জীববৈচিত্র্যের বড় আধার ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ বনভূমি। দুঃখজনকভাবে দেশে বনভূমি নানাভাবে সংকোচনের শিকার। আগেও বিভিন্ন সময়ে এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শনিবার আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ওয়েবিনারেও বিষয়টি আবারো নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। ওই ওয়েবিনারে দেয়া বক্তাদের তথ্য বলছে, ১৯৯০ থেকে ২০১৫ এ সময় পর্বে ৬৫ হাজার হেক্টর বনভূমি হারিয়েছে বাংলাদেশ। একইভাবে বিরাজমান ৩ লাখ ৩১ হাজার সংরক্ষিত বনভূমির প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার একরই জবরদখলে রয়েছে বলে খবর মিলছে। বনভূমি ক্রমাগতভাবে বেদখল হয়ে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। পরিবেশগত স্থায়িত্বশীলতার জন্য এটি হুমকিস্বরূপ।

বনভূমি বেদখল ও উজাড়ের প্রক্রিয়াটি রাতারাতি ঘটেনি। নিরন্তরভাবে, বছরের পর বছর ধরে এটি চলছে। আজকের এ অবস্থার পেছনে কোনো একক ফ্যাক্টর নয়, বেশকিছু ফ্যাক্টর দায়ী। বলতে গেলে গত কয়েক দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, বনভূমিকে কৃষিজমিতে রূপান্তর, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, পাহাড়ি এলাকায় জুম চাষের সম্প্রসারণ, বনজ সম্পদ আহরণে মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন কারণে দেশে বনভূমি এখন ক্রম অপসৃয়মাণ। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার বিষয়টিও বন উজাড় অনেকটা ত্বরান্বিত করেছে। বিশেষত একসময়কার জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ কক্সবাজারের বনভূমির অনেক এলাকা এখন রোহিঙ্গা শরণার্থীর দখলে। কেবল আবাস গড়া নয়, তাদের কারণে কাটতে হয়েছে বিপুলসংখ্যক বনজ গাছ। এর প্রতিবেশগত ক্ষতি অপূরণীয়। সর্বোপরি, বন ধ্বংসে রাষ্ট্রের উন্নয়ন নীতিও একটা প্রভাবক ভূমিকা রেখেছে। শিল্পায়নের মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর সরকার অব্যাহতভাবে জোর দিচ্ছে। উন্নয়নচিন্তায় পরিবেশ, প্রাণ-প্রকৃতি, বনভূমি সুরক্ষার বিষয়টি থাকছে উপেক্ষিত। সব মিলিয়ে দেশে বনভূমি উজাড় হতে হতে এখন ১৩-১৫ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে। এ হিসাব সরকারের বন অধিদপ্তরের। বেসরকারিভাবে ধারণা করা হয়, আমাদের দেশে প্রকৃত বনভূমি এর চেয়ে কম।

জাতিসংঘের বেঁধে দেয়া লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রতিটি রাষ্ট্রে মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকতে হবে। এটা প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য অপরিহার্য। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেশে ক্রমাগতভাবে বনভূমি কমার বিষয়টি ভয়াবহ দুশ্চিন্তার। জাতিসংঘের মানদণ্ড এখনো পূরণ করতে না পারলেও ভারতে কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বনভূমির পরিমাণ বেড়েছে। ২০১১ সালে যেখানে দেশটিতে বনভূমির পরিমাণ ছিল মোট আয়তনের ২১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৬৭ শতাংশে। দেশটিতে ধীরে ধীরে বনভূমি বাড়ছে। বর্তমানে নেপালে বনভূমির পরিমাণ মোট আয়তনের ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ, ভুটানে ৫১ শতাংশ, শ্রীলংকায় ২৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। তার মানে দেশগুলো বনভূমি সুরক্ষার বিষয়টিকে রাষ্ট্রীয় নীতি এজেন্ডায় গভীরভাবে অঙ্গীভূত করেছে। তাদের অভিজ্ঞতা, নীতি ও কর্মকৌশল পর্যালোচনা করে আমাদেরও বনভূমির পুনরুজ্জীবন ঘটাতে হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য এটা জরুরি।

বনভূমি সুরক্ষায় আইনি দিক থেকে ঘাটতি নেই। বন আইন-১৯৯০ নামে সুনির্দিষ্ট একটি আইন রয়েছে। সর্বশেষ এ আইনের সংশোধন হয়েছে ২০১০ সালে। বন আইনবলে বনভূমি ও বনজ সম্পদ সংরক্ষণের জন্য কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যেমন বনে যেকোনো ব্যক্তি অথবা গোষ্ঠীকে কোনো ধরনের নতুন অধিকার প্রদান রহিত করা, অনুমতি ছাড়া বনাঞ্চলে প্রবেশ, বনভূমি থেকে গাছপালা ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ, বনভূমিতে ঘরবাড়ি বানানো ও চাষাবাদ করে বনাঞ্চলের ক্ষতি করা, বনাঞ্চলে গবাদি পশু চরানো, বনের গাছ কাটা, অপসারণ ও পরিবহন, বনে আগুন জ্বালানো, আগুন রাখা বা বহন, বনে শিকার ও মাছ ধরা, পানি বিষাক্ত করা অথবা বনে ফাঁদ পাতাসহ বন কর্মকর্তা বা রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত ব্যক্তির কাজে বাধা প্রদান প্রভৃতি নিষিদ্ধ করা হয়। এগুলোর বেশির ভাগ লঙ্ঘনই আদালতে মামলাযোগ্য অপরাধ। এজন্য বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধানও রয়েছে। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে আইন প্রয়োগের দৃষ্টান্ত সামান্য। শুধু আইন থাকলে হবে না, বন রক্ষা করতে হলে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বনভূমি বেদখলের বিষয়ে বেশ কয়েকবার ক্ষোভ জানিয়েছে। আলোচ্য কমিটি গত বছর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে ৯০ হাজার অবৈধ দখলদার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা চেয়েছিল। ওই তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশের কথা বলেছিল। এক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। অবশ্য এটিও ঠিক যে দখলদারদের তালিকা প্রকাশ করে বনভূমি উজাড়ের প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন আসবে না, যদি তাদের হাত থেকে বনভূমিগুলো পুনরুদ্ধার না করা হয়। আসল কাজ হলো বেদখল হয়ে যাওয়া বনভূমি পুনরুদ্ধার করে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। সেগুলো যেন আবার বেদখল হয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা। সেটি করতে হলে বনভূমি তদারকির ব্যবস্থা আরো কার্যকর করতে হবে। অবৈধ দখলদাররা সাধারণত স্থানীয়ভাবে ক্ষমতাবান হয়ে থাকে। বিশেষত রাজনৈতিকভাবে প্রভাব রয়েছে, এমন ব্যক্তিরা এসব তত্পরতায় লিপ্ত হয় এবং তাদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা যথাযথভাবে কাজ করে না। কাজেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অবৈধ দখলদারদের দমনে বিশেষ নজর দিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অবিলম্বে বেদখলে থাকা বনভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যাপকতর অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। খোদ প্রধানমন্ত্রী বন দখলকারীদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তাদের নিবৃত্ত করা যায়নি। রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি।

করোনা মহামারী মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা আবারো স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। অথচ মানুষের প্রকৃতি-প্রতিকূল কর্মকাণ্ডে বনভূমিসহ সার্বিক জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। এভাবে চললে প্রাকৃতিক স্থায়িত্বশীলতা ব্যাহত হতে বেশি সময় লাগবে না। কাজেই প্রাতিবেশিক সংহতি বজায় রাখতে বনভূমির সুরক্ষা প্রয়োজন। কাজটি কেবল দলিলে থাকলে হবে না, বাস্তবে রূপায়ন করতে হবে। সর্বোপরি বিদ্যমান উন্নয়ন প্রক্রিয়া ও চিন্তায় পরিবেশ-বনকে প্রাধিকার দেয়া চাই। বিষয়গুলো আমলে নিয়ে বনভূমি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হবে বলে প্রত্যাশা।