পশুর চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মৌসুম কোরবানির ঈদ। প্রতি বছর চামড়ার বার্ষিক চাহিদার সিংহভাগ জোগান আসে কোরবানির পশু থেকে। ফলে এ শিল্পের জন্য উন্নতমানের চামড়া কিনতে ব্যবসায়ীরাও এ সময় ব্যস্ত থাকেন। কোরবানির সময় যে চামড়া সংগ্রহ করা হয়, তা দিয়েই সারা বছর ট্যানারি শিল্পের কারখানাগুলো চলে। শুধু তা-ই নয় চামড়াজাতপণ্যও তৈরি হয় এ চামড়া দিয়েই। দীর্ঘদিনে বাংলাদেশে চামড়া শিল্প এগিয়েছে অনেকটা ঢিমেতালে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শিল্পটি কিছুটা গুরুত্ব পেতে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসে চামড়া শিল্প নানামুখী সংকটের সম্মুখীন। পানির চেয়েও কম দামে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশুর চামড়া। শুধু তা-ই নয় বিপুল পরিমাণ চামড়া নদীতে ফেলা দেয়া ও মাটিতে পুঁতে ফেলার খবরও মিলছে, যা উদ্বেগজনক। এর অর্থ দেশে চামড়ার চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি। অথচ পার্শ্ববর্তী ভারতে বাংলাদেশী পশুর চামড়ার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, দামও বেশি মেলে। কিন্তু কিছু ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষায় চামড়া পাচার রোধে সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয় এ সময়। ফলে দরিদ্ররা চামড়ার সুফল থেকে বঞ্চিত হলেও স্বল্পমূল্যে তা কিনে ব্যবসায়ীরা ঠিকই লাভবান হচ্ছে। এ প্রবণতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

২০১৩ সালে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৮৫-৯০ টাকা, যা এখন নেমে এসেছে ৩৫-৪০ টাকায়। বাজারে চামড়ার ক্রেতা নেই। এমনকি ফ্রিতে চামড়া দেয়ার জন্যও কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না অনেক এলাকায়। ক্রেতার অভাবে অনেকে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি দেশ হারাচ্ছে রাজস্ব। বাংলাদেশের জন্য চামড়া শিল্প একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। চামড়া শিল্পের এ সংকট উত্তরণে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি। চামড়া ব্যবসায়ীদের কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা, বিশেষ করে মৌসুমে পর্যাপ্ত মূলধন যাতে সহজে সংগ্রহ করতে পারে সে ব্যবস্থা করা, চামড়া সংরক্ষণে লবণের জোগান নিশ্চিত করা এবং ভর্তুকি প্রদান, উপজেলা পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ, চামড়া প্রক্রিয়াকরণের জন্য শিল্পনগরী তৈরি করা এবং চামড়ার নতুন বাজার তৈরির মাধ্যমে চামড়া শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। চামড়া শিল্পের প্রতি এখনো সুদৃষ্টি দেয়া না হলে পাট শিল্পের মতো সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পকেও হারাতে হবে।

বাংলাদেশে চামড়ার বাজার এতদিন পর্যন্ত উন্মুক্ত ছিল না। এখন পর্যন্ত সেই অর্থে তা উন্মুক্ত নেই। দেশের ভেতরেই চামড়া সংগ্রহ ও বিক্রি নির্ধারিত ছিল। সেক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত মূল্যে এটি বিক্রির ব্যাপার নির্ধারিত ছিল। স্থানীয় বাজারভিত্তিক হওয়ায় এবং রফতানি উন্মুক্ত না হওয়ার কারণে ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ট্যানারি পর্যায়ে এক ধরনের কার্টালাইজেশনের অভিযোগ রয়েছে। এরাই মূলত সংঘবদ্ধভাবে চামড়া সংগ্রহ ও দাম নির্ধারণ করে। ব্যাপারটিকে ঠিক করার জন্যই মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের সম্পৃক্ততার বিষয়টি আসে। কিন্তু দেখা গেছে, চামড়ার নির্ধারিত মূল্যের মাধ্যমে কখনই প্রকৃত আর্থিক মূল্য পাওয়া যায় না। এটাকে কাঁচামাল বিবেচনা না করে অনেকটা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে দানকৃত বিষয় হিসেবে দেখার একটা প্রবণতা প্রায়ই লক্ষ করা যায়। এটা যে শিল্পের একটা কাঁচামাল, এটাকে যে অর্থনৈতিকভাবে বিবেচনা করা দরকার এবং সেই হিসেবে বাজারে এটার লেনদেন করা প্রয়োজন, সে ধরনের কাঠামো এখানে পুরোপুরি অনুপস্থিত। এর সুবিধা এখানকার ট্যানারি পর্যায়ে এবং কারখানা মালিক পর্যায়ে যারা রয়েছেন, তারা সবসময়ই নিয়ে এসেছেন। মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ট্যানারি বা ব্যবসায়ীদের কথা মাথায় রাখা হয় এবং তাদের নিয়ন্ত্রণেই এটা নির্ধারিত হয়। তাই তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করা, লেনদেনের বিষয়টি বিবেচনায় আনা এবং অন্য পক্ষগুলো যেমন—মৌসুমি ব্যবসায়ী, স্থানীয় পর্যায়ের সংগ্রাহক ও মসজিদ-মাদ্রাসার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়গুলো এখানে উপেক্ষিত থাকে। সর্বোপরি এটাকে কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনা করে মূল্য নির্ধারণ করার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। এর পরিবর্তন প্রয়োজন।

