নব্বইয়ের দশক থেকে দ্রুত বড় হচ্ছে অর্থনীতি। কিন্তু তাল মিলিয়ে বাড়ছে না কর-জিডিপি অনুপাত, যা দুশ্চিন্তারও বিষয়। অর্থনীতির সঙ্গে রাজস্ব আহরণের সামঞ্জস্য না থাকায় বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে নির্ভর করতে হচ্ছে দেশী-বিদেশী ঋণের ওপর। এতে নানা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা প্রশমনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আবারো কর-জিডিপি হার বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাদা বৈঠকে এ পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপির অনুপাত ৭-৮-৯-১০ শতাংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ঘোরাফেরা করছে। এর মানে এখনো জিডিপির হিস্যা অনুযায়ী অর্জিতব্য কর অনাহরিত থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যোগদান করবে, লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। কিন্তু কর-জিডিপি অনুপাত রেখে এটি অর্জন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে অ্যাকশন প্ল্যান বা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। রাজস্বভিত্তি বাড়াতে হলে এতে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে।  

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত যেমন ১০ শতাংশ, তেমনি আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিও মাত্র ১১ শতাংশ। ফলে কর-জিডিপি অনুপাত আসলে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকারের সঙ্গে ধারাবাহিক। সন্দেহ নেই, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হলে দেশের আনুষ্ঠানিক খাত বড় করতে হবে। মাসিক ছুটি, স্বাস্থ্য ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশন ইত্যাদি স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী চুক্তিপত্রসহ নিয়োগ দিলে কর্ম সুরক্ষার ধারণা বাড়বে, তখন কর প্রদানও বাড়বে। সরকার অভিযোগ করে আয়কর রিটার্ন বাড়ছে না। উত্তর হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক খাতে চাকরিই বাড়ছে না। বাংলাদেশের সরকার মোট শ্রমশক্তির মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশকে নিয়োগ দেয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেই সর্বনিম্ন। জোর দেয়া উচিত উচ্চ আয়কারী, অভিজাত শ্রেণী, উচ্চবিত্ত, মধ্য ও বৃহৎ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং বিশেষভাবে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের আয়কর ফাঁকি বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া। ধনিক ও বণিক শ্রেণী থেকে প্রাপ্ত প্রত্যক্ষ কর কম হওয়ায় সরকার অন্যায়ভাবে পরোক্ষ কর ও ভ্যাট বাড়িয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক অর্থনৈতিক শ্রেণীর ওপর ভ্যাট-শুল্কের পরোক্ষ করের ভারী বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে ক্রমাগত। বাংলাদেশের কর সংগ্রহের প্রক্রিয়া কাঠামোগতভাবে অন্যায্য ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে, এখানে বেশি আয় করলে বেশি কর দেয়ার বাধ্যবাধকতা কম। কর সংগ্রহের প্রক্রিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় কর-জিডিপির গড় অনুপাত ৩৬ শতাংশের মতো। উদীয়মান এশীয় দেশগুলোর অনুপাতও গড়ে প্রায় ২৭ শতাংশ এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর গড় অনুপাত সাড়ে ১৮ শতাংশ। এমনকি সাব-সাহারাখ্যাত আফ্রিকার দেশগুলোর কর-জিডিপির গড় অনুপাত প্রায় ১৮ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি কর-জিডিপি অনুপাত নেপালের, প্রায় ১৯ শতাংশ। এরপর ভুটানের, ১৬ শতাংশ। ভারতের ১২, শ্রীলংকার ১১ দশমিক ৬, পাকিস্তানের ১১, আফগানিস্তানের ৯ দশমিক ৯ এবং মালদ্বীপের ৯ দশমিক ১ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৮ শতাংশের ঘরে। উল্লেখিত দেশগুলোয় রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির মূলে কাজ করছে আধুনিক, সহজ ও নির্বিঘ্ন কর ব্যবস্থা, দক্ষ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা এবং সর্বোপরি একটি সহায়ক রাজস্ব সংস্কৃতি। সুতরাং তাদের নীতি, পদক্ষেপ, রাজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। লেনদেনে অটোমেশন বাড়াতে ও নগদ লেনদেন কমাতে হবে। চেকের মাধ্যমে লেনদেন বাড়াতে হবে। নগদ লেনদেন হলেই ফাঁকি দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়। নগদ লেনদেন অনেক দেশই কমিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশেরও কমাতে হবে।

সরকার বলছে, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। অথচ উল্টো প্রবণতা হচ্ছে, করোনার কারণে সেটি বরং আগের চেয়ে কমছে। এটা আশঙ্কাজনক। এ অবস্থায় কর ফাঁকি রোধ করতে হবে। এজন্য এনবিআরের অটোমেশনে গতি আনা খুব জরুরি। এটা কেবল কর ফাঁকি ধরতে সাহায্য করবে না, উপরন্তু নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করা এবং এনবিআর ডাটাবেজের সঙ্গে কর প্রদানকারীর ব্যাংক হিসাবের যোগাযোগ তৈরিতে সহায়তা করবে। সংস্থাটি এরই মধ্যে অবশ্য কিছু সার্ভিস সেন্টার খুলেছে। এ ব্যাপারে করদাতাদের ওয়াকিবহাল করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজস্ব বিভাগে কর গোয়েন্দা সেলকেও আরো সক্ষম ও কার্যকর করা চাই। বিশ্বায়নের যুগে ট্রান্সফার প্রাইসিং সেলকে অনেক শক্তিশালী করতে হবে, প্রয়োজনে ঢেলে সাজাতে হবে। কর-জিডিপি বাড়াতে এবারের বাজেটে কয়েকটি বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সুযোগ যেমন দেয়া হয়েছে—তেমনি রিটার্ন জমা না দিলে সেবা বঞ্চিত করার বিষয়ও রয়েছে। উদ্যোগগুলোর সফল বাস্তবায়নই কাম্য।

