন্ধের বইয়ের এত ঔত্সুক্য তৈরি হওয়া একটি বিরল ঘটনা ছিল। এ বইগুলো সম্পর্কে যতীন সরকার এক জায়গায় লিখেছেন:

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এর আগে যারা লেখালেখি করতেন, তাদের প্রায় সবারই ছিল উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। উমরই প্রথম মার্ক্সবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ সন্ধান করেন। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭—এ সময়সীমায় প্রকাশিত তার প্রবন্ধগুলোরই সংকলন—‘সাম্প্রদায়িকতা’, ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘সংস্কৃতির সংকট’। এ লেখাগুলো সে সময়ে যে রকম প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, প্রবন্ধজাতীয় কোনো লেখারই সে রকম জনপ্রিয়তা এর আগে বা পরে কখনো দেখা যায়নি। যারা কেবল হালকাচালের গল্প-উপন্যাস পড়তেই অভ্যস্ত, এ রকম লোককেও এ লেখাগুলোর একান্ত অনুরাগী পাঠক হয়ে উঠতে দেখেছি। ‘বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’—উমর কথিত এ শব্দবন্ধ সেদিন জীবন্ত প্রবাদে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। উমরের লেখা অনেকের চোখ থেকেই দ্বিজাতিতত্ত্বের পর্দা অপসৃত করে ফেলেছিল, চিত্তলোকে প্রকৃত স্বাদেশিকতা ও স্বজাতীয়তার বোধ সঞ্চারিত করে দিয়েছিল।

এ সময় উমর যেমন খ্যাতিমান হয়েছেন, তেমনি এ খ্যাতি তার জন্য বিড়ম্বনাও নিয়ে এসেছে। তিনি পাকিস্তান সরকারের ও সরকার সমর্থকদের চক্ষুশূল হয়েছেন। তাকে সরানোর জন্য সরকার থেকে উপাচার্যের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ থেকেও জুমার নামাজের খুতবায় তার বিরুদ্ধে বলা হয়। এমন পরিস্থিতিতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়েই দিলেন। তখন তার জন্য একাডেমিক জীবনের চেয়ে অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ, নানা অনিশ্চয়তায় ভরা এক রাজনৈতিক জীবন অপেক্ষা করছে—যা তাকে একটি নতুন পথে চালিত করবে।

এর পর থেকে আমরা বদরুদ্দীন উমরের জীবনের দুটি ধারা সমান্তরালভাবে বহমান দেখতে পাব। এ দুই ধারা তার দুটি পরিচয় তৈরি করে। তার একটি পরিচয় একজন শ্রেষ্ঠ লেখক, গবেষক ইতিহাসবিদ, সমাজতাত্ত্বিক ও বিশিষ্ট পণ্ডিত। অন্যদিকে তিনি একজন একনিষ্ঠ মার্ক্সবাদী রাজনীতিবিদ, সংগঠক, অ্যাক্টিভিস্ট। এ দেশের প্রতিটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনে, সামরিক-শাসন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে, সব ধরনের জুলুম-নিপীড়নের বিরুদ্ধে, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে, সাম্প্রদায়িকতা-ধর্মান্ধতার বিরোধিতায় সারা জীবন মিটিং-মিছিলে তিনি যেমন মাঠে সক্রিয় থেকেছেন, তেমনি সক্রিয় থেকে তার কলম, অব্যাহত রেখেছেন, পঠন-পাঠন, নিবিড় জ্ঞানচর্চা।

তাই দেখি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ‘রাজা রামমোহন রায় স্মারক বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববোধের ওপর বক্তৃতা দেয়ার জন্য শঙ্খ ঘোষ তাকে অনুরোধ করেন; আবার ভারতের বিভিন্ন কমিউনিস্ট পার্টি আয়োজিত নানা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তৃতা দেয়ার জন্য তার ডাক পড়ে। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ আশোক মিত্রের অনুরোধে বোম্বের ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলিতে (ইপিডব্লিউ) তিনি লেখা শুরু করেন, আবার ক্লান্তিহীনভাবে মুসাবিধা করেন রাজনৈতিক দলিল, লিফলেট। ইউরোপের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বক্তৃতা করার পরের সপ্তাহেই হয়তো তিনি পাবলিক বাসে ঝুলে-দাঁড়িয়ে চলে যান দেশের কোনো শ্রমিক এলাকায় কিংবা লঞ্চের খোলা ডেকে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে চলে যান বরিশালের কোনো গ্রামে, রাত কাটান কোনো কৃষকের দাওয়ায়।

