আধুনিক নগর সভ্যতার ক্ষেত্রে গ্যাস ও বিদ্যুৎ অত্যাবশ্যকীয় দুটি অনুষঙ্গ। যেহেতু এ দুটি ক্ষেত্রে জনগণের নাগরিক অধিকারের বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, সেক্ষেত্রে গ্যাস-বিদ্যুতের সেবাপ্রাপ্তির বিষয়টি সরাসরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে। জনগণ অর্থের বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে গ্যাস-বিদ্যুতের সেবা গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে এত দিন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেবাগুলোর মূল্য নির্ধারণ করত। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ে সরকার নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, সম্প্রতি এমন খসড়া আইন অনুমোদন করা হয়েছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বিইআরসি পাশাপাশি এখন থেকে সরকারও গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করতে পারবে। এজন্য মন্ত্রিসভা বিইআরসি আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২২-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। আইনটির সংশোধন প্রস্তাব জাতীয় সংসদে পাস হলে সরকার চাইলে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়াতে ও কমাতে পারবে।
২৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী বিইআরসিকে ৯০ দিনের মধ্যে শুনানি করে সিদ্ধান্ত দিতে হয়। তবে অনেক সময় তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। সে সময়ের কথা বিবেচনা করেই এ সংশোধন। তবে বিইআরসির কাজ স্বাভাবিক নিয়মে চলবে এবং শুধু বিশেষ ব্যবস্থায় সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ বা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারবে এমনটিই বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে যদি এমন কোনো পরিবেশ বা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যেখানে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, তাহলে সরকার তাত্ক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারবে।
বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিইআরসি আইনের মূল্যসংক্রান্ত অধ্যায়ের ৩৪ ধারার সঙ্গে ‘ক’ যুক্ত হবে। এ ধারার সংশোধনীতেই বিশেষ পরিস্থিতিতে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে সরকারের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। বিইআরসি আইন, ২০০৩ মূল্যসংক্রান্ত অধ্যায়ের ধারা ৩৪ মোতাবেক সরকারের সঙ্গে আলোচনাক্রমে প্রণীত নীতিমালা ও পদ্ধতি অনুসরণে পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুৎ উৎপাদন, এনার্জি সঞ্চালন, মজুদকরণ, বিপণন, সরবরাহ, বিতরণ, ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য বিইআরসি নির্ধারণ করে থাকে। আইনে আরো বলা হয়েছে, কমিশন লাইসেন্সি এবং অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে শুনানি দেয়ার পর ট্যারিফ বা মূল্য নির্ধারণ করবে (৩৪-এর উপধারা ৪)।
আইনে
এভাবে সুস্পষ্টভাবে কমিশনের কার্যাবলি নির্ধারণ
করে দেয়ার
পরও সরকারের
হস্তক্ষেপের সুযোগ
অবারিত করার
পদক্ষেপটি কার্যত
বিইআরসিকে নিষ্ক্রিয় করে তুলবে বলে
জ্বালানিবিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
কারণ গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য
নির্ধারণে একটি
পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এখন যদি
সেটাও না করা হয় তাহলে ক্ষেত্রবিশেষে স্বেচ্ছাচারিতা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে জনগণের ভোগান্তি
বৃদ্ধি পাবে
বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ
করে কমিশন
মূল্যবৃদ্ধির আগে
গণশুনানির আয়োজন
করে থাকে,
এখন এ ক্ষমতাটি সরাসরি
সরকারের কাছে
চলে গেলে
তখন হয়তো
সরকার গণশুনানির প্রয়োজন বোধ করতে
না-ও পারে, কারণ
জরুরি প্রয়োজনের বিষয়টি এখানে বলা
হয়েছে।
