সরকার অবশেষে আমদানি শুল্ক কমিয়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের পথে হাঁটল। যদিও দাম কমানোর পরিমাণ ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গতকাল রাত থেকেই জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। অন্যদিকে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে চাল আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ২৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। উভয় উদ্যোগই ইতিবাচক। তবে দেখার বিষয় বাজারে এর কী প্রভাব পড়ে। জ্বালানি তেলের দাম প্রথম দফায় মাত্রাতিরিক্ত বাড়ানোর ফলে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে সব পণ্য সেবার দাম বেড়েছে। এখন লিটারপ্রতি জ্বালানির দাম ৫ টাকা কমানোর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। জ্বালানির সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন সেবার মূল্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে যেমন ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, ঠিক একইভাবে দাম কমানোর ক্ষেত্রেও সরকারের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ প্রত্যাশিত। একই কথা প্রযোজ্য চালের দামের ক্ষেত্রেও। আমদানি শুল্ক কমানোর সুফল সাধারণ জনগণ যেন পায়, তদারকি জোরদারের মাধ্যমে তা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম বা নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না। কিন্তু দাম কমাতে গেলে নানা অজুহাত হাজির করা হয়। এবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটি নিয়ে বিপুল সমালোচনা হয়েছে শুরুতেই। ফলে যেদিনই দাম বাড়ানো হয়েছে সেদিন থেকেই দাম কমানোর কথা আলোচনায় ছিল। এটি সমন্বয়হীনতার চরম উদাহরণ। আন্তর্জাতিক বাজারে অধিক মূল্যের কথা বলে দেশে যে সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয় সে সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। শুধু তা-ই নয়, জ্বালানি তেলে আয়কর ও মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাট বাবদ প্রায় ৩৭ শতাংশ কর আদায় করে আসছিল সরকার। জ্বালানি বিভাগের এক হিসাবে, বর্তমানে ১১৪ টাকা প্রতি লিটার ডিজেলের মধ্যে ১৬ টাকা ১৪ পয়সা ভ্যাট পরিশোধ করেছেন ক্রেতারা। আয়কর বাবদ প্রতি লিটারে আরো ১৮ টাকা কর দিতে হতো। এছাড়া সরকার কর্তৃক তেল আমদানিতে গড়ে ৩২ শতাংশ শুল্ক ও ভ্যাট রয়েছে। প্রতি লিটার তেলে বর্তমানে ট্যাক্স রয়েছে ৩৬ টাকা। শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার হলে তেলের দাম ৩৬ টাকা পর্যন্ত কমানো যেত অর্থাৎ দাম বৃদ্ধির প্রয়োজনই হতো না। কিন্তু সরকার বিশেষজ্ঞদের কোনো পরামর্শ বা সুপারিশ আমলেই নেয়নি। ৫০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রভাবে বাজারে সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। এখন জ্বালানি তেলের দাম ৫ টাকা কমানোয় বাজারে আদৌ কোনো প্রভাব পড়বে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত বছর সেপ্টেম্বরে জ্বালানি বিভাগ আয়কর ও ভ্যাট পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু তা গ্রহণ করেনি এনবিআর। ওই সময় আয়কর ও ভ্যাট শতাংশের পরিবর্তে নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব করে জ্বালানি বিভাগ। কারণ, জ্বালানি তেলের দাম সবসময় ওঠানামা করে। দাম বাড়লে আয়কর ও ভ্যাট বাবদ খরচ বেড়ে যায়। অন্যদিকে দেরিতে হলেও চালের আমদানি শুল্ক কমানোয় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার আশা করছেন সবাই। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের দুর্বলতার সুযোগে শুল্ক কমানোর প্রভাব বাজারে তেমন পড়ে না। এটি বাজার তদারকির দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। শুল্ক কমানোয় সরকারের রাজস্ব কিছুটা কমবে সত্য, কিন্তু জনগণের লাভ হবে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে শুল্ক ছাড়ের সুবিধা কার পকেটে যাচ্ছে—ব্যবসায়ী নাকি জনগণের। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হলো মূল্য কমানোর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া।