বদরুদ্দীন উমরের রাজনীতিবিদ ও লেখক পরিচয়কে আলাদা করে দেখার একটি প্রবণতা আছে। অনেকে তার লেখক পরিচয়কেই প্রধান মনে করেন এবং তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাকে এড়িয়ে যান। আবার রাজনীতি অঙ্গনের কেউ কেউ হয়তো তার রাজনৈতিক পরিচয়কে বড় করতে গিয়ে তার লেখক-পণ্ডিত পরিচয়কে খাটো করতে চান। কিন্তু বদরুদ্দীন উমরের এ দুই পরিচয় পরস্পর পরিপূরক। একটি পরিচয় ছাড়া অন্য পরিচয় অর্থপূর্ণ নয়। উমর যা-ই লেখেন, তা একটি সামাজিক রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে লেখেন। লেখক বদরুদ্দীন উমরকে তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া বোঝা যাবে না; আবার রাজনীতিবিদ হিসেবে বদরুদ্দীন উমরের অনন্যতা উপলব্ধি করা যাবে না তার পাণ্ডিত্য ও লেখক পরিচয়কে বিবেচনায় না নিয়ে।

বদরুদ্দীন উমরের অসাধারণ গবেষণা গ্রন্থ ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তত্কালীন রাজনীতি’-এর তিনটি খণ্ড সম্পর্কে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন যে, একমাত্র এই একটি বই-ই বদরুদ্দীন উমরকে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট। এটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস হিসেবে যেমন অনন্য, তেমনি সমসাময়িক রাজনীতির ইতিহাস হিসেবেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ বইয়ের যেকোনো পাঠকই উপলব্ধি করতে পারবেন যে, গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অঙ্গীকার ছাড়া এ রকম একটি অভিসন্দর্ভ রচনা করা সম্ভব নয়। এ বইয়ের জন্য তাকে দেয়া ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ তিনি কেন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বা কেন এর পরও তাকে অনেক পুরস্কার দেয়ার প্রস্তাব করা হলে তিনি সবিনয়ে সেসব প্রত্যাখ্যান করেছেন, তার উত্তরও নিহিত আছে তার রাজনৈতিক চিন্তার মধ্যে।

বদরুদ্দীন উমরের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলাদেশের কৃষক’ বাংলার কৃষক, কৃষি অর্থনীতি এবং মধ্যশ্রেণীর ওপর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা হিসেবে সমাদৃত। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ওপর কোনো পাণ্ডিত্যপূর্ণ সন্দর্ভ রচনার উদ্দেশ্যে তিনি এ বই লেখেননি। একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এ দেশের প্রগতিশীল রাজনীতিকে সাহায্য করার এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থার চরিত্র এবং কৃষকদের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করার লক্ষ্যেই তিনি বইটি লিখেছিলেন। এটি একজন মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক কর্মীর অঙ্গীকার নিয়ে একজন উচ্চাঙ্গের ইতিহাসবিদের লেখা একটি অনবদ্য গ্রন্থ।

বদরুদ্দীন উমর এ দেশে বিদ্যাসাগর চর্চার একজন পথিকৃৎ। ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ’ গ্রন্থে তিনি মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উনিশ শতকের বাংলার জাগরণ এবং এর মেরুদণ্ড কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের গড়ে ওঠা ও বিকাশের বিষয়টিকে উপস্থাপন করেন এবং এর সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করেন। বিদ্যাসাগরকে উনিশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রগতিশীল ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করলেও তাকে তিনি তার যুগের চিন্তাভাবনা দিয়ে প্রভাবিত এবং শ্রেণী স্বার্থ দিয়ে সীমাবদ্ধ একজন ব্যক্তি হিসেবেই মূল্যায়ন করেন, যা পশ্চিমবঙ্গের বিদ্বৎ সমাজে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করে।

