বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার জরিপে বাংলাদেশে অনাবিষ্কৃত বিপুল গ্যাসসম্পদের কথা উঠে এসেছে নানা সময়ে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, সরকার কারো জরিপই বিবেচনায় নেয়নি। বরং দেশের জ্বালানি খাতকে ক্রমে ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। প্রতি ইউনিট দেশীয় গ্যাসের মূল্য যেখানে ২ থেকে ৩ ডলার, সেখানে প্রতি ইউনিট আমদানি করা গ্যাসের (এলএনজি) জন্য ব্যয় হয় ১২ ডলার (দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি) থেকে ৩৫ ডলার (স্পট মার্কেট) পর্যন্ত। এর ফলে সরকারের অর্থভান্ডারে টান পড়েছে এবং এটি তৈরি করেছে নতুন সংকট। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মক। শিল্প-কারখানায় গ্যাস রেশনিং ও লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা চলছে, যা অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমদানীকৃত গ্যাসের দাম এত বেড়েছে যে ভর্তুকি প্রদান ও দাম বাড়িয়ে সেটি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এটি সরকারের দূরদর্শিতার অভাবের বহিঃপ্রকাশ। কালবিলম্ব না করে আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য-উপাত্ত আমলে নিয়ে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

প্রশ্ন হলো, এ রকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ পড়ল কেন। বিশ্বের অন্যান্য বদ্বীপ অঞ্চলকে বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের মতো এ রকম ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক গঠনে গড়ে ওঠা অঞ্চল গ্যাসসম্পদে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার কথা। তদুপরি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত গ্যাস জরিপ প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়নেও একই মত প্রকাশিত হয়েছে। হতাশাজনক হলেও সত্য, এসব গবেষণা উপাত্ত বিবেচনায় নিয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হয়নি। ফলে যথেষ্ট মাত্রায় গ্যাস অনুসন্ধান না হওয়ার কারণে আজ গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে গ্যাসসম্পদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাপেক্ষা কম অনুসন্ধানকৃত দেশগুলোর একটি। যথেষ্ট অনুসন্ধানের মাধ্যমে ভূগর্ভে লুক্কায়িত গ্যাস উত্তোলন করলে গ্যাস সংকট থাকার কথা নয়। বর্তমানে বাংলাদেশে যে পরিমাণ গ্যাস মজুদ আছে, তা দিয়ে আনুমানিক ৯-১০ বছর চলবে। স্বাভাবিকভাবেই এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খোঁজা জরুরি। যদিও এলএনজি আমদানির মতো সাময়িক সমাধানের মাধ্যমে জরুরি চাহিদা মেটানো যায়। তবে সেটি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গ্যাসের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ব্যয়বহুল এবং এ পদ্ধতি জ্বালানি নীতির মূল ভিত্তি হতে পারে না। ২০১১ সালে পরামর্শক নিয়োগ করে তৈরি করা ‘গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিতে পরামর্শ’ প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো আমলে নেয়া প্রয়োজন। সেখানে বর্তমান কূপগুলো রক্ষণাবেক্ষণ বা ওভারহোলিং, সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারে রিস্ক বেজড পদ্ধতির ওপর জোর দিতে বলা হয়েছিল। উপকূলীয় ও পার্বত্যাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর অগ্রাধিকার দেয়ার কথাও বলা হয়েছিল। সহজ সমাধান খুঁজতে গিয়ে বাংলাদেশ ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা ও নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ নষ্ট করেছে। বাপেক্স গত ২০ বছরে মাত্র ২৮টি অনুসন্ধান কূপ খনন করেছে। যদিও বাপেক্স প্রতি তিনটি কূপ খনন করে একটিতে গ্যাস পেয়েছে, যেখানে বৈশ্বিক গড় পাঁচটিতে একটি। এমন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারাটা দুঃখজনক।

