[গতকালের পর]

৩. ভোটারদের শ্রেণীস্বার্থ, আস্থা ও বিশ্বাস: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের একটা বড় অংশই হাই স্কুল ড্রপ বা কলেজে গেলেও আন্ডার কলেজ গ্র্যাজুয়েট। অন্যান্য অনেক দেশের মতো ভোট দেয়া বা নির্বাচনের ব্যাপারে এদের উৎসাহ অতটা বড় নয়। এখানে ভোট দেয় ৫০-৬০ শতাংশ। বাকিরা হয় এই রাজনীতি, ভোট, দল—এসবে কম আগ্রহী অথবা ভোট দিতেই যান না। মার্কিন জনসংখ্যা (২০১৯-এর জরিপ অনুযায়ী) আনুমানিক ৩২ কোটি ৯৯ লাখ ৬৮ হাজার ৬২৯ মিলিয়ন। অর্থাৎ প্রায় ৩৩ কোটি। কিন্তু এত বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র দুটি রাজনৈতিক দলই ক্ষমতার বা রাজনীতির মাঠে সোচ্চার সেই ১৮৫০ সাল থেকে। আরো কিছু রাজনৈতিক দল যেমন গ্রিন পার্টি, লিবারেটেরিয়ান, কনস্টিটুয়েশন পার্টি, টি-পার্টি—এ রকম প্রায় জানা ও অজানা ডজন খানেক দল থাকলেও প্রধানত দুটি দল, ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকানই, রাষ্ট্র পরিচালনা করে। ভোটারদের সংখ্যা ২০১৮ হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১৫৩ দশমিক শূন্য ৭ মিলিয়ন হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইলেকটোরাল কলেজের মাত্র ৫৩৮ ভোটের মাধ্যমেই প্রেসিডেন্ট চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন। এক্ষেত্রে মোট ভোটার বা জনসংখ্যার ইচ্ছা, স্বাধীনতা, আস্থা, বিশ্বাস—এসবের বাস্তব চর্চার ব্যাপারটা এক রকম সীমিত বেষ্টনীতে বন্দি। সময়ের পরিবর্তন, বিশ্ব অর্থনীতির বেহাল, সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা বৈষম্যের কারণেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের আস্থা ও বিশ্বাসের দাগগুলো ধূসর, অস্থির ও দোদুল্যমানতায় ভরা। চতুর রাজনীতিকরা এই ঘোলা পানিতেই মাছ ধরতে চেষ্টা করেন। অন্য অনেক সমাজ ও রাষ্ট্রের মতোই মার্কিন মুলুুকেও হিরো ওয়ারিশপ বলতে আদর্শ বা নীতি নয়, ব্যক্তি বা দলই ভোটারদের বেশি আকর্ষণ করে। তাদের আস্থা ও বিশ্বাস নির্ভর করে ভোটপ্রার্থী ব্যক্তি এবং তার দল বা শ্রেণী কতটা সুন্দর করে মিথ্যা বলতে পারে বা অসুন্দরকে সুন্দর মোড়কে উপস্থাপন করতে পারে জনসাধারণের সামনে। ভোটারদের অনেকের মনস্তাত্ত্বিক ইতিবাচক ইচ্ছা ও স্বাধীনতার সঙ্গে তাদের বাস্তব আচরণে বিপরীতমুখী চরিত্রও লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে ব্যক্তির আনুগত্যে ভাবদর্শনের চেয়ে বস্তুবাদী স্বার্থ এবং এর তাত্ক্ষণিক যোগ-বিয়োগ চিন্তা ভোটারকে তাড়িত করে। এগুলো প্রার্থীর এবং দলের মিথ্যাচারিতা, চতুরতা, কৌশলের বাইরে ভোটার বা নাগরিকের সৎ ও স্বাধীন ইচ্ছাকে প্রভাবিত করে। ভোটারদের স্বাধীন চিন্তা ও মতামতের বাস্তব রূপায়ণে আরেক অন্তরায় নির্বাচনে ইলেকটোরাল কলেজের অস্তিত্ব এবং এর প্রভাব। যেটা ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলে দেখেছি এবং দ্বিতীয় বুশ এবং আল গোরের নির্বাচনের রায়েও লক্ষ করেছি। এ পদ্ধতিটা অবলুপ্ত না হলে ভবিষ্যতেও মার্কিন নাগরিক এবং ভোটারদের স্বাধীন ইচ্ছা, আস্থা ও বিশ্বাসের পূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপায়ণে তা অন্তরায় হবে। সেক্ষেত্রে গণতন্ত্র বলতে পপুলার রায় বাস্তবায়ন না হওয়ার সম্ভাবনাই থাকবে বেশি। উল্লিখিত তিনটি দিক ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ২০১৬-এর মতোই বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। সেই প্রভাবটা ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে যাবে কিনা, তা এখনো বেশ ঝুঁকি ও শঙ্কার মধ্যে আছে। এর দুটি প্রধান কারণ—ক. ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা কেউই এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নির্বাচনে পরাজিত করার মতো নাগরিকদের বেশি কিছু প্রাপ্তিতে আশান্বিত করতে পারছেন না। ভোটার ও নাগরিকরা আগের চেয়েও বাস্তবতার বিচার-বিশ্লেষণে বেশি দক্ষ এবং সচেতনও বটে। ট্রাম্পের পরিবর্তে সাধারণ নাগরিকদের স্বার্থ বিবেচনায় তেমন কিছু ব্যতিক্রম এ দলের থেকে এখনো ভোটাররা পাননি। অভিবাসী সমস্যা, ধর্মবিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ সমস্যার সুস্পষ্ট ইতিবাচক সমাধান কী এবং কবে হবে, সেটা ডেমোক্রেটিক পার্টি এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট করতে পারছে না বলেও অনেক ভোটার মনে করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতার অপব্যবহার, মিথ্যাচারিতা—এসব পুঁজিবাদী সংস্কৃতির এক সময়ের একেক রকমের বাস্তবতা। একে প্রতিরোধ করতে যে আদর্শিক চেতনা ও নীতির চর্চা প্রয়োজন, ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যেও তার সীমাবদ্ধতা আছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির যেসব সমাজ ও রাষ্ট্র কল্যাণমূলক ভাবনা বা প্রস্তাব আছে—চিকিৎসা ব্যবস্থায় সবার জন্য সুযোগ প্রসারিত করা; কলেজশিক্ষার ব্যয়ভারে সরকারের ভর্তুকি বহন করার প্রস্তাব; নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষণ—এগুলো কথা ও বক্তৃতায় যতটা সহজ মনে হয়, মার্কিন অর্থনীতির মূল চরিত্র বা আদর্শে সেটা কতটা সম্ভব, ভোটারদের মধ্যে এ ব্যাপারেও সন্দেহ আছে। অনেক ভোটারের কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্প সুচিহ্নিত শত্রু হলেও ডেমোক্র্যাটরা ছদ্মবেশী অথবা কল্পনাপ্রসূত ভাবনায় ভুগছেন। পাশাপাশি ইদানীং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে যে প্রগতিশীলতা দেখা যায়, সেটাকে অনেকেই দলে বামপন্থী প্রভাব বলে মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রে যার বাস্তবতা কঠিন। খ. অর্থনৈতিক গতি। এ দিকটায়ও বড় কোনো ধস আসেনি ট্রাম্প প্রশাসনের গত তিন-সাড়ে তিন বছরে এখনো। বেকারত্বের সংখ্যা বাড়েনি। ট্রাম্পের আয়করের ক্ষেত্রে উচ্চবিত্তদের বেশ সুবিধা দেয়ায় তাদের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের অবকাশ বাড়ছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে এখনো ওবামা কেয়ার সরকার পুরোপুরি রহিত করতে পারেনি। বিষয়গুলো সাধারণ ভোটারদের মধ্যে মেটার করে। আর রিপাবলিকানদের ভয় বা আশঙ্কার জায়গা, বর্তমান প্রেসিডেন্টকে হাউজ বা সিনেটে অভিশংসন করার উদ্যোগ এবং পদক্ষেপে ডেমোক্রেটিক পার্টি অগ্রসর হচ্ছে, সেখানে যদি জনরায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিশংসন করে, তাহলে এর একটা প্রভাব এবং নেতিবাচক ফল ট্রাম্পকে দ্বিতীয়বার বিজয়ী না-ও করতে পারে। আর অভিশংসন হয়ে গেলে তো সেটা ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষেই যাবে। বর্তমান প্রেসিডেন্টের মিথ্যাচারিতা, শঠতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারে নাগরিকরা অতিষ্ঠও। এ রকম নেতৃত্ব কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নয়, বিশ্বের জন্যও বিপজ্জনক হবে। এ বিষয়টাও রিপাবলিকানরা যে জানেন না বা বোঝেন না, এটা নয়। কিন্তু ‘ক্ষমতা’ তাদের মুঠো থেকে প্রতিপক্ষের কাছে যাতে না যায়, অনেকটা সে কারণেও রিপাবলিকানরা ট্রাম্পকে অন্ধের মতো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসনের বিষয়ে প্রকাশ্য জিজ্ঞাসাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে যেসব তথ্য বেরিয়ে আসছে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পেশাদার উচ্চপদস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে, তার প্রভাব ভোটারদের মধ্যে যে পড়বে না, তা বলা যাবে না। সেসব তথ্যে প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক দুর্নীতিটাও স্পষ্ট। কিন্তু এ বিষয়টা সাধারণ নাগরিকদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে কোনো অনিশ্চয়তা আনছে না আপাতত। সাধারণ নাগরিক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিশংসনের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সেভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না। তবে শেষ পর্যন্ত অভিশংসন হলে সেটা রিপাবলিকান পার্টির জন্য ইতিবাচক যে হবে না, দল সেটা বোঝে। তাই এ দিকটায় রিপাবলিকান পার্টি কিছুটা আতঙ্কিত। ২. দলের দ্বিতীয় আশঙ্কাটা ভোটারদের জনমিতিক বহুধাবিভক্তির কারণে নীরব জনগোষ্ঠীর কোনো বড় অংশ যদি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর তাদের আস্থা বা বিশ্বাস না রাখে, তার একটা প্রভাব ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার বিজয়কে চ্যালেঞ্জের মুখে নিয়ে যেতে পারে। বিষয়টা সুস্পষ্ট হবে চূড়ান্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী ডিবেটে প্রতিপক্ষ ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্পের সঙ্গে কীভাবে লড়েন এবং ভোটারদের ট্রাম্পের বিপক্ষে উদ্বুদ্ধ করতে কতটা সফল হতে পারেন। প্রেসিডেন্ট ওবামা কিংবা বিল ক্লিনটনের মতো ক্যারিশমাটিক প্রতিনিধি ডেমোক্রেটিক পার্টিতে এখনো দেখা যাচ্ছে না, যেখানে দাঁড়িয়ে বলে দেয়া সহজ হতো—ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এ পর্যায়ে বিষয়টা এখনো ট্রাম্পের স্বপক্ষে, আনুপাতিক হিসাবে যা ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় একটু বেশি। এক জরিপে দেখা গেছে, ডেমোক্র্যাট পার্টির অগ্রগামী পাঁচ-ছয়জন প্রতিনিধির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো প্রায় দুই-এক ধাপে এগিয়ে আছেন। খুব তীব্র প্রতিযোগিতা হতে পারে এ লড়াইয়ে। এটাতেও রিপাবলিকানরা কিছুটা আতঙ্কিত, যা তাদের আচরণে স্পষ্ট। নির্বাচনে (২০২০) প্রেসিডেন্ট হিসেবে যেকোনো প্রার্থীর বিপুলভাবে জয়ী হওয়ারও একটা ধূসর সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না এ মুহূর্তে। আরো কিছুদিন পর বোঝা যাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট লড়াইয়ে উল্লিখিত ১. প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা, ২. ভোটারদের জনমিতিক চরিত্র এবং ৩. তাদের আস্থা, বিশ্বাস কোন পক্ষে বা বিপক্ষে গিয়ে ঝোঁকে। এ বিষয়ে এর আগেও উল্লেখ করেছি, যা আবারো বলতে চাই। ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার বিজয়কে রুখতে না পারলে সেটা আমেরিকার গণতন্ত্র, বহির্বিশ্বনীতি ও অভ্যন্তরীণ বৈষম্য তীব্র করতে পারে। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তাকেও অধিক অনিশ্চয়তার মুখে নিয়ে যেতে পারে। বিশ্ব ইমেজেও আমেরিকার উজ্জ্বলতা বা প্রশংসা ট্রাম্প দ্বারা অর্জন বা বাড়ানো সম্ভব নয়। ট্রাম্পের সঙ্গে তখন উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া, সিরিয়া এমনকি সৌদি আরবের রাজতন্ত্রের এবং একনায়কতন্ত্রেরও পার্থক্য হবে না। [শেষ]

 

মাহমুদ রেজা চৌধুরী: রাজনীতি বিশ্লেষক 

mahmud315@yahoo.com