নদীর পানিপ্রবাহের ক্ষেত্রে খাল সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এ খালগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভরাট করে বন্ধ করা হচ্ছে। আবার স্লুইস গেট নিয়েও অত্যধিক বিড়ম্বনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে খাল রক্ষায় কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নদী-নালা-খাল-বিল সংরক্ষণে একাধিক আইনও রয়েছে। উচ্চ আদালতের একাধিক রায়, নদী রক্ষা কমিশন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মতো একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকার পরও খালগুলো একের পর দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকার খাল খনন কর্মসূচি, দখলদার উচ্ছেদ, খাল চিহ্নিতকরণসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সুফল মিললেও এখন পর্যন্ত দেশের সব খাল চিহ্নিত করে তা উদ্ধার ও রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। অধিকাংশ খালই এখন মৃতপ্রায়। এতে জলাবদ্ধতাসহ নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এক্ষেত্রে তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মেনে দেশব্যাপী পানিপ্রবাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাল রক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত উদ্যোগ একান্তভাবে কাম্য।

বিশ্বের নদী-খালগুলোর সমস্যার সঙ্গে এ দেশের নদীগুলোর সমস্যার দুস্তর পার্থক্য বিদ্যমান। সারা বিশ্বে নদী বা খালের প্রধান সমস্যা হলো পানিদূষণ ও পরিবেশ বিপর্যয়। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় সমস্যা আরো ভয়ংকর এবং যেটা কোনো সচেতন মানুষকে আতঙ্কিত না করে পারে না। পানিদূষণ, নদীভাঙন, নদীর নাব্যতা হারিয়ে যাওয়া, শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট ইত্যাদি মারাত্মক সমস্যা তো আছেই। তার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ও সর্বগ্রাসী সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে দখল ও ভরাটের ব্যাপক সম্প্রসারিত কর্মকাণ্ড। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্র নদীর পরিবেশ দূষণ রোধ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় তত্পর হয়েছে। এজন্য গ্রহণ করেছে ছোট-বড় অনেক প্রকল্প। এক্ষেত্রে চীন, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ইরান প্রভৃতি দেশ এগিয়ে রয়েছে। বিশ্ব পানি কমিশন এরই মধ্যে ভিয়েতনামের মেকং নদীকে বিশ্বের চারটি দূষণমুক্ত নদীর একটি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। চীন তার সব নদ-নদীর নাব্যতা বজায়, পরিবেশ দূষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন, শুষ্ক মৌসুমে সেচকাজের জন্য পানি সংরক্ষণ, মত্স্য উৎপাদন ইত্যাদি বহুমুখী নদী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সিঙ্গাপুর সরকার ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করেছে। এ আইনের মূলকথা হলো, পানি দূষণমুক্ত রাখা ও নদী-খালের অববাহিকা অঞ্চলে কোনো রকম দূষণযুক্ত শিল্প-কারখানা যাতে গড়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করা। থাইল্যান্ড সরকার পানির উৎসকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ইরানও নদ-নদীর পানিকে দূষণমুক্ত রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি নদ-নদী দূষণমুক্ত রাখতে ইরানের গৃহীত কর্মসূচির প্রশংসা করেছে। বাংলাদেশকেও পানির উৎস রক্ষায় আরো কঠোর হতে হবে। দেশব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খাল রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। খাল দেখভাল করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো মন্ত্রণালয় নেই। তাই তা রক্ষায় মন্ত্রণালগুলোর কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ দেখা যায় না। খালের সামগ্রিক কাজের তদারকির জন্য একক কোনো মন্ত্রণালয় নেই, যার মাধ্যমে সমন্বয়পূর্বক এর সার্বিক ব্যবস্থাপনার কাজ করা হবে। তাই যত দিন পর্যন্ত খাল রক্ষা করার জন্য স্বতন্ত্র কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে না, তত দিন এর সরকারি তদারকি নিশ্চিত হবে না। তত দিন পর্যন্ত জবাবদিহিও তৈরি হবে না।