সুইডিশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
আক্রান্তের সংখ্যা
প্রচুর হলেও হাসপাতালে ভর্তি
হচ্ছেন তার মধ্যে হাতেগোনা
কয়েকজন। এ অবস্থায় বিধিনিষেধ
আরোপ করে জনজীবন ব্যতিব্যস্ত করার কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন
না তারা।
আগামী দিনে করোনার নতুন কোনো রূপ আবির্ভূত হবে কিনা তা কেউ না জানলেও আপাতত
বিধিনিষেধের কঠোরতা
কমানো হচ্ছে।
গত সপ্তাহে ডেনমার্ক সব বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে। স্পেন ও ইংল্যান্ড একই পথে হাঁটতে শুরু করেছে এবং মাস্ক পরা আর বাধ্যতামূলক নয় সেখানে। আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসেও লকডাউন শিথিল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দৈনিক বিপুল মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ফ্রান্সে, তবুও সে দেশে বেশকিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার মূল কারণ টিকা কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ১২ বছরের বেশি বয়সী প্রত্যেককে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টিকা দেয়া চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কভিড-১৯ থেকে নিজেকে এবং অন্যদের রক্ষা করার সর্বোত্তম উপায় টিকা নেয়া।
৯ ফেব্রুয়ারি থেকে
কভিড পাস সঙ্গে থাকা
লাগবে না। বাধ্যতামূলক দূরত্ব
বজায় রাখা
বাতিল করা হয়েছে। বাস, ট্রেন বা রেস্টুরেন্টে দূরত্ব
বজায় রেখে
বসার সাইনবোর্ড
তুলে নেয়া
হয়েছে। মিছিল-মিটিংয়ে কোনো
বাধা নেই গতকাল থেকে।
সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পেছনে যে জিনিসটি
বেশি গুরুত্ব
পেয়েছে সেটা
হলো, ৭০ শতাংশের বেশি
মানুষ টিকা
নিয়েছে। হার্ড
ইমিউনিটির কারণে
রোগ প্রতিরোধ
ক্ষমতা বৃদ্ধি
পেয়েছে, ফলে করোনা আগের
মতো ভয়াবহ
রূপ ধারণ
করতে ব্যর্থ
হয়েছে। সুইডেনের
৪০ শতাংশ
কর্মী বাড়ি
বসে কাজ করেছেন দীর্ঘ
দুই বছর করোনা মহামারীর
সময়। ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে
সুইডেনের সীমাবদ্ধতা শেষ, সবাই কাজে
ফিরতে শুরু
করেছে অতীতের
সেই কর্মস্থলে। কারো মুখে হাসি,
কেউ এতে খুশি এবং অনেকে বলছেন,
বেশ তো ছিলাম ভালোই
ছিলাম, ক্ষতি
কী ঘরে বসে কাজ করলে! সব মিলে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া সুইডিশদের মাঝে। বিশ্বের
সব জায়গায়
কম-বেশি
ওপেন এবং ক্লোজ পরিবেশ
বিরাজ করেছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় বন্ধ
ছিল এবং ডিজিটাল পদ্ধতি
ব্যবহার করা সত্ত্বেও সবাই
স্কুল মিস করেছে। কী কারণ ছিল এর পেছনে?
