বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি স্থান যেখানে বৈশ্বিক জ্ঞান অর্জন করা হয়। এটিকে স্কুল-কলেজের সঙ্গে তুলনা করলে চলবে না, বৈশ্বিক দিক থেকে গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বে এখন শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে চলছে? সেটি দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিচালনা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশ ও জাতির বিবেক গণ্য করা হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালে কোনো একটি দেশ বা রাষ্ট্রের পরিস্থিতি বোঝা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্ত জ্ঞানচর্চা থাকবে। এটি না থাকলে দেশ ও জাতির ভূমিকা মঙ্গলময় হয়ে উঠবে না। কারণ মুক্তচিন্তার অনুপস্থিতিতে জাতির বিবেক ঘুমন্ত থাকে, যার প্রভাব রাষ্ট্র ও জাতির ওপর পড়ে। 

বিশ্বের বিভিন্ন র‌্যাংকিংয়ে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে আছে। এটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার আগে কিছু বিষয় পর্যালোচনা করা দরকার। এ র‌্যাংকিং যে ধারা বা ক্রাইটেরিয়া অনুযায়ী করা হয়, আমাদের রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সে ধারা এখনো পরিপূর্ণ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সেভাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার সুযোগ দেয়া যাচ্ছে না। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক, বহির্বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষা নিয়ে কাজের সুযোগ—এসব বিষয়ে বাংলাদেশ যে মানের দেশ, সে জায়গা থেকে আমরা যদি এখনই মনে করি র‌্যাংকিংয়ে ৫০০ বা ২০০-এর মধ্যে প্রবেশ করব, সেটি অবাস্তব প্রত্যাশা হবে। আমাদের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রেক্ষাপট, এখনো সে জায়গায় নেই। অক্সফোর্ড, ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ক্যালটেক) অথবা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র‌্যাংকিংগুলোর শীর্ষে অবস্থান করছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে সুযোগ-সুবিধা পায় বা তাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে যে বরাদ্দ, পরিচালনাগত চৌকস নীতি এসব থেকে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছি। এ জায়গাগুলোয় আমাদের রাষ্ট্র যদি অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়, সবকিছুর ওপরে যখন শিক্ষা খাতকে স্থান দেয়া হবে তখন বিশ্ববিদ্যালয় তার স্থান আরো বেশি স্বচ্ছ জায়গায় নিয়ে যেতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয় এ কাজ যখন গুরুত্ব দিয়ে করবে, যেমন অ্যালামনাই যারা রয়েছেন তাদের সঙ্গে আরো বেশি কাজ করা, বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে কাজ করা, শিক্ষার্থীরা কোন ধরনের জব মার্কেটে যাচ্ছে, কোন জায়গায় তারা কাজ করছে—এক্ষেত্রে যদি আমরা কারিকুলাম নির্ণয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে পারি, তখন র‌্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান আরো বেশি উঠে আসবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ একটি জ্ঞানকে রিটেনশন করবে, উৎপাদন করবে, তারপর সেটির প্রয়োগ ঘটাবে। কিন্তু নতুন জ্ঞান উৎপন্নের ক্ষেত্রে যে ধরনের বাজেট দরকার বা যে ধরনের প্রচেষ্টা দরকার। এক্ষেত্রে একজন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক যে ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়, সে জায়গাতেই আমরা সবচেয়ে পিছিয়ে আছি। যে ধরনের অর্থনৈতিক ও মানসিক সমর্থন দরকার, গবেষণাগার দরকার, সে জায়গায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ঘাটতি রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের নাগরিক হিসেবে তৈরি করতে হলে সবকিছু বৈশ্বিকভাবে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে যে বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে আমাদের যে শিক্ষা পদ্ধতি সেখানে সনাতনী ধারা রয়ে গেছে। সেখান থেকে বের হয়ে সাম্প্রতিক বা সঠিক পদ্ধতিতে পাঠদানে জোর দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে শিক্ষাটা গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ আমাদের যে শিক্ষা পদ্ধতিটি রয়েছে সেখানে অনেকটা ভাসা ভাসা পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয়। কারণ আমাদের যে পাঠদান কৌশল, তাতে সব ধরনের শিক্ষার্থী আগ্রহ পাচ্ছে না। এক্ষেত্রে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কী ধরনের অ্যাপ্রোচ নেয়া উচিত, তাদের মুখস্থবিদ্যা থেকে সরিয়ে নিয়ে আসতে আমাদের বিভিন্ন করণীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বর্তমান সময়ে একেবারে মৌখিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ না থেকে মাল্টিমিডিয়া, স্মার্টবোর্ড এসব ব্যবহার করা যেতে পারে। বাইরের পরিবেশের সঙ্গে শিক্ষার্থীকে পরিচয় করিয়ে দিতে শিক্ষাদান করা যায়, যা তাকে শিক্ষার প্রতি চিত্তাকর্ষক করে তুলবে। এ ধরনের কাজ করলে শিক্ষার্থীরা ভালো করবে বলে আশা করা যায়।

আমি ২০১৬ সালের শেষের দিকে ভারতের শান্তিনিকেতনে অনেকদিন ছিলাম। তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা দেখাই উদ্দেশ্য ছিল। সেখানে দেখেছি শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে। যাতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের জীবন দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর জীবন দর্শন মেরামত করতে সক্ষম হন যখন উভয়ের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থাকবে। তাদের অনেকগুলো ক্লাস হয় একেবারে শ্রেণীকক্ষের বাইরে। এটা দেখেছি বটতলা, কদমতলা বা এরকম অনেক উন্মুক্ত স্থান রয়েছে, যেখানে তাদের অধিকাংশ ক্লাসগুলো হয়। সেখানে কিন্তু রেসপেক্ট বা ভক্তির কোনো ঘাটতি দেখা যায় না। জুতো খুলে প্রবেশ করে শিক্ষককে প্রণাম করে তারা খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করছে। আবার যখন ক্লাস শেষ হচ্ছে তখন তারা প্রণাম করেই ক্লাস শেষ করছে। তাদের ঐতিহ্যগত অনুষঙ্গটি তারা বজায় রাখছে। কিছুক্ষণ পরই দেখা যায় টং দোকানে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছে (সেখানে নামিদামি রেস্টুরেন্ট অত দেখা যায় না)। শান্তি নিকেতনে একেবারে শান্তি বিরাজ করে। ছোট ছোট টং দোকান আছে, সেখানে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী একসঙ্গে চা পান করতে করতে অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। সেখানে গিয়ে ক্লাসে যে বিষয় বুঝতে পারেনি তা নিয়ে প্রশ্ন করা বা শিক্ষকের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে যে কীভাবে তার জীবনকে এ পর্যায়ে নিয়ে আসছে! পরবর্তী বিষয়ে তার পরিকল্পনা কী সে বিষয়েও আলোকপাত করে। দেখা গেছে, যখন এ ধরনের একটি সম্পর্ক থাকে, তখন শিক্ষার্থীরা একজন শিক্ষক দ্বারা অনেক বেশি উপকৃত হয়। অর্থাৎ যা হওয়ার কথা ছিল—একজন শিক্ষক শুধু একজন শিক্ষকই নন, তার সামনে আদর্শের একটি জীবন্ত উদাহরণ। মূলত শিক্ষকরা পুরো জাতির অবস্থান পরিবর্তন করে দিতে পারেন, যদি তিনি সঠিকভাবে তার পেশাকে সেবা অর্থে গ্রহণ করেন। এতে একজন শিক্ষার্থী পৃথিবীকে যেন নিজের পৃথিবী হিসেবে দেখে, অর্থাৎ পৃথিবী যদি ভালো থাকে, তাহলে সে ভালো থাকবে—এ শিক্ষাটা একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষকের কাছ থেকে নিতে পারে।

এক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়েও বলা হয় যে একজন শিক্ষার্থী পাস করে বের হওয়ার পর পরই যদি তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, সেক্ষেত্রে অনেক সময় তার পাঠদান, শিক্ষার্থীদের পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেক সময় সমস্যা হতে পারে। যদি ১০-১৫ বছর পেছনের দিকে তাকানো হয়, তখন পাস করে বের হওয়ার পর চাকরি হতো এমন শিক্ষক কম ছিল। বর্তমানে এটি বেশি হচ্ছে, কারণ অনেক শিক্ষার্থী বের হয়েছে। কাজের চাপ বেড়েছে, সব মিলিয়ে নতুন শিক্ষক লাগছে। এ কারণে হয়তোবা ঘটনাটি ঘটছে। কিন্তু যদি সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, সে জায়গা থেকে আমি মনে করি যদি নতুন নিয়োগ দেয়া হয়, তারপর যেটি করা উচিত তাদের নিয়োগের পর পরই সেশন নেয়া, গবেষণায় নিয়োগ দেয়া, আলাদা কিছু গবেষণার ব্যবস্থা করা, ডেমো ক্লাসগুলো প্রচুর পরিমাণে নেয়া।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সেমিস্টার সিস্টেমগুলো বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঠিক আছে। আমাদের যদি বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে হয়, সেক্ষেত্রে সেমিস্টার সিস্টেমের সঙ্গে যেতেই হবে। আমি মনে করি সেমিস্টার সিস্টেমকে যদি আরেকটু যুগোপযোগী করা যেত, যেমন যে টপিকগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে এ ধরনের টপিক অন্তর্ভুক্ত করে সেমিস্টার শেষ করলে ভালো হয়। কারণ একটা সেমিস্টার মোটামুটি ছয় মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। এর মধ্যে যদি অতিরিক্ত টপিক থাকে, অতিরিক্ত পড়ার চাপ থাকে, তখন শিক্ষার্থীরা সে শিক্ষাটা গভীর থেকে নিতে চায় না। তখন দেখা যায় যে আমরা যদি জ্যাঁ পল সার্ত্রে পড়াতে যাই বা কার্ল মার্ক্স পড়াতে যাই, তখন তার মূল বইয়ের সঙ্গে যে যোগাযোগ, সে যোগাযোগটি তাদের অংশ হয়ে ওঠে না। তখন দাস ক্যাপিটাল বা বিইং অর নাথিংনেস সম্পর্কে তার কোনো ধারণা থাকে না। যে কারণে সে শিক্ষা থেকে পিছিয়ে থাকে এবং বৈশ্বিক ধারণা থেকে সে খাপ খাওয়াতে পারে না। এ জায়গায় আমি মনে করি, টপিক কমিয়ে এনে এবং যেকোনো জায়গায় অতিরিক্ত টপিক না রেখে একজন শিক্ষার্থী একটি সেমিস্টারে কতটুকু টেক্সট নিতে পারবে তা উপলব্ধি করে সিলেবাস প্রণয়ন করা উচিত।

আমাদের বর্তমান কারিকুলাম একটি গতানুগতিক সিস্টেমের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। শিক্ষকরা খুব বেশি মুক্তচিন্তা করছে—শিক্ষার্থীরা যে খুব একটা মুক্তচিন্তার সুযোগ পাচ্ছে—এক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করি। পুরনো সিস্টেম থেকে অনেকে বের হতে চায় না। কারণ এটি যেকোনো মানুষ, জাতি ও পৃথিবীর জন্য চ্যালেঞ্জ থাকে। এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণে অনেকেই আগ্রহী হয় না। শিক্ষার্থীরা ‍মুক্তচিন্তা যদি করতে পারে বা তাদের যদি সে সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় আরো দ্রুত প্রগতির দিকে এগোবে। শিক্ষার্থীদের নিজস্ব বক্তব্য যেন পরীক্ষার খাতায় তুলে আনতে পারে, দর্শনে এ জায়গা থাকলেও অনেক বিষয়ে তা থাকে না। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মতামতের জায়গা আরো বেশি বেশি তৈরি করা উচিত।

এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে আসি। মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যক্ষ অবদান ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মানেই বাংলাদেশ এমনটি বলা হতো। কিন্তু দেখার চোখ দিয়ে যদি দেখি—স্বাধীনতার পর এ স্পিরিট কমে এসেছে। এক্ষেত্রে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও গবেষণায় রাষ্ট্রের মনোযোগ দেয়া দরকার ছিল। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের মনোযোগ যদি আরো বেশি পরিমাণে পাওয়া যেত, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় আরো বেশি টেকসই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে পারত বলে মনে করি।

চলতি বছর ১০২ বছর পূর্তিতে স্লোগান ছিল ‘স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিশ্ববিদ্যালয়’। এক্ষেত্রে বলা যায়, স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরি করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়কে স্মার্ট হতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই। এজন্য দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। টেকসই উন্নয়নের যে ধারণা তা শিক্ষাক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রয়োগ করতে হবে। স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরি করতে হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে আগে স্মার্ট করতে হবে। কারণ একটি দেশ ও জাতি স্মার্ট হতে হলে অবশ্যই শিক্ষার দিক থেকে স্মার্ট হতে হবে। আমরা এক্ষেত্রে আশাবাদী।

ড. রেবেকা সুলতানা: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়