দেশের উন্নয়নের অন্যতম শর্ত সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা। আর সঠিক পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজন সময়োপযোগী বিশুদ্ধ পরিসংখ্যান। পরিসংখ্যানের গুরুত্ব উপলব্ধি করে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গঠন করা হলেও এখনো কারিগরি দক্ষতা, মানসম্পন্ন জনবল এবং সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তের মানোন্নয়নের অভাবে দুর্বল তথ্যের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে বিবিএস। ফলে মাঝেমধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির তথ্য ও পরিসংখ্যানের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিবিএসের বিশুদ্ধতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে তার এ মন্তব্য খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। গত কয়েক বছরে দেশের পরিসংখ্যানের মান নিয়ে বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রশ্ন উঠছে। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল—এ পাঁচ বছরে বাংলাদেশে পরিসংখ্যানগত দুর্বলতা আরো তীব্র হয়েছে। দেশের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল ২০১৪ সালে। সে বছর ১০০ পয়েন্টের মধ্যে প্রায় ৮০ পয়েন্ট পেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ২০১৯ সালে বাংলাদেশের স্কোর পয়েন্ট কমে ৬২ দশমিক ২-এ দাঁড়ায়। মূলত তথ্যের উৎস দুর্বলতা, মেথডোলজিক্যাল দুর্বলতা বা মান নির্ধারণে দুর্বলতা, নির্ভুলতা ও নির্দিষ্ট সময়ে প্রকাশ করতে না পারার কারণেই ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের তথ্যের মান দুর্বল হচ্ছে। আর দুর্বল পরিসংখ্যানের কারণে পরিকল্পনা প্রণয়ন কঠিন হয়ে পড়ছে, যা দুঃখজনক।

পরিসংখ্যান ব্যুরোয় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সঠিক, নির্ভরযোগ্য, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরিসংখ্যান প্রণয়ন; এ লক্ষ্যে বিবিএস পরিচালিত প্রধান প্রধান জরিপসহ অন্যান্য পরিসংখ্যানগত কার্যক্রমের পরিচালনা পদ্ধতিকে যুগোপযোগী করা। দ্রুততম সময়ে তথ্য সংগ্রহ, সংকলন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে যথাসময়ে তথ্য বা রিপোর্ট প্রকাশ এবং তথ্য সংগ্রহ থেকে রিপোর্ট প্রকাশ পর্যন্ত সামগ্রিক প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করার লক্ষ্যে একটি আইসিটি পরিকল্পনা প্রণয়নের গুরুত্ব দিতে হবে। সীমাবদ্ধ সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে সর্বাধিক পরিসংখ্যান প্রস্তুতের লক্ষ্যে জরিপের পরিবর্তে প্রশাসনিক উৎস থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করার ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। দাপ্তরিক পরিসংখ্যান প্রণয়ন একটি টেকনিক্যাল বিষয়। এ কাজ সঠিকভাবে সম্পাদনের জন্য দক্ষ জনবল অপরিহার্য। বিবিএসে কর্মরত সব ধরনের জনবলকে নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। এছাড়া জাতীয় হিসাব প্রাক্কলন, পরিবেশ পরিসংখ্যান তৈরি, জাতীয় জনসংখ্যা রেজিস্টার তৈরি, জেন্ডার স্ট্যাটিস্টিকস প্রণয়ন, বিবিএসের সব শুমারি, জরিপের সংজ্ঞা ও মেথডোলজি আধুনিকায়ন এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে পরিসংখ্যান ব্যুরোকে শক্তিশালীকরণ কার্যক্রম চলছে। আমরা আশা করব, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সংস্কার ও মানসম্পন্ন পরিসংখ্যান নিশ্চিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ভারতের পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা হয়। শুরুতে এমন ছিল না। নানা সংস্কারের মধ্য দিয়ে বিপুল সংখ্যার দেশটির পরিসংখ্যান ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা অনুসরণীয় হয়ে উঠেছে। ভারত সরকার ১৯৯৯ সালে পরিসংখ্যান বিভাগ ও কর্মসূচি রূপায়ণ বিভাগ একত্রপূর্বক পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রণালয় গঠন করে। মন্ত্রণালয়ের দুটি শাখা তৈরি করা হয়—একটি পরিসংখ্যানসংক্রান্ত এবং অন্যটি কর্মসূচি রূপায়ণ দেখভাল করে। পরিসংখ্যানসংক্রান্ত কার্যক্রম অফিসকে বলা হয় জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস। ভারতের জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের স্পেশাল ডাটা ডিসিমিনেশন স্ট্যান্ডার্ডস (এসডিডিএস) পুরোপুরি অনুসরণ করছে। এতে ভারতের পরিসংখ্যানের মান আরো উন্নত হয়েছে। তারা শুধু ডাটা সংগ্রহই করে না, সেগুলো যাচাই ও পুনর্যাচাই করে তৃতীয় পক্ষের মতামতও গ্রহণ করে। প্রয়োজন হলে সংশোধন ও ক্রস চেক করে। মাঠ পর্যায়ে তাদের রয়েছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশাল কর্মিবাহিনী। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে শক্তিশালী উপদেষ্টা কমিটিসহ প্রতিটি শাখার জন্য ভিন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি রয়েছে। এসব পদক্ষেপই ভারতের পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশও পরিসংখ্যান ব্যুরোকে শক্তিশালী করতে এক দশকব্যাপী উদ্যোগ নিয়েছিল। তাতে অবকাঠামোগত উন্নয়নই গুরুত্ব পেয়েছে। কারিগরি, সময়, পরিসংখ্যানের মান, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রভৃতি বিবেচনায়ই আসেনি তেমন। পরিসংখ্যানের মান উন্নত করতে হলে প্রথমেই আন্তর্জাতিক কিছু বিধিবিধান ও ফর্মুলা অনুসরণ করা আবশ্যক। তাছাড়া তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে তা প্রকাশ প্রতিটি পর্যায়ে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনীতির গতিধারা জানতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও তিন মাস পরপর জিডিপি গণনা করে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয়ও প্রান্তিকভিত্তিক জিডিপি গণনা করা হয়। করোনার এই বেহাল অবস্থার মধ্যেও চীনের ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস ত্রৈমাসিক জিডিপি গণনা থামিয়ে রাখেনি। কিন্তু বাংলাদেশে বছরে একবার জিডিপি গণনা করা হয়। পাঁচ বছর পরপর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ করে থাকে বিবিএস। সর্বশেষ ২০১৬ সালে এ জরিপ হয়েছে। পরবর্তী জরিপটি ২০২১ সালে করার কথা। করোনার কারণে গত বছর দারিদ্র্য হার বেড়ে গেছে বলে বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে উঠে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের একমাত্র পরিসংখ্যান সংস্থা হিসেবে বিবিএস এ নিয়ে কোনো জরিপ করেনি। ফলে গরিব মানুষের সংখ্যা কত বাড়ল, সংস্থাটির হাতে সে সম্পর্কে প্রকৃত কোনো তথ্য নেই। বিবিএসের বেশির ভাগ সমীক্ষা-জরিপ প্রকল্পভিত্তিক। নিয়মিতভাবে সমীক্ষা করার জন্য রাজস্ব বাজেট থেকে টাকা খুব একটা মেলে না। আবার মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে ফলাফল প্রকাশ করতে আরো এক-দুই বছর সময় লাগে। ফলে তথ্য-উপাত্তের সময়োপযোগিতা থাকে না। এসব বিষয় আমলে নিয়ে বিবিএসের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে যাত্রা করছে, এ সময়ে নির্ভুল পরিসংখ্যান জরুরি। নতুন নতুন অনেক বিষয়ের হালনাগাদ তথ্যের চাহিদা বাড়বে। এটি নিশ্চিত করার মতো সক্ষম আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবিএসকে গড়ে তুলতে হবে।

বিবিএসের কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে বিবিএসের মধ্যেই কাঠামোগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যেখানে বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণার জন্য প্রণীত কারিগরি কমিটিতে পরিসংখ্যানবিদদের স্থান নিশ্চিত করা হবে। বিদ্যমান বিভিন্ন বিভাগকে ব্যুরোতে পরিণত করতে হবে। প্রয়োজনে বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানবিদদের অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। পর্যায়ক্রমে জরিপ প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আগের তুলনায় সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। বলতে গেলে সক্ষমতাও বেড়েছে কিছুটা, কিন্তু কাজের গতি বাড়েনি। ২০১৩ সালে করা হয়েছে পরিসংখ্যান আইন। ফলে এক ভিন্ন মর্যাদা পেয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। ব্যুরোর নন-ক্যাডার পদে এতদিন নিয়োগ বিধি ছিল না। সেটিও করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের গাড়ি দেয়া হয়েছে। জনবল সংকট কাটাতে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউট করা হচ্ছে। কিন্তু পরিসংখ্যানের মান বাড়ানোর গতি রয়েছে আগের জায়গায়। একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে পরিসংখ্যানের মান উন্নত না হলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের চ্যালেঞ্জ আরো বেড়ে যাবে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে তথ্যে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার ও আরো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজনীয় ও সময়মতো বরাদ্দ দেয়াও গুরুত্বপূর্ণ।