মিয়ানমারের রাখাইনে ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি ও দেশটির সামরিক বাহিনীর মধ্যে যে তুমুল লড়াই চলছে তা নিয়ে মোটামুটি বাংলাদেশের মিডিয়া উত্তেজিত! মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ কী? মিয়ানমারের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী? রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ কী? এ অঞ্চলের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কতটা হুমকির মুখে পড়বে? মিয়ানমারে যখন সিভিল ওয়ার চলছে, তখন বাংলাদেশের করণীয় কী? নানা বিষয় নিয়ে চলছে বহুমুখী বিচার-বিশ্লেষণ। অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে মিয়ানমারের ‘আপ-টু-ডেট’ অবস্থা বাংলাদেশের ইলেকট্রনিকস ও প্রিন্ট মিডিয়া প্রায় প্রতিযোগিতা দিয়ে প্রকাশ ও প্রচারের চেষ্টা করছে। পেশাদারত্বের জায়গা থেকেও সেটা প্রশংসনীয়। তবে বাংলাদেশের মানুষ যে কেবল মিডিয়ার মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যা ঘটছে সে সম্পর্কে অবহিত হচ্ছে, শুধু তা-ই নয়, বরং সীমান্তবর্তী এলাকায় বিভিন্ন সময় ওই লড়াইয়ের নগদ ফল হিসেবে যে মর্টার শেল বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে এসে পড়ছে, তাতেই বোঝা যায় সেখানে তীব্র লড়াই চলছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মধ্যে যে তুমুল লড়াই হচ্ছে তার প্রভাব আসলে কীভাবে বা কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশে পড়ছে তা আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এ কথা অনস্বীকার্য যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে রাখাইন রাজ্যের এ লড়াইয়ে বাংলাদেশে বহুমাতৃক অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তাজনিত প্রভাব পড়ছে। আজকের এ নিবন্ধে আরাকানের চলমান লড়াইয়ে বাংলাদেশে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, সে বিষয়ে সামান্য আলোকপাতের চেষ্টা করা হয়েছে।
রাখাইনে আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর যে লড়াই চলছে তার কারণে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ছে। অক্টোবরের ২৭ তারিখ থেকে ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’-এর ‘অপারেশন ১০২৭’ শুরু হলেও ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে রাখাইনে এ লড়াই এত তীব্রতা ধারণ করেছে যে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার অনেক মানুষকে নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছে। লড়াইয়ে ছোড়া মর্টার শেল বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে এসে পড়তে শুরু করলে এ আতঙ্ক অধিকতর তীব্রতা পায়। যখন এই মর্টার শেলের আঘাতে বাংলাদেশে দুজন মানুষ মারা যায়, তখন সীমান্তবর্তী মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ফেলে দূরবর্তী এলাকায় গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। ফলে সীমান্তবর্তী মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার যে সংস্থান এবং ব্যবস্থা, সেটা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন অর্থনৈতিকভাবে রীতিমতো স্থবির হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষ তাদের ফসলের জমি দু-তিন সপ্তাহ ধরে ফেলে রাখার কারণে সেখানে নানা ধরনের আগাছা জন্ম নিয়েছে এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
এছাড়া রাখাইনে চলমান লড়াইয়ের কারণে তীব্র গোলাগুলির শব্দে সীমান্তবর্তী এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় সীমান্তবর্তী এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থায়ও একটা বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। আমরা জানি ঘুনধুম এবং তমরু সীমান্ত এলাকার প্রাইমারি স্কুলগুলো অনেক দিন থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান আতঙ্কের কারণে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। চলমান এসএসসি পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত একটি কেন্দ্র বাতিল করে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়ও রাখাইনের লড়াইয়ের একটা বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা এবং চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করায় পর্যটন শিল্প রীতিমতো হুমকির মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একটি অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠলেও রাখাইনে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মধ্যে তুমুল লড়াই চলার কারণে এ বছর সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাওয়া রীতিমতো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সেন্ট মার্টিন কেন্দ্র করে যেসব মানুষের জীবন-জীবিকা ও অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা ছিল, ভরা মৌসুমেও সেটা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা একটি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
শুধু সেন্ট মার্টিনই নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামও বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের একটি অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান, যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক ভ্রমণ করে। কিন্তু সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, বিশেষ করে বান্দরবান সীমান্তে এ ধরনের লড়াই ও সংঘাত যে নিরাপত্তাহীনতা এবং আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছে, তাতে পার্বত্য চট্টগ্রামেও পর্যটকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত অনেক মানুষ, যাদের একটা বিরাট অংশ এসব পর্যটন শিল্প কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের জীবন-জীবিকা একটা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এ আর্থিক ক্ষতি কবে পুষিয়ে নেয়া যাবে, তা নিয়েও পর্যটন শিল্পের অংশীজনরা রীতিমতো একটা শঙ্কার মধ্যে পড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, মিয়ানমারের এ ‘সিভিল ওয়ার’ এবং চলমান লড়াই কবে বন্ধ হবে, নিরাপত্তাহীনতার এ অবস্থা কত দিন বিরাজ করবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্প কেন্দ্র করে মানুষের জীবন ও জীবিকা একটা চরম অনিশ্চয়তা মুখে পড়েছে।
রাখাইনের চলমান এ যুদ্ধাবস্থার কারণে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত বাণিজ্যে। স্থলপথে ও নদীপথে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য সম্পর্ক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পাশাপাশি এসব সীমান্ত বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী, শ্রমিক শ্রেণী এবং বিভিন্ন বাহন-সংশ্লিষ্ট মানুষ চরমভাবে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশ কোটি কোটি টাকা সীমান্ত বাণিজ্যের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
মিয়ানমারের চলমান ‘সিভিল ওয়ার’-এর কারণে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়াটি। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী একটি রক্তপাতহীন সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর থেকে এ প্রক্রিয়া রীতিমতো বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে আমরা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর জন্য এক ধরনের নড়াচড়া লক্ষ করেছি। আমরা দেখেছি মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ এসে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছে; আবার রোহিঙ্গাদেরও একটি প্রতিনিধি দল মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা ভ্রমণ করে এসেছে। এ রকম পারস্পরিক যোগাযোগ এবং গমনাগমনের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া নতুন করে শুরুর যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সেটা রীতিমতো মুখ থুবড়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পড়েছে উভয় সংকটে, কেননা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে এখন মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা খানিকটা সমস্যাজনক। কারণ মিয়ানমারের সামরিক সরকার যেমন দেশের অভ্যন্তরের জনগণের আস্থা হারিয়েছে, তেমনি দেশের বাইরেও জান্তা সরকারের গ্রহণযোগ্যতা প্রায় শূন্যের ঘরে। তাছাড়া রাখাইন রাজ্যের ওপর এখন জান্তা সরকারের আর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফেরত যাবে সে রকম আস্থার পরিবেশ তৈরি করার সক্ষমতা মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে আর নেই। অন্যদিকে আরাকান আর্মি, যারা রাখাইনের ৬০ শতাংশ বা ৭০ শতাংশ এলাকার কর্তৃত্ব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি করছে, তাদের সঙ্গেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ফরমাল কোনো কূটনৈতিক চ্যানেলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয়, কেননা বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের কূটনৈতিক সম্পর্কের কাঠামোতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রঘোষিত কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশ ‘দ্বিপক্ষীয়’ আলোচনা করতে পারে না। কিন্তু আরাকান আর্মি যেভাবে ক্রমান্বয়ে রাখাইন রাজ্য দখল করছে বলে দাবি করছে, তাতে করে আরাকান আর্মির সঙ্গে একটা আরামদায়ক যোগাযোগ স্থাপন এবং আস্থার বোঝাপড়া প্রতিষ্ঠা করা না গেলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি ভবিষ্যতে নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়বে। ফলে মিয়ানমারের চলমান সিভিল ওয়ার বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আরো কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলছে। একটি প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মিয়ানমারের চলমান সিভিল ওয়ারের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে সবকিছু অত্যন্ত সচেতনভাবে, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে, বাস্তবতার নিরিখে এবং কূটনৈতিক রীতি-নীতির ভেতর দিয়ে ‘ডিল’ করতে হচ্ছে।
তাই মিয়ানমারে চলমান ও ক্রমবর্ধমান সিভিল ওয়ারের যে নানামুখী সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রভাব বাংলাদেশে পড়ছে তার জন্য ক্ষতিপূরণ চাওয়ারও তেমন কোনো সুযোগ এ মুহূর্তে বাংলাদেশের নেই। তবে এই সিভিল ওয়ার যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে যদি এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করে, তবে বাংলাদেশকে এর ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উত্থাপনের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করতে হবে। কেননা এ লড়াইয়ের দীর্ঘস্থায়িত্ব সীমান্ত-বাণিজ্য, বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকা, পর্যটন শিল্প, সীমান্তবর্তী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ক্রমান্বয়ে একটা বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই বাংলাদেশকে একটি যথাযথ, সময়োপযোগী এবং কার্যকর কূটনীতি ও কূটনৈতিক পলিসি গ্রহণ করতে হবে, যাতে এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হয়। অন্যথায় মিয়ানমারের সিভিল ওয়ারের চড়া মূল্য বাংলাদেশকেই গুনতে হবে।
ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়










