চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় স্থান অর্জন করলেও প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আমদানি করতে হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ উৎপাদন বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত বাড়ছে চালের ব্যবহার ও ভোগ। মঙ্গলবার বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে ইউএসডিএর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের জন্য এ পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। বছরে দেশে চালের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ টন। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে চাহিদার চেয়ে জোগানের লক্ষ্যমাত্রা বেশি থাকলেও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে প্রতি বছর কয়েক লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়। আগামী কয়েক দশক দেশের কৃষি উৎপাদন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, মৃত্তিকা অবক্ষয়, মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সেচের পানির স্বল্পতা, অনাবৃষ্টিসহ বিরূপ আবহাওয়ার সম্মুখীন হবে। ব্যাহত হবে ধান উৎপাদন। এমন পরিস্থিতিতে ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে চালের ঘাটতি ৩৬ লাখ টন ছাড়াবে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। অন্যদিকে পাঁচ বছর ধরে খাদ্য উৎপাদনে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। অথচ এ সময় দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ। দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধানের উৎপাদন বাড়াতে না পারলে ভবিষ্যতে খাদ্য ভঙ্গুরতা বাড়বে। দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের ঘাটতি মোকাবেলায় উন্নত বা হাইব্রিড জাত এবং জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে উদ্বৃত্ত উৎপাদন বা জোগানের বহুমুখী ব্যবহার এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে সেই ফসলের ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া গবেষণা, সম্প্রসারণ ও বাজার ব্যবস্থা উন্নয়নে বাড়াতে হবে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।

চাল নিয়ে এখন যে সংকট তৈরি হয়েছে নিকট অতীতে তেমনটি কখনো দেখা যায়নি। এ বছর বোরো, আউশ ও আমন—তিন মৌসুমেই ধানের উৎপাদন কম হয়েছে। বিশ্ববাজারে চালের দাম বেশি হওয়ায় আমদানিকারকদের চাল আমদানিতে খুব একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। সরকার বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির অনুমতি দিলেও তেমন সাড়া মিলছে না। তাছাড়া যেটুকু আমদানি হয়েছে সেগুলোও বন্দর থেকে ছাড় করছেন না আমদানিকারকরা। কারণ বাজারদরের চেয়ে আমদানি খরচ পড়ে যাচ্ছে বেশি। এর মধ্যে আবার ভারত চাল রফতানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে। চালের চলমান সংকট দূর করার জন্য সবার আগে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানিতে জোর দিতে হবে। কীভাবে এবং কোন দেশ থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে চাল এনে দেশের বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো যায় সে চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া চালের সংকট দূর করতে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে ধানের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন সময় জানা গেছে, মিল মালিক এবং এক শ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়ারা অবৈধভাবে ধানের মজুদ করে রাখে। সরকারের উচিত মিল ও ফড়িয়া পর্যায়ে মজুদ করা ধান বাজারে ছাড়তে অভিযানে নামা দরকার। কোন মিলে কী পরিমাণ ধান মজুদ রয়েছে সেটি জানতে চাওয়া দরকার। দেশের বাজারে চালের দাম তিন বছর ধরে অনেক চড়া। এ বছরের শুরু থেকে আরো বাড়তে বাড়তে এখন দেশের ইতিহাসে চালের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশে ধান-চালের উৎপাদন ও চাহিদার তথ্যে গরমিল রয়েছে। বলা হয় চাহিদার চেয়ে চাল বেশি উৎপাদন হয়, তাহলে তো সংকট থাকার কথা নয়। সংকট যেহেতু আছে, সেহেতু বুঝতে হবে চালের উৎপাদনের তথ্য ঠিক নেই। আসলে যে পরিমাণ ধান-চাল উৎপাদন হয় তার মধ্যে সিস্টেম লস থাকে, নষ্ট হয় কিছু অংশ। এগুলো বাদ দিলে চাহিদার তুলনায় আসলে চালের ঘাটতি থেকে যায়। এজন্য ধান-চালের তথ্যগত সমস্যাও দূর করা উচিত।

বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট আগামীতে আরো বাড়বে। বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ ইউরিয়া সার ইউরোপ থেকে সরবরাহ করা হয়। গ্যাসের সংকটে একদিকে সারের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সারের দামসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণের দামও বাড়ছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এতে কৃষিপণ্যের দামও বাড়বে। কয়েকটি দেশে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে খাদ্য দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে। খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি পুষ্টিনিরাপত্তার জন্য দরকার মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, সবজির পর্যাপ্ততা। আর পুষ্টিনিরাপত্তার জন্য উল্লিখিত পণ্যগুলো সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ ও সরবরাহের ব্যবস্থা করা বড় প্রয়োজন। বাংলাদেশে সবজি, মাছ ও ধান উৎপাদন যে পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, তা ঠিকমতো এগিয়ে গেলে সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে খাদ্য রফতানিকারক দেশ হতে পারে বাংলাদেশ। পুষ্টিনিরাপত্তায় চালের বাইরে অন্যান্য খাবার গ্রহণ বাড়াতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের খাদ্য গ্রহণের চিত্রে একমাত্র চালের পর্যাপ্ততা আছে। দিনে জনপ্রতি ৩৫০ গ্রাম ভাত দরকার। সেই জায়গায় বাংলাদেশের মানুষ গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম ভাত খায়। বাংলাদেশ এখন চাল উৎপাদনে বিশ্বের তৃতীয় দেশ। চীন ও ভারতের পর গত অর্থবছরে ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে। দেশে প্রতিদিনই কৃষিজমি কমছে। সেখানে আমাদের প্রধান পণ্য চাল উৎপাদনের ধারাবাহিক যে সফলতা আসছে, তার বড় অবদান আমাদের কৃষকদের। সেই সঙ্গে কৃষিবিজ্ঞানীদের সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া নীতিসহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

কৃষিমন্ত্রী বলছেন, সামনে ধানের মৌসুম। ফলে আমাদের আতঙ্কটা একটু কম। খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে আগামী বছর থেকে সারা দেশের কৃষিজমিকে ভাগ করে চাষাবাদ তদারকের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশের মানুষকে প্রতি ইঞ্চি জমিতে শস্য আবাদের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সামনে আরো কঠিন সময় আসতে পারে জানিয়ে তিনি জনগণকে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ সংকটের মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম যেন আরো বেশি অস্থির না হয়, সেজন্যই খাদ্য মজুদ ঠিক রাখার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ানোর আসলে বিকল্প নেই। প্রয়োজনীয় খাদ্য আমদানি করা যায়। তবে শর্ত হলো, আমদানি করার মতো অর্থ থাকতে হবে, খাদ্যও থাকতে হবে। ২০০৮ সালের দিকে বিশ্বে যখন খাদ্য সংকট দেখা দেয়, তখন বর্ধিত মূল্য দিয়েও খাদ্য কিনতে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশেরও এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে। এবারের অবস্থা ভিন্ন। এবার আমদানি করার মতো অর্থও নেই। ফলে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে বেশি।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ কেন্দ্র করে পরাশক্তিগুলোর নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞার কারণে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে। করোনা মহামারী এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মধ্যে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের আভাস দিচ্ছে বিশ্ব সংস্থাগুলো। সত্যিই খাদ্য সংকট দেখা দিলে গত তিন বছরের মতো আগামী বছরটাও এ পৃথিবীর মানুষের জন্য দুঃসংবাদের, তা নিয়ে শঙ্কিত সবাই। প্রধানমন্ত্রী বারবার দুর্ভিক্ষের শঙ্কার কথা বলে সতর্ক করছেন দেশবাসীকে। বিশ্ব আগামী বছর ‘দুর্ভিক্ষের মতো খারাপ পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হতে পারে বলে সতর্ক করে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে দেশবাসীকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তা খুবই সময়োচিত। তিনি মূলত বিশ্ব খাদ্য পরিস্থিতি নিয়েই বেশি কথা বলেছেন। আমাদের খাদ্যের একটা বড় অংশ আমদানি করতে হয়। ডলারের দাম বেড়ে যাচ্ছে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এ কারণে গম, ভোজ্যতেলের আমদানিমূল্য বেড়ে যাচ্ছে। আবার এগুলো এলসি করে আনাও বেশ কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। সেজন্য প্রধানমন্ত্রী সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, দেশে এক ইঞ্চি জমিও যেন পতিত না থাকে। যুদ্ধ বন্ধ না হলে এক পরিস্থিতি, বন্ধ হলে আরেক পরিস্থিতি। দেশের ভেতরে যেটা করতে হবে—দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। কারণ অভিঘাতটা তাদের ওপরই সবচেয়ে বেশি হয়। মূল্যস্ফীতি হোক, কর্মসংস্থান হারানো হোক তাদের ওপরই অভিঘাত বেশি। সুতরাং তাদের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে। বিশেষত দরকারি পণ্য তাদের পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

খাদ্যশস্য উৎপাদনে জমির উৎপাদিকা শক্তি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে জমির উৎপাদিকা শক্তি নানা কারণে কমে গিয়েছে। আমাদের উৎপাদন উপকরণের ব্যবহারও ভারসাম্যহীন। বিশেষ করে কৃষক বেশি করে ইউরিয়া সার ও পানি ব্যবহার করছেন। সেখানেও গুরুত্ব দিতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমাতে হলে ফলন বাড়ানোর বিকল্প নেই। সেজন্য শস্যের জাতের উন্নয়ন ও মানসম্মত বীজ সরবরাহ বাড়ানো, মাটির স্বাস্থ্য, বালাই ব্যবস্থাপনা ও কৃষিতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, স্থানীয় সেবা প্রদান ব্যবস্থা উন্নয়ন করতে হবে। এছাড়া বাজার ব্যবস্থা, কৃষি গবেষণা ও যান্ত্রিকীকরণের উন্নয়ন, বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণ কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিরও কোনো বিকল্প নেই। খাদ্যশস্যের বিশেষ করে ধানের উৎপাদন বাড়াতে হলে ভালো মানের বীজ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। দেশে মোট বীজ চাহিদার বড় অংশ সরবরাহ করা হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে। আবার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরবরাহকৃত বীজের মানহীনতার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এসব বীজ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন কৃষক। হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বিশ্বের বেশির ভাগ ধান উৎপাদনকারী দেশ হাইব্রিড ও উফশী জাতের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। চীনের মোট জমির প্রায় ৬০ শতাংশে এখন হাইব্রিড ধানের আবাদ হচ্ছে। সে তুলনায় বাংলাদেশে মাত্র ১০ শতাংশ জমিতে হাইব্রিড ধানের চাষ হচ্ছে। বীজ উন্নয়নের ব্যাপারে যেমন সরকারি পর্যায়ে তদারকি দরকার, তেমনি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যাতে কৃষি খাতে বেশি বিনিয়োগ করে এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ প্রদান করে সে ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। গমের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ব্লাস্ট প্রতিরোধী উচ্চফলনশীল ঘাতসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করতে হবে এবং গম চাষ ভুট্টা চাষের মতো লাভজনক হতে হবে। প্রতি বছর বিদেশ থেকে ৫০-৬০ লাখ টন গম আমদানি করে বাংলাদেশ। খাদ্যশস্যের আমদানিনির্ভরতা হ্রাসে দেশের চাহিদা মোতাবেক গম উৎপাদনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।