করের আওতা সম্প্রসারণ, করহার সুষম ও প্রয়োজনীয় অটোমেশন সম্পন্ন করে মোট দেশজ উৎকাদনে করের অনুপাত বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্য থাকলেও তা অর্জনে বিলম্ব হচ্ছে। এসডিজি বাস্তবায়নের স্বার্থে ২০২১ সালের মধ্যে কর জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার স্বপ্ন এখনো অধরা থেকে গেল। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও ২০৪১ সালের মধ্যে এ অনুপাত ২৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। এনবিআর পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করলে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সঠিকভাবে উদ্বুদ্ধকরণ ও নৈতিক দায়িত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন কিন্তু কঠিন নয়। করজাল বৃদ্ধি, কর সংগ্রহের গতি আনয়ন, সব জেলা ও উপজেলায় রাজস্ব অফিস স্থাপন এবং কর জরিপ পরিচালনায় প্রশাসনিক সংস্কারের বিকল্প নেই। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপক বৃদ্ধি পেলেও ২০১১ সালের পর রাজস্ব প্রশাসনে আর কোনো সংস্কার হয়নি। জনবল ও অফিসসংখ্যা বৃদ্ধি তথা প্রশাসনিক সংস্কারে কয়েক বছর আগে প্রস্তাব প্রণীত হলেও এ প্রস্তাব সরকারের অনুমোদনের জন্য এখনো অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বিলম্বিত হচ্ছে।

কর আদায় বাড়াতে হলে করের আওতা বা জাল বিস্তৃত করার কোনো বিকল্প নেই। উপজেলা পর্যায়ে করের আওতা বাড়ানোর সুযোগ ধারণার চেয়েও বেশি রয়েছে। এক্ষেত্রে আয়কর ফাইল ও মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) আদায়ের পরিমাণ দুটিই বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কর সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য ভ্যাট মেশিন তথা ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) স্থাপনে কেন গতি আসেনি, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। এর আগে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) স্থাপন করা হলেও তাতে ভ্যাট ফাঁকি রোধ করা যায়নি এবং অল্প কিছু দোকান ছাড়া চালু করা যায়নি। গত দুই বছর ইএফডি মেশিন দোকানে দোকানে চালু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এটি চোখে পড়ে না। সুপার স্টোর বা চেইন শপের বাইরে বেশির ভাগ দোকানেই ভ্যাট মেশিনটি দেখা যায় না। এক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে, এটি গ্রহণযোগ্য নয়।

বড় বড় শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত লাখ লাখ ‘সেল ইউনিট’ বা দোকান রয়েছে। সেখান থেকে যদি সামান্যও ভ্যাট আসত, তাহলে সেটি মোট অংকে বিশাল অর্থ হবে। বিক্রেতারা ইএফডি মেশিন ব্যবহার করবে এবং সরকার ভ্যাটের টাকা পেয়ে যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এমন একটি সুবিধা থাকার পরও ভ্যাট মেশিনের পরিমাণ কেন প্রত্যাশিত পরিমাণ বাড়ছে না? আমরা সুপার স্টোরগুলো থেকে কেনাকাটা করলে ভ্যাটের চালান পাই, বড় রেস্টুরেন্টগুলোয় ভ্যাটের চালান পাই। কিন্তু মাঝারি বা ছোটখাটো দোকান বা রেস্টুরেন্টগুলো থেকে কেন চালান পাওয়া যায় না? সেখানে নিশ্চয়ই কোনো অনিয়ম হচ্ছে। যাদের আদায় করার কথা, তাদের আন্তরিকতা ও সততার প্রশ্ন এখানে আসে। বেশির ভাগ দোকানপাটেই লেনদেন রেকর্ডের ব্যবস্থা নেই। লেনদেনের রেকর্ড যদি না থাকে, তাহলে কর সংগ্রহ কঠিন হওয়াই স্বাভাবিক। শুধু মূল্যসংযোজন কর নয়, উপজেলা পর্যায়ে আয়কর আদায়েও এনবিআরকে একনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে অনেক ধনী লোক আছে। তারা বছর বছর দামি গাড়ি ক্রয় করে এবং দামি ও বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করে। অনেকে বাগানবাড়ি বা বাংলো বানায়। কিন্তু তাদের কতজনের আয়কর ফাইল আছে? এক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানো উচিত। উপজেলা পর্যায়ে বহু সোনা ব্যবসায়ী রয়েছেন, তারা ঠিকমতো কর দিচ্ছেন কিনা খতিয়ে দেখা উচিত।