১৯৬৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়ার পর বদরুদ্দীন উমর পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে (এমএল) যোগ দেন। এ দেশে স্বাধিকার আন্দোলন তখন তুঙ্গে। আবার পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ী আন্দোলনের তীব্র প্রভাব পড়েছে এপার বাংলার কমিউনিস্টদের ওপরও। এ উত্তাল সময়ে ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পার্টির মুখপত্র ‘গণশক্তি’ সম্পাদনার দায়িত্ব পান বদরুদ্দীন উমর। মুক্তিযুদ্ধের সময় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় এ দেশের কমিউনিস্টদের মধ্যে যুদ্ধের চরিত্র ও তাদের ভূমিকা নিয়ে নানা বিভ্রান্তির সময় উমরের রাজনৈতিক জীবনে এক নতুন পর্যায়ের শুরু হয়। এ সময় তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চীনের বিরোধিতা, নকশালবাড়ী লাইন ইত্যাদি বিষয়ে কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেন। এ পর্যায়ে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের লাইন নিয়ে বিতর্কে নিজের চিন্তাভাবনাকে অনেক সংহত রূপ দিতে শুরু করেন। কেবল রাজনৈতিক লাইন নয়, এ দেশের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ এবং এসব ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের একটি তথ্যনিষ্ঠ মূল্যায়ন আছে। এসব মূল্যায়নের সঙ্গে কেউ একমত না-ও হতে পারেন, কিন্তু সেগুলোর গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।

১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত ‘গণশক্তি’-তে প্রকাশিত তার লেখা নিয়ে প্রকাশিত ‘যুদ্ধপূর্ব বাংলাদেশ’ তত্কালীন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একইভাবে ‘যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ’-এ মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহের তাত্পর্যপূর্ণ বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। এর পর থেকে অতি সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রিকায় বদরুদ্দীন উমর নিরলসভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষণমূলক যেসব লেখা লিখে গেছেন সেগুলোতে বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মোটামুটি ধারাবাহিক একটি মূল্যায়ন পাওয়া যাবে। এগুলো ভবিষ্যতের ঐতিহাসিক-গবেষকদের খুবই উপকারে আসবে। একইভাবে উপকারে আসবে পাঁচ খণ্ডে প্রকাশিত তার বিশাল ক্যানভাসের আত্মজীবনী ‘আমার জীবন’। এ পর্যন্ত বদরুদ্দীন উমরের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১২২টি। এর অনেকগুলোই পশ্চিমবঙ্গ থেকেও প্রকাশিত হয়েছে। The Emergence of Bangladesh: Class Struggle in East Pakistan দুই খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস পাকিস্তান ও কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ভারত থেকে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়ে অনেকের কাছেই সহজে লভ্য হয়ে উঠেছে।

বদরুদ্দীন উমর সম্পর্কে এ দেশের বিখ্যাত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম এক লেখায় বলেছেন, ‘তার সব গুণের মধ্যে যেটি সবচেয়ে বড় এবং অন্য সব গুণের ভেতরে যেটি শিরদাঁড়ার মতো কাজ করে, সেটা হলো তার ‘না বলার ক্ষমতা।’ বদরুদ্দীন উমরের এ না বলার ক্ষমতাটি এসেছে তার সততা, সাহস থেকে। চারিত্রিক ঋজুতা ও দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কারণে তিনি নীতিনিষ্ঠ থেকেছেন, নানা প্রলোভন ও বৈষয়িক মোহ থেকে মুক্ত থেকে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আজ নানা প্রলোভনে, প্রাপ্তিযোগের আশায় এ দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজকে পেন্ডুলামের মতো দুলতে দেখে সোনালি কাবিনের কবি আল মাহমুদ লিখেছিলেন, ‘মগজ বিকিয়ে দিয়ে পরিতৃপ্ত পণ্ডিত সমাজ’ উদ্ধৃতিটি। প্রগতিশীল রাজনীতির মধ্যে হতাশা, বিভ্রান্তি, সুবিধাবাদের ব্যাপক বিস্তার যখন তরুণদের হতোদ্যম করে, তখন বদরুদ্দীন উমর তার প্রজ্ঞা, ঋজুতা ও অপার আশাবাদ নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোকবর্তিকার মতো বিরাজ করছেন।

 

চৌধুরী মুফাদ আহমদ: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা