মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা পেশাজীবী হিসেবে ১৫ বছরের অধিককাল কাটিয়ে ইতিমধ্যে অনেকের সাথেই আমার একপ্রকার যোগাযোগ হওয়ার সুযোগ হয়েছে। তাছাড়া একই সাথে কয়েকটি কোম্পানিতে কাজ করার অভিজ্ঞতাও আমার হয়েছে। তাই অনেকেই আমার কাছে চাকরি প্রার্থী হয়ে আসেন। আমি একজন দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা পেশাজীবী হিসেবে নিজেকে এখনও পুরোপুরি তৈরি করতে পারিনি, কিন্তু চেষ্টা করে যাচ্ছি। দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা পেশাজীবী হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে না পারলেও সহকর্মীদের ভালবাসা পেয়েছি। তাই একটু-আধটু পরামর্শ দেয়ার সুযোগ হলে নিজেকে একজন নগণ্য পরামর্শদাতা হিসেবে মনে করি। যদিও এটা নিজের প্রশংসা নিজের করা হচ্ছে। কিন্তু এ কথার পিছনে কিছু কারণ রয়েছে। অনেক সময় নিজের প্রশংসা নিজের করতে হয়। নিজের কর্ম দ্বারা যখন নিজেই নিজেকে প্রশংসিত করতে পারবো, তখন অন্তত নিজের মূল্যায়ন করার সুযোগ হবে। তাছাড়া আমাদের দেশটা অত্যন্ত ছোট আর ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করলে একে অপরের সাথে সহজেই পরিচিতি লাভ করতে পারি। এক কোম্পানি ছেড়ে অন্য কোম্পানিতে ছেড়ে যাওয়া মানে সহকর্মীদের সাথে চিরতরে বিচ্ছেদ নয়।

কর্মক্ষেত্রে বিতর্ক হলো কোনো বিষয়ে ভালো সিদ্ধান্ত বের করে আনা। বিতর্কে মেজাজ সামলানো হচ্ছে প্রকৃত পেশাজীবীর পরিচয়। বিতর্কের বিষয় নিজের মনের ভিতর লুকিয়ে রাখলে তা অবশ্যই কর্মক্ষেত্রকে অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতির দিকে টেনে নিবে এবং যার রেশ ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে যাবে। ‘সুযোগ পেলে সাইজ করবো’ – এমন মনোভাব নিজের ভেতরে রাখা উচিত নয়। এমনতো হতে পারে যে, নিজেই সাইজ হয়ে গেছেন। দেশের চাকরির জগৎটা বিশেষ করে প্রাইভেট চাকরির পরিসর খুবই সীমিত। অনেকেই অনেককে চেনেন-জানেন। ধরুন, আপনার পূর্বতন কোম্পানির কেউ অফিশিয়াল কাজের বিতর্ককে ব্যক্তিগত হিসেবে নিয়ে আপনার সাথে সদ্ব্যবহার না করে সারাক্ষণ আপনার পেছনে অহেতুক লেগে থাকেন। আপনি নিশ্চয় ওিই ব্যক্তিকে আপনার গুড বুকে রাখবেন না। তার প্রতি সর্বদাই আপনার নেতিবাচক দৃষ্টি থাকবে। হঠাৎ এক সময় দেখা গেলো তিনি আপনার বর্তমান প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করেছে। তখন নিশ্চয় আপনি আপনার কর্তৃপক্ষকে তার সম্পর্কে ভালো ধারণা দেবেন না। না দেওয়াটাই স্বাভাবিক। 

তাই কাজের পরিবেশে আপনাকে অবশ্যই নম্র, ভদ্র ও বিনয়ী হতে হবে। আপনার বিনয় ও ভালো ব্যবহার কখনো দুর্বলতা নয়, বরং সফলভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি হবে। সুন্দর বা বিনয়ী ব্যবহার ছোট বড় সবাই পছন্দ করে। কিন্তু আমরা প্রায়ই অপরের সাথে সুন্দর বা বিনয়ী ব্যবহার করতে ভুলে যাই। সামান্য একটু অসতর্কতার কারণে আমাদের আচরণে একজন মানুষ অনেক কষ্ট করতে পারে। তাছাড়া সুন্দর ব্যবহার সুন্দর মনের পরিচয় বহন করে। একসাথে কাজ করতে গেলে অন্যের সাথে সমস্যা বা কলহ সৃষ্টি হতেই পারে। তাই বলে রাগ বা ক্ষোভের ক্ষেত্রে সীমা লংঘন করা কখনোই উচিৎ নয়। সহকর্মী বা যে কারো ভুল হাসিমুখে বুঝিয়ে দিন। সেই সাথে নিজের দোষ ত্রুটি মেনে নেয়ার সৎ সাহসও আপনার মাঝে থাকতে হবে। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, আপনার ভালো ও বিনয়ী আচরণ যে শুধুমাত্র বস ও সহকর্মীদের জন্য বরাদ্দ থাকবে তা কিন্তু নয়। বরং যারা অফিসের অন্য কাজে নিয়োজিত আছেন যেমন ক্লিনার বা পিয়ন তাদের সাথে একই আচরণ করতে হবে। কারন বাসার পরই অফিসের মানুষগুলোই বেশি কাছের। আমি আমার পূর্বতন কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জেনেছি, তিনি সেই কোম্পানিতে যোগদানের আগে তার গাড়িচালকের কাছ থেকেই সে কোম্পানি সম্পর্কে জেনে যোগদান করেছেন, কারণ তার গাড়িচালকের সাথে সেই কোম্পানির কিছু কর্মচারী ও কর্মকর্তার সাথে ভালো জানাশুনা ছিল। 

কখনো কখনো কর্তব্য বা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কাউকে শাসন করতে হয়, অনেক সময় শাস্তি দিতে হয়। এমন শাসন বা শাস্তি সুন্দর ব্যবহারেরও উপাদান। কারণ এ ধরনের আচরণ মানুষকে শোধরানোর সুযোগ করে দেয়। কিন্তু এ শাসন বা ব্যবহার যদি হয় অহংকার বা ক্ষমতার তাহলে তা হবে অন্যায়। কেউ নিরব বা চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে। কেউ সারাক্ষণ কাজের মাঝে ডুবে থাকতে পছন্দ করে আবার কেউ আড্ডার সাথে কাজ করতে পছন্দ করে। যে যেমনই হোক আপনার চাই সবার সাথে সুন্দর সম্পর্ক। যে যা পছন্দ করুক অফিসে ইতিবাচক পরিবেশ না থাকলে কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি পারিবারিকভাবেও মানসিক স্ট্রেসে থাকে। গবেষকরা এর সমাপনী টানেন এভাবে যে, মানুষের অত্যধিক মৃত্যু ঝুঁকির জন্য শুধু অধিক কর্মঘণ্টা কিংবা মন্দ বস নয়, দায়ী সহকর্মীরাও। তারা বলেন, যাদের ক্ষেত্রে সহকর্মীদের সামাজিক সমর্থন বেশি তাদের মৃত্যু ঝুঁকি কম।   

আপনি খুবই একজন দক্ষ কর্মকর্তা বা কর্মচারী কিন্তু আপনার সহকর্মীদের সাথে আপনার সম্পর্কে পেশাসুলভ নয়, তাহলে আপনার দক্ষতা অনেক সময় বৃথা যেতে পারে। আমরা যে প্রতিষ্ঠানেই কাজ করি না কেন, নিজেকে একশত ভাগ উজাড় করে দেন। অফিসের কোনো  বিতর্ক ব্যক্তিগত নেয়া উচিত নয়। অফিস মানেই পরিবারের বাইরে আরেকটি পরিবার। পার্থক্য একটাই নিজের পরিবারের বন্ধন যেমনটা অটুট থাকে, অফিসের পরিবার তেমন অটুট নয়। রাগ, অভিমান হবেই, তাই এমন আচরণ করা যাবে না যাতে সম্পর্ক নষ্ট হয়। 

মূলত, কর্মসংস্থাগুলো অনেক মানুষের নেটওয়ার্ক নিয়ে গঠিত। মানুষ পরস্পরের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রেখে প্রতিষ্ঠানের কাজে অগ্রগতি সাধন করে। ফলে কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের আচরণ হওয়া উচিত বন্ধুসুলভ। তবে আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে যে, আপনার কতটা ঘনিষ্ঠতা গড়তে হবে কতটা দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সহকর্মীদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা আপনার কর্মক্ষেত্রে যেন সমস্যার‌ও সৃষ্টি না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখুন সবসময়। তাই কর্মক্ষেত্র হওয়া উচিত পেশাসুলভ। 

লেখক: ব্যবস্থাপক, মানব ও প্রশাসন
মুন্ডিফার্মা (বাংলাদেশ) প্রাইভেট লিমিটেড