এক্ষেত্রে জনভোগান্তি বৃদ্ধির সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হবে। কারণ গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি পেলে তখন সবকিছুর দাম আরেক দফা বাড়বে। তাই অন্তত গণশুনানি যেন হয় সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর কমিশন থাকার ফলে গ্যাস-বিদ্যুত্সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সধারীদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা যেত, সে সঙ্গে ভোক্তাদের অধিকারের বিষয়ে কথা বলার জায়গা হিসেবে কমিশন গণ্য হতো। কোথাও অপব্যয় ও দুর্নীতি হচ্ছে কিনা সেটিও কমিশন দেখত। সঙ্গে সিস্টেম লসের কারণ উদ্ঘাটন করে গ্যাস-বিদ্যুতে ভর্তুকি কমানোর দিকটিও কমিশন অনুসন্ধান করত। আইন সংশোধন করার ফলে কমিশনের পক্ষে হয়তো এসব সম্ভব হবে না। কারণ বিইআরসি তখন কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে।
মূলত গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে ভোক্তার কথা বলার সুযোগ রাখার লক্ষ্যে বিইআরসি প্রতিষ্ঠা পায়। এখন সরকার এ ক্ষমতা পেলে মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে জনগণের কাছে জবাবদিহিতার আর কোনো সুযোগ থাকবে না।
যদিও
বিইআরসি মূল্যসংক্রান্ত আইন সংশোধনে মন্ত্রিসভার এ-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক
পরিস্থিতির কারণে
সৃষ্ট বর্তমান
বাস্তবতার নিরিখে
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ
ও জ্বালানির
সরবরাহ নিশ্চিত
করার লক্ষ্যে
আন্তর্জাতিক বাজারের
সঙ্গে সামঞ্জস্য
রেখে বিদ্যুৎ,
গ্যাস ও তেলের মূল্য
সমন্বয় করা প্রয়োজন। অর্থনীতির
গতিকে চলমান
রাখার সঙ্গে
নিয়মিত ও দ্রুততম সময়ে
মূল্য সমন্বয়ের
লক্ষ্যে বিইআরসির
পাশাপাশি সরকারেরও
ক্ষমতা সংরক্ষণে
আইনটি সংশোধনের
প্রয়োজনীয়তা দেখা
দিয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ
এনার্জি রেগুলেটরি
কমিশন আইন ২০০৩-এর ধারা ৩৪-এর উপধারা
(৩) সংশোধন
এবং ধারা
১ সন্নিবেশিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের
পক্ষ থেকে
গণশুনানির বিষয়ে
৯০ দিনের
প্রক্রিয়াকে দীর্ঘমেয়াদি অভিহিত করে জরুরি
প্রয়োজনের সময় দ্রুত মূল্য
সমন্বয়ের পরিপ্রেক্ষিতেই এ আইন সংশোধন
করার উদ্যোগ
নেয়া হয়েছে।
দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের মূল্য নির্ধারণীর ক্ষমতা বিইআরসির। প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর থেকে কমিশনে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ হয়। যদিও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যগুলোর মূল্য নির্ধারণ হতো।
সরকারের ভাষ্য, বিশেষ পরিস্থিতিতে অনেক সময় বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে আইন সংশোধনকে সরকার ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। বিইআরসি আইনে এতদিন এ সুযোগ ছিল না। এখন যদি এ ধরনের সংশোধনী এনে সুযোগ তৈরি করা হয়, তাহলে তাত্ক্ষণিক সংকটে হয়তো সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে এমন যুক্তি উপস্থাপন করা হলেও জনগণের স্বার্থ সবার আগে বিবেচনা করা উচিত। কারণ গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হলে সেটির প্রভাব সরাসরি গ্রাহকের ওপর পড়ে। তাই মূল্যবৃদ্ধির আগে গণশুনানির বিষয়টি অন্তত নিশ্চিত করা উচিত। মূল্য সমন্বয়ের ক্ষমতা সরাসরি সরকারের কাছে চলে গেলে যা আর হবে না। যদিও সরকার যদি মূল্যবৃদ্ধি করতে চায়, তাহলে সেটি কমিশনের মাধ্যমেই করতে পারত। এক্ষেত্রে গণশুনানিতে যেসব দাবি করা হতো, সেগুলোর মূল্যায়ন পুরোপুরি না হলেও কিছুটা হলেও সরকার বিবেচনা করার চেষ্টা করত। কারণ বিষয়টির সঙ্গে জনস্বার্থ জড়িত, আর এটি চাইলেই উপেক্ষা করা যায় না। চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা কবে শেষ হবে, সেটি এখনো অনুমেয় নয়। তাই অর্থনৈতিক যেকোনো সিদ্ধান্তে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জনগণের মতামত নেয়া জরুরি। এখন সরকার যদি বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় করতে চায়, তাহলে মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্তত জনগণের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে আমরা সে প্রত্যাশাই করি।










