বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তার ডায়েরিতে এক জায়গায় লিখে গিয়েছেন, ‘তুমি এমনভাবে ইতিহাস তৈরি করো, যাতে ইতিহাসে তোমাকে কখনো খুঁজে পাওয়া না যায়।’ মানুষের ইতিহাস পৃথিবীতে বহুভাবে নির্মিত হয়েছে। তাই মানুষের ইতিহাস নির্মাতাদের আসলেই খুঁজে পাওয়া কষ্ট। তবে এ ইতিহাসের একটি অংশ রাজনৈতিক ইতিহাস। রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সবসময়ই একটা সরবতা আছে। তাই এখানে যারা নির্মাতা বা কুশীলব থাকেন, তাদের পক্ষে ঠিক ওইভাবে সরবতার বাইরে থাকা কঠিন। তবে তার পরও সত্য হলো কোনো রাজনৈতিক ইতিহাস, কোনো যুদ্ধ কখনো কয়েকজনের কাহিনী নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হাজারো চরিত্র। ইতিহাসের পাতা এতই কম যে তাদের খুব বেশি স্থান দেয় না। শুধু যে স্থান দেয় না তা নয়, সমুদ্রের পানির মতো কখন নীরবে সাগরের বালির মতো ধীরে ধীরে ধুয়ে নিয়ে যায় তাও জানা যায় না। এমনকি জানতে পারে না সাগরের পানিও।

ইতিহাসের এসব কুশীলব ও বিশেষ করে যারা ইতিহাস নির্মাণের পেছনে বসে কাজ করেন তাদের কথা ওই সাগরের পানির মতো দেশের মানুষও ঠিকমতো জানতে পায় না কখনো।

মঙ্গলবার (৬ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে মারা যান ডা. এসএ মালেক। রাত ১১টা ৫৯ মিনিটে তিনি আর এ পৃথিবীতে নেই—এ খবরটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমেই মনে হয়েছে, মানুষটির মৃত্যুসংবাদ আসবে কেবল প্রধানমন্ত্রীর সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। অথচ এ মানুষটি যে ইতিহাসের কত চড়াই-উতরাইয়ের সঙ্গে জড়িত তা কেউ কোনো দিন জানবে না।

বাংলাদেশের ইতিহাসে যেমন ১৯৭১ আছে, তেমনি ১৯৭৫-ও আছে। ১৯৭৫ আওয়ামী লীগের কাছে এতই আকস্মিক ছিল যে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগ ওই অর্থে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এমনকি এখনো ১৯৭৫-কে সঠিক বিশ্লেষণ করা হয় কিনা তাও নিয়ে প্রশ্ন আছে। যাক সে প্রসঙ্গ এখানে নয়।

১৯৭৫-এর যে পার্লামেন্টের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন ও বাকশাল হয়েছিল—ওই পার্লামেন্টের একজন মেম্বার ছিলেন ডা. এসএ মালেক। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর ওই পার্লামেন্ট সদস্যদের মাধ্যমে মোশতাককে সমর্থন না দেয়ার যে চেষ্টা হয়েছিল সে সমর্থন না দেয়াদের নেতৃত্বের একজন ছিলেন ডা. এসএ মালেক। কিন্তু সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তিনি সীমান্ত পাড়ি দেন। তারপরে দীর্ঘ ইতিহাস। অনেকের কাছে সেই ইতিহাসের একটি ক্ষুদ্র অজানা অধ্যায় হলো, সেদিন বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর যারা সশস্ত্র প্রতিবাদ করার জন্য ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা ১৯৭৭-এ ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতা হারানোর পরে মোরারজী দেশাই প্রধানমন্ত্রী হলে চরম বিপদে পড়েন। দেশাই সরকার তখন তাদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশ সরকারও কথা দিয়েছিল তাদের ক্ষমা করে দেয়া হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে প্রথমে যে ছোট দলটিকে পাঠানো হয় সে দলটি নিখোঁজ হয়ে যায়।

এ বিপদের কথা জানতে পেরে সেদিন ভারতে আশ্রয় নেয়া আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এমনকি আতঙ্কিত হন ওই বিদ্রোহী গ্রুপের নেতারাও। ওই দুর্দিনে তখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসব নেতাকর্মীর দিল্লিতে যাওয়ার পথ খরচও ছিল না। যতদূর জানি সেদিন লতিফ সিদ্দিকীর স্ত্রীর গহনা বিক্রি ও ডা. এসএ মালেক সেখানে যে প্র্যাকটিস করতেন সেই অর্থ দিয়ে তাদের তিনজনের একটি দল দিল্লিতে যান। লতিফ সিদ্দিকী পারিবারিকভাবে এবং ডা. এসএ মালেক ব্যক্তিগতভাবে ওই সময়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির ঘনিষ্ঠ ছিলেন। দিল্লিতে তারা অটল বিহারি বাজপেয়ির সঙ্গে কয়েকটি মিটিং করেও খুব বেশি সফল হননি। কারণ, অটল বিহারি বাজপেয়ি কোনো মতেই তার প্রধানমন্ত্রী দেশাইকে বোঝাতে সক্ষম হননি। সে সময়ে তারা দেখা করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাদের দীর্ঘ বৈঠকের মধ্যেই তাদেরকে সামনে রেখে ইন্দিরা গান্ধী টেলিফোনে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী দেশাইয়ের সঙ্গে। এর পরও অনেক ইতিহাসের অন্তরালের ঘটনা আছে। যার ভেতর দিয়ে সেদিন হাজার হাজার আওয়ামী লীগ কর্মীর প্রাণ রক্ষা হয়। আর এ অন্তরালের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডা. এসএ মালেকের কাজ, যা হয়তো কোনো দিন আওয়ামী লীগের ইতিহাসেও লেখা হবে না।

সুদিন ও দুর্দিন এ দুই সময়েই একটি দল ও তার সমর্থক নেতাদের কাছ থেকে না দেখলে যেকোনো নেতাকর্মীর পক্ষে বাস্তবতা বোঝা সহজ হয় না। সবার হয়তো সুদিনের সুযোগ ও দুর্দিনের কষ্ট দুটির সঙ্গে থাকার সুযোগ হয় না। আবার এ সুযোগ হলেও অনেকেই সত্যকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন না। কিন্তু ২০০১-এর পর ডা. এসএ মালেককে দেখেছি সেই সত্যকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে। কারণ ২০০১-এর আগে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে প্রতিদিন তিনি বহু মানুষকে পেয়েছেন। এমনকি ২০০১-এ ক্ষমতা ত্যাগের আগে তিনি সরকারি প্রশাসনের সহায়তায় বিভিন্ন জেলায় বিশাল বিশাল মুক্তিযোদ্ধা-জনতা সমাবেশ করতেন। আবার ২০০১-এর নির্বাচনে তিনি মাঠ পর্যায়ে সে প্রশাসনের ভিন্ন রূপ দেখতে পান। অনেকের ভিন্নরূপ দেখতে পান ২০০১-এর ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর। 

১৯৯৬-২০০১ এর মাঝামাঝি আওয়ামী লীগ সত্যিকার সংসদীয় গণতান্ত্রিক পথে দেশ চালানো এবং শুধু দেশের আর্থিক উন্নয়ন নয়, সামাজিক ও মনোজাগতিক উন্নয়নের পরও ২০০১ এর বিপর্যয় সম্পর্কে একটি স্পষ্ট উপলব্ধি ও মতামত ছিল ডা. এসএ মালেকের। তেমনি তার উপলব্ধিতে অনেক ব্যাখ্যা ও মতামত ছিল ১৯৭১ ও ’৭৫ নিয়ে। এমনকি আজ যে বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন হয়েছে তা নিয়েও তার নিজস্ব মতামত ও ব্যাখ্যা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, এভাবে রাজনীতি ও ক্ষমতা সবকিছুকে কাছ থেকে দেখার পর এবং উপলব্ধি করার পরও তিনি এ বিষয়গুলো লেখেননি কোনো দিনই। শুধু ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে একাডেমিক আলোচনায় বলতেন। তার সে একাডেমিক আলোচনার সঙ্গে রাজনৈতিক লেখা মেলালে বোঝা যায়, নিজের স্বাতন্ত্র্য মেধাকে তিনি রাজনীতির স্বার্থে কখনো প্রকাশ করেননি, বরং তিনি যা কিছু করে গেছেন সবই তার দল ও দলের চলমান রাজনীতির স্বার্থে। এটাকেই তিনি আপাত বাংলাদেশে বড় মনে করতেন।

তবে ১৯৯৬-এর সরকারে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে তার বিভিন্ন কাজ বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক হিসেবে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। তার ভেতর একটি বিষয়ই আজ তার মৃত্যুর পর বড় বেশি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তিনি কত দক্ষতা ও নিপুণতার সঙ্গে তার অবস্থানে বসে ক্ষমতানুযায়ী ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের হাত থেকে রাজনীতি গ্রাস করাকে রক্ষা করে যেতেন প্রতি মুহূর্তে, যা প্রকৃত অর্থে একটি দেশের রাজনৈতিক শক্তিকে শক্তিশালী করে। প্রকৃত রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠায় করে সহায়তা।

বাস্তবে রাজনীতির এ জেনারেশনের সঙ্গে হয়তো বর্তমান জেনারেশনের চিন্তাভাবনা মিলবে না। কিন্তু এ কথা সত্য, বর্তমান জেনারেশনের বেশির ভাগের থেকে তারা অনেক বেশি রাজনৈতিক শক্তিতে বিশ্বাস করতেন। এবং এটাও সত্য বাংলাদেশে ওই জেনারেশন এখন ক্রমেই পৃথিবী থেকে চলে যাচ্ছে। ডা. এসএ মালেকও চলে গেলেন ওই বিশ্বাস নিয়ে অনেক নীরবে।

 

স্বদেশ রায়: একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক