জুলাইয়ের ২৮ তারিখ বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস পালিত হয়। প্রকৃতি ও তার উপাদান সম্পর্কে মানুষের পরিচিতি, তাদের সংরক্ষণ এবং সুপরিকল্পিত ব্যবহারের বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা দিবসটির মূল লক্ষ্য। বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস ২০২৩-এর প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘বন ও জীবিকা: টেকসই মানুষ ও গ্রহ।’ বায়ু, পানি, মাটি, উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রকৃতির মূল উপাদান। মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বাহে এ উপাদানগুলোর যথাযথ ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও সমাজ বিনির্মাণ করার প্রয়াসে প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবসের সূচনা। প্রকৃতির অনেক উপাদান আপাতদৃষ্টিতে অতিক্ষুদ্র বা নগণ্য মনে হলেও তাদের অবস্থান, বিচরণ ও গুরুত্ব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করে মানবকল্যাণে সর্বোত্তম ব্যবহার করাও প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবসের অভীক্ষা। বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস স্মরণে এ নিবন্ধ মূলত প্রাণিজগতের অন্যতম বিস্ময়কর সৃষ্টি মৌমাছির জীবন চরিত্র, প্রকৃতিতে তাদের ভূমিকা, সপুষ্পক উদ্ভিদের সঙ্গে তাদের সহবিবর্তন ও গুরুত্ব সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা মাত্র। মৌমাছি সম্পর্কে আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, ‘প্রকৃতি থেকে মৌমাছি উধাও হলে মানবজাতি সর্বোচ্চ চার বছর টিকে থাকতে পারবে।’ এ উদ্ধৃতি থেকেই বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণে মৌমাছির গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।
মৌমাছি হাইমেনপ্টেরা বর্গের এপিডি পরিবারের এপিস গোত্রভুক্ত একটি সামাজিক পতঙ্গ। বর্তমান বিশ্বে এপিস গোত্রের ১০টি প্রজাতির উল্লেখ থাকলেও বিদ্যমান আছে আটটি প্রজাতি। আবার এ আট প্রজাতি ৪৩টি উপপ্রজাতিতে বিভক্ত। মৌমাছির প্রজাতিগুলোর মধ্যে এপিস ডর্সাটা, এপিস ফ্লোরিয়া, এপিস মেলিফেরা ও এপিস সেরানা সচরাচর বিদ্যমান। এদের মধ্যে এপিস মেলিফেরা প্রজাতির মৌমাছি সবচেয়ে শান্ত প্রকৃতির। এ মাছি বা এদের চাক থেকে মধু, মোম, মৌকাই (প্রোপলিস), রাজচিত মোরব্বা রস (রয়্যাল জেলি), পরাগরেণু (পোলেন) ও গরল (ভেনম) প্রাপ্তি তুলনামূলক বেশি বা সহজলভ্য হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এদের বাণিজ্যিক খামার গড়ে উঠেছে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন শীতপ্রধান দেশে এ প্রজাতির মৌমাছি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পালন করে উপজাত সংগ্রহ ছাড়াও ফল ও সবজি ফসলের পরাগায়নের জন্য ব্যবহার করা হয়।
সপুষ্পক উদ্ভিদের সঙ্গে মৌমাছির সহবিবর্তন ঘটে প্রায় ২৫৩ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে। কিন্তু মৌমাছি পালনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কযুক্ত হওয়ার ইতিহাস প্রায় এক হাজার বছরের। মিসরীয়দের মাধ্যমে মৌমাছি পালনের গোড়াপত্তন ঘটে এবং উনিশ শতক থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৌমাছির ব্যাপকভিত্তিক গবেষণা ও বাণিজ্যিক লালন-পালন শুরু হয়। বিচিত্র প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদের পরাগায়নে মৌমাছির গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আফ্রিকা বা এশিয়ায় মৌমাছির উৎপত্তি হলেও বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরাগী পতঙ্গগুলোর মধ্যে এদের প্রাচুর্য ও গুরুত্ব সর্বাধিক।
মৌমাছির উপনিবেশ বা কলোনিতে যৌন প্রজননক্ষম একটি রানী মাছি, ১০০ থেকে ২০০ যৌন প্রজননে সক্ষম পুরুষ মাছি থাকে, যারা ড্রোন নামে পরিচিত। প্রতিটি মৌচাকে ২০ থেকে ৫০ হাজার যৌন প্রজননে অক্ষম স্ত্রী মাছি থাকে, যারা কর্মী মাছি নামে অভিহিত। এ কর্মী মৌমাছিগুলো সপুষ্পক উদ্ভিদের পরাগায়ন, ফুল থেকে পরাগরেণু ও সুধা সংগ্রহ, মৌচাক ও মধু তৈরিসহ তাদের উপনিবেশের সব কর্ম সম্পাদন করে থাকে। রানী ও পুরুষ মাছি প্রজনন ব্যতীত অন্য কোনো কাজ করে না। কর্মী মৌমাছিগুলোর শ্রমবিভাজন বয়সভিত্তিক সুনির্দিষ্ট। একটি রানী মৌমাছি তার তিন থেকে পাঁচ বছরের জীবনকালে অবিরত বংশবৃদ্ধি করে। মৌমাছির উপনিবেশ গড়ে বসবাস, অবিরত বংশবৃদ্ধি এবং বয়সভিত্তিক শ্রমবিভাজন বৈশিষ্ট্যাবলির কারণে তাদেরকে সুবিন্যস্ত সামাজিক (ইউসোস্যাল) পতঙ্গ বলা হয়। কর্মী মৌমাছিদের মস্তিষ্ক থেকে নিওটেনিন নামক ক্ষরিত রস তাদের কিশোরী গঠন ও স্বভাবের নিয়ন্ত্রক। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে এ রস ক্ষরণের মাত্রা পরিবর্তিত হয়। কর্মী মৌমাছির শ্রমবিভাজন তাদের মস্তিষ্ক থেকে ক্ষরিত নিওটেনিনের মাত্রার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
কর্মী মৌমাছির আয়ুষ্কাল পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ। তিন সপ্তাহ বা ততোধিক বয়সের কর্মী মৌমাছিগুলো ফুলের পরাগায়ন ঘটায় এবং পরাগরেণু ও সুধা সংগ্রহ করে। এ মৌমাছিগুলোর সুগঠিত পাখা, শক্ত ও মজবুত মুখোপাঙ্গ এবং পেছনের জোড়া পায়ে পরাগরেণু বহন উপযোগী উপাঙ্গ থাকায় তারা দ্রুত উড্ডয়নের মাধ্যমে কর্ম সম্পাদনে সক্ষম। কর্মী মৌমাছি ফুলের ওপর বসে তাদের শরীরের লোমগুলো দিয়ে বৈদ্যুতিক চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি ও বল প্রয়োগ করে ফুল থেকে পরাগরেণু আকর্ষণ করে। পা দিয়ে পরাগরেণু সংগ্রহ, দলিতকরণ ও দৃঢ়তাদান শেষে পেছনের পায়ের বিশেষ উপাঙ্গ বা পরাগ থলির মাধ্যমে সেগুলো বহন করে। একটি কর্মী মৌমাছি এক ফুল থেকে অন্য ফুলে ভ্রমণ করতে ৫-৭ সেকেন্ড সময় নেয় এবং তার জীবনকালে এক বর্গকিলোমিটার বা ৭০০ হেক্টর ফসলি মাঠে বিচরণ করতে পারে। একটি মৌচাকের সমগ্র কর্মী মৌমাছি বছরে চার বিলিয়ন ফুলের পরাগায়ন করতে সক্ষম। মৌমাছির পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের ফলন এবং ফল ও বীজের গুণগতমান বাড়ে। সপুষ্পক উদ্ভিদের শতকরা ৮০ ভাগের পরাগায়ন মৌমাছি দিয়ে হয় এবং মানুষের মোট খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশ মৌমাছির পরাগায়নের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। উদ্ভিদের পরাগরেণু, সুধা ও গ্রন্থি নিঃসৃত আঠা উদ্ভিদ ও মৌমাছি উভয়ের জীবনধারণ ও প্রজননের জন্য অত্যাবশ্যক। মৌমাছি উদ্ভিদ থেকে এগুলো পুরস্কার হিসেবে পুঁজি করতে গিয়ে প্রতিদানস্বরূপ পরাগায়নের মাধ্যমে ফল ও বীজ উৎপাদনে সহায়তা করে। সুতরাং পরাগায়ন উদ্ভিদ ও মৌমাছি উভয়ের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধনে একটি উৎকৃষ্ট সহবিবর্তন।
ফুলের বর্ণ, আকার, আকৃতি ও সৌরভে মৌমাছি আকৃষ্ট হয়। প্রতিটি কর্মী মৌমাছির মাথায় এক জোড়া শুঙ্গ থাকে। আবার প্রতিটি শুঙ্গে সংবেদনশীল তিন হাজার বার্তা আধার থাকায় সহজেই মৌমাছি ফুলের গন্ধ এবং পরাগরেণু, সুধা ও গ্রন্থি নিঃসৃত আঠার পরিমাণ ও গুণাগুণ উপলব্ধি করতে পারে। সূর্যালোকিত দিন, তাপমাত্রা ১২ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসের গতিবেগ প্রতি ঘণ্টায় ২৫ থেকে ৩৫ কিলোমিটারের মধ্যে বিদ্যমান থাকলে মৌমাছি কলোনি থেকে বিচরণে বের হয়। সকাল সাত ঘটিকার কাছাকাছি সময়ে অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সের কতিপয় কর্মী মৌমাছি সুধা সন্ধানে বের হয়। নিকটবর্তী চারণভূমি যেখানে ২০ শতাংশের অধিক ফুল প্রস্ফুটিত থাকে সেখান থেকে তারা সুধা আহরণে লিপ্ত হয়। তবে সুধা আহরণের জন্য তারা ছয় কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পরিভ্রমণ করে থাকে। কর্মী মৌমাছি সুধাসমৃদ্ধ ফুলের সন্ধান পেয়ে দ্রুত মৌচাকে ফিরে আসে। এরপর গোলাকার নৃত্য ও হেলেদুলে নৃত্য করে উৎস ফুলের দিকে ৪৫ ডিগ্রি কোণ তৈরি করে অন্যান্য কর্মী মৌমাছিকে সুধা সংগ্রহের পথ নির্দেশ করে এবং দলবদ্ধভাবে বেরিয়ে পড়ে।
