শুরুতেই আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই বণিক বার্তাকে, আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় দুই গুণীজনকে তাদের প্রাপ্য সম্মাননা প্রদানের জন্য, যারা শুধু পাণ্ডিত্যেই নয়, একই সঙ্গে সততা, প্রজ্ঞা ও আত্মমর্যাদাবোধ দিয়ে তারা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের মধ্যে বিশেষ করে অধ্যাপক রওনক জাহানের প্রভাব প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছে আমার পেশাগত জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে। তার সঙ্গে আমার ভাবনা ও কাজের আদান-প্রদানও হয়েছে তুলনামূলক বেশি। বাবা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই লিখতেন আকবর আলি খান স্যারকে নিয়ে, যাকে তিনি ডাকতেন ‘লারনেড (Learned)’ বলে। ফোন তুলে বলতেন, ‘লারনেড, বলুন তো এই বইয়ের ঝামেলাটা কীভাবে মেটাই!’ আজকে এই প্রাজ্ঞ ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে নেই, তবে তার ভাবনা ও উপলব্ধি আমাদের জন্য পাথেয় হিসেবে রেখে গেছেন। তার স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
Owning Our Future
রওনক আপার সঙ্গে
আমার প্রথম
দেখা ও পরিচয় ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে।
আমি তখন যুক্তরাষ্ট্রে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে স্নাতকোত্তরসম্পন্ন করে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। বাংলাদেশের ৩৫ বছর পূর্তি
হতে চলেছে,
এদিকে দেশে নির্বাচন-পূর্ববর্তী
সময়ের প্রবল
অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা
আর সহিংসতা।
প্রবাসে থেকে আমরা বাঙালি
ছাত্র, শিক্ষক,
পেশাদার সবাই ভীষণ উদ্বিগ্ন।
আমাদের অত্যন্ত
প্রিয় বন্ধু,
অকালপ্রয়াত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জালাল আলমগীরসহ আমরা কয়েকজন আয়োজন
করলাম একটি সম্মেলনের, যেখানে
একাডেমিক আলোচনার
পাশাপাশি স্থান
পেল বাংলাদেশ
ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র, সংগীত,
ও আলোকচিত্র
প্রদর্শনী। আমাদের
পাশে এসে দাঁড়ালেন হার্ভার্ড
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের
অধ্যাপক এবং সে সময়ের
সাউথ এশিয়া
ইনিশিয়েটিভপ্রধান সুগত বোস। হার্ভার্ডেই অনুষ্ঠিত হলো কনফারেন্সটি। এর শিরোনাম আমরা দিয়েছিলাম: Owning Our Future—কেমন বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই, কেমন বাংলাদেশে
ফিরে যেতে চাই? আমিও তখন দেশে ফেরার প্রস্তুতি
নিচ্ছি, মনে বিপুল
আত্মবিশ্বাস, ম্যাজিকের
মতো দেশ পাল্টে দেব!
রওনক আপা এলেন সে সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে। আমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বললেন, দেশে ফিরে যাচ্ছ, বাবার কাজে যোগ দেবে না? মহিউদ্দিন সাহেবের স্বাস্থ্য আর ইউপিএলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তো আমরা বেশ চিন্তিত। আমি সজোরে মাথা নেড়ে বললাম সে রকম কোনো পরিকল্পনাই আমার নেই। আর আমি প্রশিক্ষণ নিয়েছি জনস্বাস্থ্যে, এ নিয়েই আমার কাজ করার ইচ্ছা। তিনি হয়তো একটু হতাশ হলেন কিন্তু আমার মাথায় চিন্তার বীজটা যে আসলে গেঁথে দিয়েছিলেন, তা বুঝেছি আরো পাঁচ-ছয় বছর পর।
বাংলাদেশ হেল্থ ওয়াচ
২০০৭-এ দেশে ফিরে শিক্ষকতা
ও গবেষণায়
যুক্ত হয়েছি
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট
স্কুল অব পাবলিক হেলথে
(JPGSPH)। তখন বাংলাদেশ
হেলথ ওয়াচের
প্রথম দুটি প্রতিবেদনের কাজ চলছে। একটির
বিষয় স্বাস্থ্যসেবায় সমতা (equity) এবং পরবর্তী
প্রতিবেদনগুলো ছিল স্বাস্থ্য খাতের
জনশক্তি ও পরিচালনা ব্যবস্থা
নিয়ে। এ কাজগুলোর সঙ্গে
গভীর আগ্রহ
নিয়ে আমি যুক্ত হলাম এবং আরো উদ্দীপ্ত হলাম জেনে যে এ হেলথ ওয়াচের মূল উদ্যোক্তা অধ্যাপক
রওনক জাহান।
আমার মনে হলো, এটাই তো সত্যিকারের
অর্থবহ কাজ। এ গবেষণাগুলোয় উঠে আসছে আমাদের
