দেশে নগরবাসীর মধ্যে উচ্চরক্তচাপ বাড়ছে। তবে শ্রমজীবী নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের এক গবেষণার তথ্য বলছে, নগরের ২৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষ উচ্চরক্তচাপে ভুগছে। তাদের মধ্যে দিন দিন যেভাবে উচ্চরক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ছে, তা উদ্বেজনক। এখনই এটা নিয়ন্ত্রণে জোরালো প্রচেষ্টা নিতে হবে। এজন্য সরকারি উদ্যোগে নগরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রসার, স্বাস্থ্যসম্মত জীবনাচার ও স্বাস্থ্য পরীক্ষায় সচেতনতা বাড়িয়ে তোলা জরুরি।
গত কয়েক দশকে দেশে নগরায়ণের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। কিন্তু সেটা হয়েছে অনেকটা বিক্ষিপ্ত ও খাপছাড়াভাবে। কর্মের প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত নগরে শ্রমজীবী মানুষ বাড়ছে। গাদাগাদি করে থাকছে বদ্ধ ও ঘিঞ্জি পরিবেশে। তার মধ্যে বিদ্যমান গণপরিসরগুলোয়ও তাদের প্রবেশাধিকার অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। কোথাও এতটুকু ফুরসত নেয়ার জো নেই। আবার তাদের খাদ্যাভ্যাসের ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। ঐতিহ্যবাহী স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের পরিবর্তে অনেকেই খাচ্ছে বানরুটি, বিস্কুট, সফট ড্রিংকসের মতো প্রক্রিয়াজাত খাবার। কিছুটা খরচ বাঁচাতে গ্রহণ করছে রাস্তায় বিক্রি হওয়া ট্রান্সফ্যাট বেশি থাকা ভাজাপোড়া ও অস্বাস্থ্যকর খাবার। সঙ্গে গ্রহণ করছে নানা ধরনের তামাক। ব্যস্তময় নগরজীবনে অপর্যাপ্ত ঘুম, দুশ্চিন্তা এবং নানা আর্থিক টানাপড়েনে কাটছে তাদের জীবন। সব মিলিয়ে নগরের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে প্রকোপ বাড়ছে উচ্চরক্তচাপের।
উচ্চরক্তচাপ একটা বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় এর ব্যাপকতা বেশি। তবে উন্নত দেশগুলো উচ্চরক্তচাপ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। দেশগুলোর বড় সুবিধা হলো, তাদের একটা সুসংগঠিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বিদ্যমান। প্রতিটি এলাকার মানুষের জন্য একটি জেনারেল ফিজিশিয়ান (জিপি সেন্টার) সেখানে আছে। সেই সেন্টারে ওই এলাকার সব মানুষের চিকিৎসা হয়। কেউ চাইলেই ওই জিপি সেন্টারের বাইরে চিকিৎসা নিতে পারেন না। জিপি সেন্টারের চিকিৎসক যদি কোনো রোগীকে রেফার করেন, তবেই সে রোগী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে পারেন। এ ব্যবস্থার কারণে দেশগুলোর নাগরিকদের বাধ্য হয়ে এক ধরনের প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং শুরুতে শনাক্ত হয় দীর্ঘমেয়াদি কোনো অসংক্রামক রোগে ভুগছেন কিনা। তাছাড়া যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে সুনির্দিষ্ট ট্রিটমেন্ট প্রটোকল তো আছেই; উচ্চরক্তচাপের মতো জনস্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলায় হাইপারটেনশন অ্যাকশন প্ল্যানও রয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় তারা নিয়মিতভাবে কোথায়, কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চরক্তচাপের প্রবণতা বেশি তা গবেষণার মাধ্যমে খতিয়ে দেখে এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য হস্তক্ষেপগুলো করে, যা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
জনমনে আগে একটা ধারণা ছিল উচ্চরক্তচাপের মতো দীর্ঘস্থায়ী অসংক্রামক রোগ উন্নত দেশের মানুষের হয়। এটা এখন পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশেও এ রোগ এখন বাড়ছে। বিশেষ করে নগরাঞ্চলের শ্রমজীবীদের মধ্যে এর প্রকোপ বৃদ্ধির বিষয়টি ভীষণ আশঙ্কাজনক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশের সরকারি মহলে এখনো এ বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। আমরা দেখছি, বিভিন্ন সংক্রামক রোগ এবং অসংক্রামক রোগের মধ্যে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। সেগুলো