বর্তমানে ভারতে গরু জবাই করায় একধরনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ হওয়ার প্রভাব কী তা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বিস্তারিত উঠে এসেছে। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার একটি শিরোনাম ছিল, ‘গো-হত্যা নিয়ে রাজনীতির জেরে ভারতে কাঁচা চামড়ার জোগানে টান’। আর রিপোর্টটিতে বলা হয় প্রায়ই গো-হত্যা নিয়ে রাজনীতির কারণে কয়েক হাজার কোটি রুপি বলি দিতে হচ্ছে ট্যানারি মালিকদের। সেখানকার ট্যানারি ও চামড়াশিল্প চামড়ার অভাবে ধুঁকছে আর বাংলাদেশের চামড়া নষ্ট ও ফেলে দেয়া হচ্ছে, তা কোনো যুক্তিতেই যথার্থ নয়। কিছু অসাধু ও অনৈতিক ব্যবসায়ী আন্তর্জাতিক দরপতনের ধুয়া তুলছেন। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম বিশেষ করে ভারত, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বেশি। ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের চামড়া অত্যন্ত উন্নত ও ভালো। কিন্তু ভারতের নিম্নমানের চামড়া প্রতি বর্গফুটের দাম ৯০ টাকা অথচ বাংলাদেশের চামড়া উন্নত হয়েও এর দাম তার অর্ধেক তথা ৪৫ টাকা! পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে যে পরিমাণ প্রক্রিয়াজাত চামড়া রফতানির চাহিদা রয়েছে, বাংলাদেশ সারা বছর যতগুলো চামড়া অর্জন করে, তা তার অর্ধেক অর্থাৎ বিশ্বে চামড়ার চাহিদা রয়েছে দ্বিগুণ; কিন্তু তার পরও কেন এ অজুহাত? তবে ব্যবসায়ীরা যা-ই বলুন না কেন, এটা যে একধরনের প্রতারণা ও ষড়যন্ত্র তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট। এই স্পষ্টতার মধ্য দিয়ে সাধারণের জিজ্ঞাসা এ বছর যে স্বল্পমূল্যে ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনেছেন, এখান থেকে কি সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে? এ বছর চামড়ার দাম যেভাবে কমেছে, তার ফল কি জনগণ ভোগ করবে? এবার কি জুতা, ট্রাভেল ব্যাগ, বেল্ট কিংবা মানিব্যাগের দাম কমবে? বাস্তবতা হলো কখনই আমরা দেখি না এসবের দাম কমতে, বরং প্রতি বছরই এসবের দাম বাড়ছে জ্যামিতিক হারে; তবে কেন চামড়ার এমন পানির দর?

প্রতি বছরই কোরবানির ঈদের সময় চামড়ার মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে অনিয়ম দেখা যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ অনিয়ম বেড়েছে। এর একটা বড় কারণ হলো বৈশ্বিক বাজারে আমাদের চামড়ার চাহিদা কমে যাওয়া এবং বিশ্বব্যাপী চামড়ার চাহিদা কম হওয়া। এখন বাজারে আর্টিফিশিয়াল লেদার এসেছে, সিনথেটিক লেদার এসেছে। এগুলোর সঙ্গে ন্যাচারাল লেদারকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। সুতরাং ন্যাচারাল লেদারকে এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আর আমাদের চামড়ার একটি বড় বাজার চীন। দেশটি আমাদের প্রসেসড লেদার সংগ্রহ করে। সেখানেও চামড়ার চাহিদা কমে গিয়েছে। এর একটা অন্যতম কারণ হলো কভিডের আগে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য দ্বন্দ্ব তীব্র হওয়ায় চীনা পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ করা হয়েছিল। এতে চীনের চামড়া-জাতীয় পণ্য রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার করোনার কারণে ধনী দেশগুলোর মানুষের আয় কমে যাওয়ায় তারা এ-জাতীয় পণ্যের পেছনে কম ব্যয় করছে। সেজন্য চামড়ার চাহিদা কমে গিয়েছে। চামড়া খাতকে আন্তর্জাতিক মানের করতে চাইলে এর পুরো কাঠামোর মধ্যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। শিল্প কাঁচামাল হিসেবে চামড়া সংগ্রহ ও লেনদেন, ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াকরণ সবই একটি কাঠামোর মধ্যে আনা দরকার।

বহু চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে সরানো গিয়েছে ট্যানারি শিল্প। কিন্তু তাতে যেন সরে গিয়েছে ট্যানারি শিল্পের মোমেন্টামও। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সরানো গেলেও সরানো যায়নি সমস্যা। নতুন করে ট্যানারি শিল্পকে ঢেলে সাজানোর জন্য উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে পারেননি। হাজারীবাগে মূল শিল্পের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্যের ছোট ছোট শিল্প ছিল, সেগুলোর ঠাঁই হয়নি সাভারে। তার চেয়ে বড় কথা, পরিবেশদূষণের যে সংকট সেটি কাটানো যায়নি মোটেই। আগে নষ্ট হতো বুড়িগঙ্গা, এখন দূষিত হচ্ছে ধলেশ্বরী। বাংলাদেশ এত এগিয়েছে, কিন্তু পরিবেশসম্মত একটা ট্যানারি শিল্প বানাতে পারিনি এতদিনেও। সাভার ট্যানারি শিল্পে স্থাপিত হয়নি বর্জ্য পরিশোধনাগার। সমস্যা ট্যানারি শিল্পকে কমপ্লায়েন্ট করতে না পারলে আপনি এ জায়গাতেই আটকে থাকবেন, এগোতে পারবেন না। রফতানি বাড়াতে হলে নিরাপদ, পরিবেশসম্মত ট্যানারি শিল্প গড়ে তুলতে হবে।

আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বায়াররা যে কমপ্লায়েন্স স্ট্যান্ডার্ড ডিমান্ড করে, যেটা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ মেনে চলে এবং অন্যান্য দেশ কমপ্লাই করে, সেটা অর্জনের জন্য সাভার শিল্পনগরীকে সেভাবে প্রস্তুত করতে হবে। কিন্তু আমরা দেখতে পাই ব্যবসায়ীরা খরচের ভয়ে বা বেশি মুনাফার জন্য এড়িয়ে যায়। এটাকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এখানে ব্র্যান্ড বায়াররা পণ্য উৎপাদন করে, তবে তারা শর্ত দেয় যে সেটা আমদানি করা চামড়া হতে হবে। এ কারণে আমাদের প্রচুর দেশীয় চামড়া উদ্বৃত্ত থাকলেও বিপুল পরিমাণ চামড়া আমদানি করতে হয়। তাই ব্র্যান্ড বায়াররা যে ধরনের কমপ্লায়েন্স স্ট্যান্ডার্ড চায়, লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ যেটা মেইনটেইন করে, সেটা অর্জন না করতে পারলে ব্র্যান্ড বায়াররা এখানে আসতে চাইবে না। চামড়ার ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত, তারা একই সঙ্গে রফতানিও করতে চান আবার দেশীয় বাজারও ধরে রাখতে চান। কিন্তু এ রফতানির জন্য আন্তর্জাতিক যে পরিবেশগত মানদণ্ড রয়েছে, সেটা দেশীয় বাজারে করার ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ কম। এ কারণে এখানকার অধিকাংশ উদ্যোক্তা এবং ট্যানারির মালিক যারা রয়েছেন, তারা দেশীয় বাজারকে প্রাধান্য দিতে চান এবং পরিবেশগত মানদণ্ড উন্নত করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে চান না। কেননা, এটা অনেক ব্যয়বহুল এবং এটা করলে তাদের মুনাফা কমে আসবে। এজন্য তারা কমপ্লায়েন্স বা পরিবেশবান্ধব শিল্প হিসেবে এটাকে গড়ে তোলা বা সাভার শিল্পনগরীর উত্তরণ ঘটানোর ব্যাপারে তত্পরতা দেখাতে চান না। তাই তারা দেশীয় বাজারমুখী রয়েছেন, কেননা সেখানে সরকার পরিবেশগত মানদণ্ড তৈরি করার জন্য চাপ দিচ্ছে না। দেশীয় বা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য সরকারকে পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা উচিত।