স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যের
চিত্র, সুপারিশগুলোতে বলা হচ্ছে প্রতি
স্তরের মানুষের
জন্য কীভাবে
উন্নততর সেবা দেয়া যায়। এ কাজগুলোই
তো করা দরকার, এ তথ্যগুলো পৌঁছে
দেয়া দরকার
নীতিনির্ধারকদের কাছে, শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের
কাছে যাতে তারা এ বিষয়গুলো নিয়ে ঠিক সিদ্ধান্ত
নেন, নিজেদের
পেশাগত জীবনে
এ ভাবনাগুলোকে কাজে লাগান (গভীর বেদনা নিয়ে এখন উপলব্ধি করি, কী অলীক চিন্তার জগতে বাস করতাম!)। প্রতিবেদনগুলো যখন চূড়ান্ত করা হচ্ছে, তখন রওনক আপা কয়েকদিন JPGSPH-এ এলেন সম্পাদনার কাজ শেষ করতে।
আমার দায়িত্ব
ছিল তাকে সহায়তা করা। আমি আপাকে
একটু ভয়ও পেতাম, কিন্তু
মনে মনে উত্ফুল্ল হলাম এ সুযোগ
পেয়ে।
একদিন
কাজ কিছুটা
গুছিয়ে তিনি আমাকে নিয়ে লাঞ্চ করতে গেলেন ব্র্যাকের
সুরুচি রেস্তোরাঁয়। স্বল্পাহারি রওনক আপা নিলেন একটা মুলিগাতোয়ানি স্যুপ।
আমরা জানালার
ধারে একটা টেবিলে বসলাম।
তিনি খেতে খেতে একটু হতাশা নিয়ে বললেন আমি বুঝি না আমাদের গবেষকরা
কেন ‘শার্প’
বা সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দিতে পারেন
না। গবেষণায়
উঠে আসা তথ্যগুলো এত চোখ খুলে দেয়ার মতো, সে অনুযায়ী
তিনি আশা করেছিলেন যে সুপারিশগুলো নীতি প্রণয়নে আরো সুুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেবে।
আমি উপলব্ধি করলাম যে একজন নিষ্ঠাবান গবেষক হিসেবে তিনি তার সহকর্মীদের কাছ থেকেও তেমন মানের বিশ্লেষণ ও সুপারিশ প্রত্যাশা করেন। এখন বুঝি যে তার এ দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে প্রকাশনার কাজেও পথ দেখিয়েছে।
ইউপিএলের প্রথম প্রকাশনা ‘উইমেন ফর উইমেন ১৯৭৫’
শিক্ষকতা ও গবেষণাকাজে আমাকে ইতি টানতে হলো ২০১১/১২ সালে যখন বাবার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে আরো। প্রকাশনা আমার জন্য একেবারে নতুন জগৎ, এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়ে আবিষ্কার করতে শুরু করলাম অনেক অজানা বিষয়। ইউপিএলের প্রথম দিককার প্রকাশনা কী কী ছিল তার অনুসন্ধান চালিয়ে পেলাম রওনক জাহানের উদ্যোগে তৈরি গবেষণা গ্রন্থ ‘উইমেন ফর উইমেন ১৯৭৫’, অর্থাৎ ইউপিএলের যাত্রা শুরুই হয়েছে অন্যান্য কিছু প্রকাশনার পাশাপাশি বাংলাদেশের নারীদের অবস্থান নিয়ে ১০ জন দেশী ও বিদেশী নারী গবেষকের এ সংকলন প্রকাশের মধ্য দিয়ে। রওনক আপার কাছে খোঁজ নিয়ে আরো জানলাম যে এ গবেষক দলটি তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৯৭৩ সালে এবং তাদের বাড়িতেই গবেষকদের সভাগুলো হতো। বাংলাদেশের নারীর ওপর এটিই প্রথম গবেষণাগ্রন্থ।
পরবর্তী সময়ে ইউপিএল প্রকাশ করেছে অধ্যাপক রওনক জাহান রচিত বা সম্পাদিত আরো চারটি গ্রন্থ, যার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য: Pakistan:
Failure in National Integration; Bangladesh
Politics: Problems and Issues; Bangladesh: Promise and Performance। এ সবক’টি বই-ই কয়েক দশক ধরে পাঠকসমাদৃত হয়ে আসছে। ২০১৮ সালে পাঠকপ্রিয়তার বিচারে গবেষণা প্রকাশনায় সাফল্যের জন্য তাকেUPL Excellence Award সম্মাননা দেয়া হয়।
অধ্যাপক রওনক জাহান কখনো গতানুগতিক কাজ করেননি। ১৯৬০-৭০ দশকের উত্তাল ও প্রতিকূল সময়ে তার মেধার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করেছেন একজন প্রথম সারির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে এবং এখনো নিরলসভাবে তা করে চলেছেন। ২০০৬-এ প্রথম পরিচয়ে তিনি আমাকে যে দায়িত্বে দেখতে চেয়েছিলেন ২০২২-এ সে দায়িত্বের বয়স হয়েছে ১০ বছর। যাত্রাটি সহজ হয়নি, কিন্তু আমি জানি যে তার শুভকামনা সর্বদাই আমাদের সঙ্গে রয়েছে।
তিনি দীর্ঘায়ু হোন, আর আমাদের পথ দেখিয়ে চলুন অবিচল নিষ্ঠায় আর জ্ঞানচর্চার শ্রেষ্ঠত্বে।
মাহরুখ মহিউদ্দীন: ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)