জিজ্ঞেস করলে
বেশির ভাগই
বলবে—বন্ধু-বান্ধবীকে মিস করেছি, ব্ল্যাক-হোয়াইট বোর্ডের
সামনে শিক্ষকের
সঙ্গে সরাসরি
ইন্টারাকশন মিস করেছি, একে অন্যের থেকে
অনুপ্রাণিত হওয়া,
অন্যকে উৎসাহিত
করা এবং ক্লাসের ফাঁকে
আড্ডা দেয়া
ইত্যাদিও মিস করেছি। যারা
আনন্দ খুঁজে
পেয়েছে স্কুলে
যেতে, তারা
মিস করেছে
স্কুলকে। যারা
আনন্দ খুঁজে
পায়নি, তারা
বাড়ি থেকে
ডিজিটাল শিক্ষা
পছন্দ করেছে।
সুইডেনের অবস্থা অনেকটা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মতো হয়েছে। কর্মজীবনে কর্মী কাজ করেন আর ম্যানেজার ম্যানেজ করেন। অফিস বা ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা যেমন আনন্দের আবার বিরহেরও। কলিগ বা বস যদি মনঃপূত না হয়, তখন অফিস বা ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা বিরহের, সেক্ষেত্রে অনেকের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে। তারপর গত দুই বছর বাড়ি বসে কাজ করার সুযোগ অনেকে মিস করবে। আবার একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে অফিস বা কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়া অনেকের কাছে বেশ উৎসাহজনক মনে হচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে পুরো মহামারীর সময়টি ইতিবাচকভাবে দেখতে চেষ্টা করছি, কারণ আমরা এখন অফিসে না গিয়েও বা বসের কড়া নজরে না থেকেও কাজ করতে শিখেছি। এতে অনেকে নিজ দায়িত্বে ঘরে বসেও কাজ সেরে নিতে পারবেন। এখন যে জিনিসটা ব্যবস্থাপকদের শিখতে হবে, সেটা হচ্ছে তাদের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। তাদেরও অ্যাডজাস্ট করে চলতে হবে, ফ্লেক্সিবল হতে হবে। সবকিছু ঠিক হতে একটু সময় লাগবে। তবে সব শেষে এটা বলব, অফিসে যাওয়া, কলিগদের সঙ্গে একটু আড্ডা দেয়া—এটাও কিন্তু কাজের একটি অংশ। ক্রিয়েটিভ এবং ভালো কাজের পরিবেশ পেতে দরকার পরস্পরের সহযোগিতা এবং সেটা কম-বেশি কর্মজীবনে সবাই পান। তবে হাইব্রিড কর্মক্ষেত্রগুলো কীভাবে রূপ নেবে? হাইব্রিড কর্মক্ষেত্র মানে আরো নমনীয় পদ্ধতি, যেখানে কর্মীরা তাদের কাজ অফিসে এসে করবেন নাকি বাসায় বসে করবেন কোনো প্রযুক্তিগত বাধা ছাড়া। ম্যানেজমেন্ট কি এ ধরনের কাজের জন্য প্রস্তুত এবং পারবে কি যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি পরিবেশকে কর্মীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং একটি সম্পূর্ণরূপে কার্যকরী ক্লাউড প্লাটফর্মের যে চাহিদা রয়েছে, সেগুলো মেনে চলতে? নতুন পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী কী? নতুন পদ্ধতিতে কাজ করার সুবিধা কী এবং আমরা যা শিখেছি গত দুই বছর ধরে, তা কি সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে যাবে? এসব প্রশ্নের সমাধান পেতে যে জিনিসটির বেশি দরকার তা হলো ম্যানেজমেন্ট স্টাইল। দুই ধরনের ম্যানেজমেন্ট রয়েছে। ম্যানেজমেন্ট বাই অবজেক্টিভস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বাই থ্রেটস! একজন লিডার বা ম্যানেজারের এটা বৈশিষ্ট্য। কিন্তু লিডারশিপ কী? কেন আমাদের জন্য এটা দরকার?
আমরা তো সবাই রক্তে-মাংসে গঠিত মানুষ অথচ কেন অন্য লোক আমাকে বা আমাদের ম্যানেজ করবে বা নেতৃত্ব দেবে? আমাদের শিক্ষা বা কর্মজীবনে কাউকে না কাউকে নেতৃত্ব দিতেই হয়। এখন দেখা যাক, এ নেতৃত্ব কেমন হওয়া উচিত?
শিক্ষকের থেকে শেখা এবং করতে করতে শেখা, সেই সঙ্গে অনুসরণ ও অনুকরণ করা এগুলো মানবজাতির সবচেয়ে বড় অনুশীলন। অন্ধকে পথে চালাতে দরকার নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণের। শিশুর জীবনের শুরুতে অথবা স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনকি চাকরির প্রাথমিক পর্যায়েও দরকার অনুকরণ, অনুসরণ, নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির প্রতিফলন করা।
অন্যভাবে
বলতে হয়, নেতৃত্ব হচ্ছে
সাহায্যের চাবিকাঠি।
একটি তালা
খুলতে একটি
নির্দিষ্ট চাবি
দরকার।
সেই সঙ্গে কিছু শর্তাবলি, যেমন কীভাবে তালাটি খুলতে হবে বা আটকাতে হবে, ‘কাইন্ড অব ইনফরমেশন অ্যান্ড ইনস্ট্রাকশন’। এখন যদি এ নির্দেশ মনঃপূত না হয় বা বোধগম্য না হয়, কোনো লাভ হবে কি ভয় দেখিয়ে? শিক্ষা প্রশিক্ষণ পদ্ধতি বা যিনি এ প্রশিক্ষণের দায়িত্বে, তিনি যদি না জানেন কী শিক্ষা, কীভাবে শিক্ষা, তাহলে তো সুশিক্ষা হবে না। সুশিক্ষার অবনতির প্রতিফলন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নির্দেশ বা ইনস্ট্রাকশনের মধ্যে আবির্ভূত হয়। তখন দরকার পড়ে নেতৃত্বের। এখন এ দিকনির্দেশনা কীভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে? পৃথিবীর সব সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব অনেকটা এমন, ‘ডু অর ডাই—করো নয় মরো’। এই করো নয় মরো কনসেপ্টের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, তাদেরকে সমাজ থেকে ভিন্নভাবে রেখে থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কারণ দে টেক দ্য জব টু সার্ভ দেয়ার কান্ট্রি অ্যান্ড দে আর পেইড ফর স্যাক্রিফাইস দেয়ার লাইফ ইফ নেসেসারি। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে সশস্ত্র বাহিনীর ম্যানেজমেন্ট মানে ম্যানেজমেন্ট বাই এগ্রিমেন্ট বা ডু অর ডাই।
সিভিল প্রশাসনের ক্ষেত্রে যদি একই লিডারশিপ বা ম্যানেজমেন্ট প্রয়োগ করা হয়, হবে কি তার প্রতিফলন ভালো? একজন ভালো ব্যবস্থাপক হতে হলে তাকে প্রথমে একজন ভালো কর্মী হতে হবে। তাকে জানতে হবে কী এবং কেন ইত্যাদি। ম্যানেজার ম্যানেজ করেন আর লিডার বা নেতা দেন নেতৃত্ব। একজন বিশেষজ্ঞ হঠাৎ করে যদি ম্যানেজার বা নেতা হন, তখন সে প্রতিষ্ঠানে সংকট দেখা দেয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে। কারণ এ ধরনের বিশেষজ্ঞের পক্ষে ম্যানেজ বা নেতৃত্ব দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তারা নিজেদেরই সবসময় বেশি পণ্ডিত বলে মনে করেন এবং তাদের আচরণ ও ব্যবহারে তা প্রকাশ পায়। বিধায় কর্মচারী আত্মবিশ্বাস এবং অনুপ্রেরণা হারাতে থাকেন। কিন্তু যদি বিশেষজ্ঞ তার ‘লার্নিং ফ্রর লার্নার’ কনসেপ্ট প্রয়োগ করেন, তখন সেই বিশেষজ্ঞ হতে পারেন একজন ভালো ম্যানেজার বা লিডার।
একজন ম্যানেজারের প্রথম কাজ হবে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক জায়গায় নিয়োগ দেয়া। মিশন, ভিশন, গোলস অ্যান্ড অবজেকটিভস তৈরি করে ম্যানেজমেন্ট বাই অবজেকটিভস কনসেপ্ট ব্যবহার করা। সুশিক্ষিত একজন ম্যানেজার বা লিডার অ্যাপ্লাই বা প্রয়োগ করেন ম্যানেজমেন্ট বাই অবজেকটিভস কনসেপ্ট এবং সবসময় তৈরি করেন মানুষ ও মানবতার জন্য আশাব্যঞ্জক মূল্যবোধ।
অন্যদিকে কুশিক্ষিত একজন ম্যানেজার বা লিডার প্রয়োগ করেন ম্যানেজমেন্ট বাই থ্রেটস পদ্ধতি, যা শুধু অবনতি ও দুর্নীতি সৃষ্টির সঙ্গে অর্থনীতির ক্ষতি করে।
একই সঙ্গে কলুষিত
করে মনুষ্যত্ব,
মানবতা ও সমাজকে। সফল ব্যবস্থাপনার মূলনীতি
বা চাবিকাঠি
হচ্ছে ম্যানেজার
ও কর্মীদের
মধ্যে সততার
মাধ্যমে সুসম্পর্ক
গড়ে তোলা।
অর্থাৎ ‘বিল্ডিং
ট্রাস্ট বিল্ডিং
গ্রোথ’।
রহমান মৃধা: সাবেক
পরিচালক (প্রডাকশন
অ্যান্ড সাপ্লাই
চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন