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক ভারতের সরকার জ্বালানির দাম নির্ধারণ করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়গুলোয় বিশ্ববাজারে দাম বেশি বেড়ে গেলে দেশটি জ্বালানির ওপর থেকে কর-শুল্ক ব্যাপক আকারে কমিয়ে জনগণকে কিছুটা স্বস্তি দেয়ার চেষ্টা করে। বিশ্বের উন্নয়নশীল অনেক দেশ এমন পদক্ষেপ নিলেও বাংলাদেশ নিয়েছিল ঠিক উল্টোটি। আশার কথা, সরকার তার ভুল বুঝতে পেরে সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে ৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়েছে। এতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা কমেছে, যা বৃদ্ধির তুলনায় খুবই স্বল্প। এক্ষেত্রে শুল্ক ও কর পুরোপুরি বাতিল করা প্রয়োজন। সাময়িক সময়ের জন্য হলেও জনগণকে স্বস্তি দিতে এটি জরুরি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাল আমদানির ওপর থেকে শুল্ক কমানো হলেও ডলার সংকটের কারণে তার সুফল মিলবে না। এছাড়া এলসি খোলায় ব্যাংকের ওপর বিধিনিষেধও রয়েছে। চাল আমদানিকে সব বিধিনিষেধের বাইরে রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জ্বালানি তেলের শুল্ক হ্রাস-পরবর্তী দাম কমানো এবং চাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের সুফল ব্যবসায়ীরাই শুধু ভোগ করতে না পারে, সে জন্য বাজার তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন।
জনজীবনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব এরই মধ্যে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমেই বাড়ছে। গণপরিবহনে ভাড়া বেড়েছে ২২-৩০ শতাংশ পর্যন্ত। অনেক পরিবহন সংস্থা নির্ধারিত হারের চেয়েও বেশি ভাড়া নিচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি সরকার সারের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় অনেকখানি বেড়ে যাবে। চলতি বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় কৃষককে আরো বেশি সেচের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। সামনে শীতের মৌসুমে সবজি ও বোরো চাষ প্রায় পুরোটাই সেচের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেচে ব্যবহূত জ্বালানি তেলের দাম না কমালে কৃষিও ঝুঁকিতে পড়বে। অর্থনীতিবিদরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় শিল্প, কৃষি খাতসহ সার্বিক অর্থনীতিতে যে অভিঘাত সৃষ্টি হয়েছে, তা সামাল দেয়া কঠিন হবে। এদিকে চালের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধির পেছনে ব্যবসায়ীদের মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতাসহ ১৫টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা অজুহাত দিচ্ছেন জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিসহ পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও চাঁদাবাজির। পশুখাদ্য, বেকারি আইটেম এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য চালের বাড়তি ব্যবহার হচ্ছে। তবে গত বোরো মৌসুমে এবং বর্তমানে আমনের ফলন আশাব্যঞ্জক হলেও মূলত ব্যবসায়ী, মিলমালিক, আড়তদার ও আমদানিকারকদের কারসাজিতে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না কিছুতেই। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আমদানি বাড়াতে সরকার শুল্ককর ৬২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করলেও ব্যবসায়ীরা তেমন উৎসাহিত হননি। অর্থাৎ পর্যাপ্ত চাল আমদানি করেননি তারা। চালের দাম কমাতে প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক কমানোর পরও কাঙ্ক্ষিত আমদানি বাড়েনি। কারণ ডলারের দাম বেড়ে গিয়েছে। এ কারণে ব্যবসায়ীরা এলসি খুলছেন না। সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগেও ডলারের দাম ছিল ৮৪ টাকা। সেটি বেড়ে ১১০ টাকায় উঠে গিয়েছে। আমদানি এলসি খুলতে আরো বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে। ফলে শুল্ক কমানোর কারণে ব্যবসায়ীরা চাল আমদানিতে যে সুবিধা পেয়েছিলেন, ডলারের দাম বাড়ায় সে সুবিধা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখন চাল আমদানি করে দেখা গিয়েছে, সেটি দেশের বাজারের প্রায় সমান বা কোনো ক্ষেত্রে বেশি হচ্ছে। এ কারণে ব্যবসায়ীরা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও চাল আমদানি করছেন না। এসব সমস্যা সমাধানেও সরকারের উদ্যোগী ভূমিকা প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতির ঝুড়িতে যেসব পণ্য বা সেবা রয়েছে তার মধ্যে তিন ধরনের পণ্য ও সেবা ৭০ ভাগ দখল করে আছে। এগুলো হচ্ছে—খাদ্য, বাসস্থান ও পরিবহন। দেশে যেহেতু বেশির ভাগ মানুষের প্রধান খাবার চাল, তাই প্রধান এ খাদ্যমূল্যটির দাম বাড়লে যেমন মূল্যস্ফীতি বাড়ে, তেমনি দাম কমলে মূল্যস্ফীতিও কমে যায়। গত কয়েক বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশের মধ্যে থেকেছে। বাজেটের আগেও মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। গত দুই মাসে এটি বেড়ে প্রায় ৮ শতাংশে উঠে গিয়েছে। পর্যালোচনা করে দেখা গিয়েছে, মূলত চালের দাম বাড়ার কারণেই মূল্যস্ফীতির এমন ঊর্ধ্বগতি। এর পেছনে কাজ করেছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা। এমন পরিস্থিতিতে শুল্ক কমিয়ে বা ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে জনগণকে স্বস্তি দেয়ার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাতে হবে। একই সঙ্গে দৃষ্টি রাখতে হবে, সাধারণ মানুষ যেন সরকারের এসব পদক্ষেপের সর্বোচ্চ সুফল লাভ করে।