কর্মী মৌমাছিদের মাথায় তিনটি সরলাক্ষি এবং দুটি পুঞ্জাক্ষি থাকে। প্রতিটি পুঞ্জাক্ষি ৬ হাজার ৩০০টি ওমাটিডিয়াম বা লেন্স দিয়ে গঠিত। অন্যদিকে একটি সরলাক্ষিতে একটিমাত্র লেন্স থাকে। সরলাক্ষি দিয়ে কর্মী মৌমাছি ফুলের প্রতিবিম্ব ধারণ করে না। কিন্তু ফুলের অবারিত অবস্থান ও তার পরাগরেণু এবং সুধা আহরণের রন্ধ্র উপলব্ধি করতে পারে। পুঞ্জাক্ষি দিয়ে ফুলের প্রতিবিম্ব ধারণ ও তার আকৃতি ও বর্ণ যাচাই করে থাকে। মৌমাছি ৩০০ থেকে ৬৫০ তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের অন্তর্বর্তী হলুদ, নীল, নীলাভ সবুজ ও বেগুনি বর্ণ দেখতে পায়। সাদা এ চার বর্ণের সন্নিবেশ বিধায় মৌমাছি সাদা ফুল শনাক্ত করতে এবং তাদের পরাগায়নে ভূমিকা রাখে। লাল আলোতে মৌমাছি দেখতে অক্ষম হলেও লাল রঙের ফুলে পরাগায়ন করে। কারণ লাল রঙের ফুলের অভ্যন্তরে অতিবেগুনি রশ্মি তারা হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম।
বাংলাদেশে পরাগরেণু ও সুধার উৎস হিসেবে বিচিত্র রকমের উদ্ভিদ রয়েছে। এ দেশের অনুকূল আবহাওয়ায় মৌমাছি সারা বছর এসব উদ্ভিদ থেকে খাদ্য আহরণ করে জীবন চক্র অব্যাহত রাখতে পারে। বাংলাদেশে বার্ষিক ৩০ হাজার মেট্রিক টন মধুর চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১০ হাজার মেট্রিক টন। আমাদের দেশে উৎপাদিত মধুর শতকরা ৭৫ ভাগ আসে সুন্দরবন থেকে। সুন্দরবনসহ দেশের অন্যান্য বনাঞ্চলের সপুষ্পক উদ্ভিদে সুধা ও পরাগরেণুর অবারিত উৎস রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে মৌমাছি চাষ করে মধু, মোম, মৌকাই (প্রোপলিস), রাজচিত মোরব্বা রস (রয়্যাল জেলি), পরাগরেণু (পোলেন) ও গরল (ভেনম) সংগ্রহ ও বিক্রি করে অর্থ উপার্জন এবং মৌকলোনী ফসলের পরাগায়নে ব্যবহার করে ফসলের অধিক ফলন প্রাপ্তি সম্ভব। কিন্তু কৃষিজমিতে অতিবিষাক্ত ও মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহার, কৃষিজমি ও বনভূমি হ্রাস, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং এক ফসলি চাষ মৌমাছির প্রাকৃতিক আবাসস্থল, স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননে ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
মৌকলোনীর উপজাত মানুষের পুষ্টি ও চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বর্তমান বিশ্বের যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কোরিয়া ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে মৌমাছির অনেক বাণিজ্যিক খামার বিকশিত হয়েছে। আমাদের দেশেও ৩০ হাজারের অধিক মৌখামারে ৮০ হাজারের অধিক লোক কর্মরত। দেশের গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, শেরপুর, সাভার, দিনাজপুর, রাজশাহী, বরগুনা ও সুন্দরবন এলাকায় মৌমাছির খামার প্রতিষ্ঠা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে এবং বাড়তি জমি ছাড়াই মৌখামার গড়ে তোলা সম্ভব। অল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত লোকও মাত্র এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণ লাভ করে মৌমাছি পালন করতে পারেন। আমাদের দেশে সরিষা, পেঁয়াজ, ধনে, গুয়ামৌরী, কালোজিরা, লিচু, বড়ই, তুলা প্রভৃতি ফসলের জমিতে মৌকলোনী স্থাপন করে এসব ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মৌকলোনীর উপজাত সংগ্রহ ও বিক্রি করে অর্থ উপার্জনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা ও টেকসই জীবিকার জন্যও মৌমাছি পালন করা দরকার।
ড. মো. রুহুল আমীন: অধ্যাপক, কীটতত্ত্ব বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর