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় নদী, খাল ও জলাশয়গুলো সংরক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে বহুমুখী ব্যবহার করা হয়। নদী, খাল বা জলাশয় একটি দেশ বা শহরের জন্য কতটা প্রয়োজনীয়, তা বিভিন্ন দেশের পরিকল্পনা থেকেই বোঝা যায়। লন্ডন, ব্যাংকক, আমস্টারডাম ও ভেনিস এর উত্কৃষ্ট উদাহরণ। তারা তাদের খালগুলোকে পরিকল্পিতভাবে নৌ-চলাচলের ব্যবস্থা ও মানুষের বিনোদনের উপযোগী করে তার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ঠিক রেখেছে। কিন্তু আমাদের দেশে খালগুলোকে একের পর এক দখল করা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শহরের খালগুলোকে যাতায়াতের একটি অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। অনেক দেশে সমুদ্র থেকে অভ্যন্তরীণ বন্দরে জাহাজ পৌঁছতে খাল ব্যবহার করে থাকে (যেমন ম্যানচেস্টার শিপ ক্যানেল)। এমনকি সমুদ্র ও মহাসাগরের মধ্যেও যোগসূত্র স্থাপন করে দেয় খাল (যেমন পানামা খাল, ক্যালেডোনিয়ান খাল)। ব্যাংককে যাতায়াত ও মালপত্র পরিবহনের ক্ষেত্রে খাল ব্যবহার হচ্ছে, যা সস্তায় ও কম সময়ে যাতায়াত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমাদেরও যে খালগুলো রয়েছে তা ব্যবহার করে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। সেক্ষেত্রে খাল বা জলাশয় যাতে মানুষ দখল বা ভরাট না করে, তার জন্য কঠোর আইন করতে হবে। উন্নত বিশ্বের মতো খাল বা জলাশয় রক্ষা করে নগরীর উন্নয়ন করতে হবে। খাল বা জলাশয়গুলোয় যেন কোনো প্রকার দূষণ বা ময়লা আবর্জনা ফেলা না হয়, সে ব্যাপারে কঠোর নীতিমালা রয়েছে। হাঁটা ও বিনোদনের জন্য খালের দুপাশে হাঁটাপথ, বসার ব্যবস্থাসহ নানা ধরনের সুবিধা রাখা হয়েছে। যাতে মানুষ সেখানে আসতে নিরাপত্তা ও আকর্ষণ বোধ করে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের খালগুলোকে পর্যটক আকর্ষণের ও বিনোদন উপযোগী করে গড়ে তুলেছে। তাদের খালে হরেক রকম নৌকা রয়েছে, যাতে পর্যটকরা খালের মাধ্যমে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত এমনকি এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতে পারে।

খাল-বিল, জলাশয় ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে সর্বাগ্রে। নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুরসহ সব ধরনের জলাশয় রক্ষায় বিদ্যমান সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালার প্রয়োজনে সংশোধনসহ ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। খাল ও নদী সংরক্ষণ ও সংস্কারে স্থানীয় অধিবাসীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। এতে জনসচেতনতাও বাড়বে। সঠিকভাবে নদী ও খালগুলোর সীমানা নির্ধারণ বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এরই মধ্যে দখলের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে খালের অস্তিত্বই হারিয়ে গেছে। সর্বোপরি খাল ও নদীর মধ্যে সৃষ্ট বাধা দূরীকরণের মাধ্যমে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করা। এলাকাবাসী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে খাল ও নদী ভরাটের বিরুদ্ধে নিয়মিত তদারকি ব্যবস্থা চালু রাখা। শিল্প-কারখানার রাসায়নিক ও বর্জ্য, পয়োবর্জ্য এবং বাজার ও গৃহস্থালির বর্জ্য খাল ও নদীতে ফেলা বন্ধ করা দরকার। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেই পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ ঠিক রেখেই বসবাসের পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে। আইন অমান্য ও পরিবেশবাদীদের মতামত উপেক্ষা করে ঢাকাসহ সারা দেশে নদী, খাল ও জলাশয় ভরাট করে যেভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করা হচ্ছে, দেশের সর্বসাধারণকে তার মূল্য দিতে হবে। সুতরাং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঠিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। সমন্বয়হীনতার কারণে খাল দখল ও সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় খাল-নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব সঠিকভাবে চিহ্নিত এবং তারা সেটি পালন করছে কিনা, তা তদারক নিশ্চিত করা প্রয়োজন।