বর্তমান প্রাক্কলন অনুযায়ী দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎস থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এলএনজি আমদানির পরিমাণ বাড়বে এবং ভবিষ্যতে কোনো এক সময় এলএনজি দেশীয় গ্যাস সরবরাহের তুলনায় অধিক হয়ে পড়তে পারে। দেশের অর্থনীতি এমন আর্থিক বোঝা কতদিন সামাল দিতে পারবে, সে প্রশ্ন কেবল উদ্বেগই বাড়িয়ে তোলে। তবে এটি নিশ্চিত যে আর্থিক চাপের কারণে যদি সাময়িকভাবেও এলএনজি আমদানি বন্ধ করতে হয়, তা অনেক গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ ও শিল্প কেন্দ্রকে অন্ধকারে ফেলে দেবে। উপরিউক্ত সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার পথ একটাই এবং তা সহজতর। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে কোনো জোরালো পদক্ষেপ নেয়নি এবং এ কারণে দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের পার্থক্য কেবল বেড়েই চলেছে। অথচ ভূতাত্ত্বিক বিবেচনায় বদ্বীপ গঠিত এ দেশের গ্যাস সম্ভাবনাকে অতি উজ্জ্বল বলে বিজ্ঞানীরা মত দিয়ে এসেছেন। এর একটি প্রমাণ মেলে ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক আদালত কর্তৃক বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর মিয়ানমার তার সমুদ্র এলাকায় জোরালো অনুসন্ধানের মাধ্যমে বড় আকারের গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমায় সে তুলনায় অনুসন্ধানকাজ করেনি বললেই চলে। আর সে কারণেই দেশে এ গ্যাস সংকট। বিশ্বব্যাপী গ্যাস, তেল অনুসন্ধান কার্যকলাপের বিবেচনায় বাংলাদেশ ন্যূনতম অনুসন্ধানকৃত এলাকা হিসেবে বিবেচিত হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশকে অনতিবিলম্বে গ্যাস অনুসন্ধানে দেশব্যাপী জোরালো কার্যক্রম শুরু করে নিজস্ব গ্যাস তুলে আনতে হবে। এলএনজি আমদানি সাময়িকভাবে বর্তমান গ্যাস সরবরাহের সমস্যাকে ঠেকাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি মূল্যের অনিশ্চিত গতিবিধি দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে যাবে। গ্যাস সরবরাহের সমস্যাকে একটি টেকসই সমাধান দিতে হলে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন করাই সঠিক উপায়।

গত ২০ বছরের গ্যাস অনুসন্ধানের দুর্বল ধারাকে বদলে দিয়ে একটি জোরালো অনুসন্ধানকাজ শুরু করার মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তার পথে হাঁটতে হবে। অন্যথায় পুরোপুরিভাবে অসম্ভব ব্যয়বহুল আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হবে। এ ধরনের একটি পথ ধরে অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের কোনো কাজ হয়নি কিংবা বলা যায়, অনুসন্ধানের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বঙ্গোপসাগরের দুটি অংশ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমটি হলো গভীর সমুদ্র বা অফশোর। সমুদ্রের এ অংশকে ১৫টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো অগভীর সমুদ্র বা অনশোর। এ অংশের ১১টি ব্লক মিলিয়ে মোট ২৬টি ব্লক রয়েছে, যেখানে গ্যাস অনুসন্ধান করার কথা। কিন্তু এসব ব্লকের মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভে না থাকার কারণে বিদেশী কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানিতে আমদানিনির্ভরতার কারণে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ অকার্যকর রয়েছে। এ ১০ বছরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দেশী-বিদেশী কোনো কোম্পানিই আগ্রহ দেখায়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সও এ কাজে দক্ষতা দেখাতে পারেনি। গ্যাস ব্যবস্থাপনার একটি বড় অংশ নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে পুরনো গ্যাসক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে; নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখা যায়নি। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে চুক্তির আওতায় আমদানি করা এলএনজির পরিমাণও বাড়েনি। এ অতি আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশের জ্বালানি খাত এখন ঝুঁকিতে পড়েছে। গ্যাস সরবরাহ যথাযথ মাত্রায় না হওয়ায় শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে আর বিদ্যুেকন্দ্রগুলো পড়েছে সংকটে। সক্ষমতার এ ঘাটতিতে সরকারের ভাষ্য হলো, ‘দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবেলায় সরকারের লক্ষ্য হলো স্থানীয়ভাবে বৃহৎ আকারে অনুসন্ধান চালানো। এজন্য রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাপেক্সকে কাজে লাগানো হচ্ছে। এরই মধ্যে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। অনুসন্ধান-উত্তোলন কার্যক্রমে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বিশেষত অনশোরে অনুসন্ধান করার জন্য বাপেক্সকে উত্সাহিত করা হচ্ছে। অফশোরের জন্য দেশী-বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হচ্ছে।’ এসবই সাধারণ মানুষকে সান্ত্বনা দেয়ার প্রয়াস।

গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিবর্তে সরকার গ্যাস আমদানির অবকাঠামো নির্মাণে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। ২০১৯ সালে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। এর কাজ গত তিন বছরে শুরুই করা যায়নি। এরই মধ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীতে ৫০ কোটি ঘনফুট সরবরাহের সক্ষমতাসম্পন্ন আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ করছে পেট্রোবাংলা। এলএনজি আমদানিতে আমাদের নির্ভরতা আছে ও থাকবে। কিন্তু অতিনির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে। এ কারণে আমদানির পাশাপাশি গ্যাস অনুসন্ধানের দিকে নজর দিতে হবে বেশি। প্রাথমিক জ্বালানিতে আমাদের গত এক দশকে বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগ হয়নি। অথচ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে। এসব খাতে বিনিয়োগ করে সুফলও কম। দেশের অনেক জায়গায় গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু এসব লাইনে গ্যাস সরবরাহ করা যায়নি। অথচ এ পরিমাণ অর্থ গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিনিয়োগ করা গেলে সেখান থেকে নিশ্চিতভাবেই ফল পাওয়া যেত।

বর্তমান সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে পেট্রোবাংলাকে, যা বড় আকারের আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত। অর্থের জোগান দিতে সরকারের সাবসিডি বা অনুদান, ব্যাংকের ঋণ বা গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব কোনোটাই জুতসই বলে প্রতীয়মান হয় না। এমনকি গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (জিডিএফ) থেকে অর্থ নেয়াকে অনেকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন। কারণ এ তহবিল তৈরি করা হয়েছিল কেবল দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়নের স্বার্থে। এটি এলএনজি কেনায় খরচ করার জন্য নয়। আবার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে এর সমাধান করার চলমান প্রক্রিয়াটি কেবল এ সমস্যাকে প্রাতিষ্ঠানিক দায় থেকে নামিয়ে জনগণের ঘাড়ে এনে ফেলার শামিল। এতে সমাধান নয়, বরং সংকটের ভিন্ন মাত্রা যোগ হবে মাত্র। কারণ মহামারীর কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠী যে আর্থিক সংকটে পড়েছে, তা বাড়বে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ধারাকে চলমান রাখতে গ্যাস ও কয়লার ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে এবং নিকট ভবিষ্যতে তা আরো বাড়বে। বাংলাদেশে যথেষ্ট পরিমাণ গ্যাসসম্পদ ও কয়লাসম্পদ মাটির নিচে সঞ্চিত রয়েছে। এগুলো উত্তোলন করে নিজস্ব জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে জ্বালানি আমদানিনির্ভরশীলতা কমানোর নীতি অবলম্বন করা আবশ্যক। দেশের গ্যাসসম্পদ শেষ হয়ে যাওয়ার পথে, এ ধারণা অবৈজ্ঞানিক। এ মুহূর্তে নিজস্ব গ্যাস ও কয়লা উন্নয়নের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতের পথে ক্রমাগতভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন করার নীতি গ্রহণ করাই হবে সঠিক পদক্ষেপ।