নিয়ন্ত্রণে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা কর্মসূচিও এরই মধ্যে নেয়া হয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য অধিকর্তারা এখনো উচ্চরক্তচাপ বিস্তারের ভয়াবহতা খুব একটা অনুভব করছেন না। চিকিৎসকরা বলছেন, দীর্ঘদিন চিকিৎসার বাইরে থাকলে উচ্চরক্তচাপ কিডনি জটিলতা, স্মৃতিভ্রংশ, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা কমানো, চোখের ক্ষতি ও বৃক্কের বিকলতাসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করে। সবচেয়ে বড় কথা, এ রোগে স্ট্রোক হয়ে রোগী শারীরিকভাবে অক্ষম, এমনকি মারাও যেতে পারেন। তেমনটা হচ্ছেও প্রতিদিন। কাজেই বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে আমলে নিয়ে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন।
উচ্চরক্তচাপের সাধারণত কোনো লক্ষণ থাকে না। রোগীর শারীরিক কষ্টও থাকে না। ফলে এ রোগে কেউ ভুগছেন কিনা, সেটা তিনি নিজে বুঝতে পারেন না। তাই এ রোগ নির্ণয় করাই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, শারীরিক সমস্যা না থাকায় কেউ নিজের অর্থ ব্যয় করে প্রেশার কেমন আছে, উচ্চরক্তচাপ আছে কিনা, তা দেখার জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না। স্বভাবত অনেক ক্ষেত্রে রোগটি অনির্ণীত থেকে যায়। এর একটা সমাধান হতে পারে, উন্নত দেশের মতো জিপি সেন্টার প্রবর্তন। এলাকাভিত্তিক জিপি সেন্টার গড়ে তোলা হলে মানুষ তাদের সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা সেখান থেকে নেবে। চিকিৎসাসেবা ছাড়াও ওইসব সেন্টারে স্বল্পমূল্যে হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং করা যাবে। উচ্চরক্তচাপ নির্ণয় হলে তারা নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলোআপ সেখানে করতে পারবে। কাজেই বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কোথায়, কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কতটা এবং কী কারণে উচ্চরক্তচাপের ব্যাপকতা বাড়ছে, তা নিয়ে বিশদ গবেষণা হওয়া দরকার। গবেষণা ফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপগুলো বিন্যাস করা এখন সময়ের দাবি।
কথায় বলে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। দেশের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে প্রতিরোধ দূরের কথা, উচ্চরক্তচাপ সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণাই নেই। চিকিৎসকরা এ রোগটি প্রতিরোধে লবণ গ্রহণ কমানো, পর্যাপ্ত ফলমূল পরিভোগ, তামাকের ব্যবহার পরিহার, অ্যালকোহল সেবন কমানো, উচ্চ স্যাচুরেটেড খাদ্য গ্রহণ সীমিত করা এবং খাবারে ট্রান্সফ্যাট বাদ দেয়ার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে ব্যায়াম বা কায়িক শ্রমের কথাও বলেন। কায়িক শ্রমেই যেহেতু শহরের শ্রমজীবীদের জীবন চলে, তাই তাদের বাড়তি ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই, কিন্তু অন্য বিষয়গুলো সম্পর্কে কীভাবে সচেতন করে তোলা যায়, সে প্রচেষ্টা নিতে হবে। তাদের সচেতনতা বাড়াতে সিটি করপোরেশনগুলোকে বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। ডায়রিয়া প্রতিরোধ, শিশুদের টিকা প্রদানে অভিভাবককে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে এনজিওগুলো অতীতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে। উচ্চরক্তচাপ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতেও তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে। শ্রমজীবীদের স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনে উৎসাহিত করতে হবে। বলা হচ্ছে, নগরায়ণের ফলে পরিবর্তিত জীবনযাত্রা, বিশেষ করে মাত্রাতিরিক্ত শব্দ ও ঘিঞ্জি পরিবেশ তাদের উচ্চরক্তচাপে ভোগার জন্য অনেকাংশে দায়ী। তাই নানা প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক পদক্ষেপের পাশাপাশি তাদের জন্য শহরে একটা মানসম্মত আবাসন ও পরিবেশ বিনির্মাণ করাও জরুরি।










