কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে মুহূর্তেই এক ভাষার কথা আরেক ভাষায় অনুবাদ করে দিতে পারে এটি। অনেকেই বলছেন, এখন আর অন্য ভাষা শেখার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ভাষাবিদদের মতে, প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, মানুষের ভাষা শেখার মূল্য কখনো হারাবে না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো বাড়বে।

ভাবুন, আপনি জাপানে আছেন। পাশের জাপানি বন্ধুটি কানে স্মার্ট ইয়ারবাড গুঁজল, আপনার কানেও ইয়ারবাড। আপনি বাংলায় বা ইংরেজিতে কথা বলছেন, আর সে শুনছে নিখুঁত জাপানিতে। আবার সে উত্তর দিচ্ছে তার ভাষায়, আর আপনি শুনছেন আপনার পছন্দের শব্দে।

এক সময় ব্যাপারটিকে কল্পবিজ্ঞান মনে হলেও এখন তা বাস্তব। এআই প্রযুক্তি এমন অনুবাদ ডিভাইস তৈরি করেছে, যা মুহূর্তেই ভাষাকে রুপান্তর করতে পারে। বিদেশে ভ্রমণ বা ব্যবসায়িক কাজে এ প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে দারুণ সহায়ক।

কিন্তু সুবিধার মধ্যেও আছে সীমাবদ্ধতা। আধুনিক প্রযুক্তি অনুবাদ করতে পারে, কিন্তু মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি ও সম্পর্কের গভীরতা বুঝতে পারে না।

ভাষাবিদদের মতে, ভাষা শেখা মানে শুধু শব্দ মুখস্থ করা নয়, বরং অন্যের সংস্কৃতি ও চিন্তাভাবনা বোঝার চেষ্টা। আপনি যদি কোনো দেশে গিয়ে শুধুমাত্র অনুবাদ অ্যাপ ব্যবহার করেন, তাহলে প্রয়োজনীয় কাজ হয়তো হয়ে যাবে। তবে সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ, বন্ধুত্ব বা বিশ্বাস তৈরি হবে না।

অন্যের ভাষা শেখার মাধ্যমে আমরা জানি, তারা কীভাবে চিন্তা করে, কেমন করে হাসে, কীভাবে আবেগ প্রকাশ করে। এ বোঝাপড়াই সম্পর্ককে করে তোলে গভীর ও মানবিক।

একটি শব্দের মানে অনেক সময় নির্ভর করে পরিস্থিতি, কণ্ঠস্বর ও ভঙ্গির ওপর। কোনো যন্ত্রের পক্ষেই এসব বোঝা সম্ভব নয়। এআই যতই উন্নত হোক, এটি মানুষের হাসি, কণ্ঠের ওঠানামা বা ভাষার আবেগ বুঝতে পারে না। আর তাই অনুবাদ অ্যাপ ব্যবহার করে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হলেও বাস্তব বোঝাপড়ার জায়গায় ফাঁক থেকে যায়।

এছাড়া প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা মানুষকে ধৈর্যহীন করে তোলে। শেখার আগ্রহ কমে যায়, কৌতূহল মরে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একাধিক ভাষা জানেন, তারা সাধারণত বেশি মনোযোগী, প্রখর স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন ও সৃজনশীল। বহুভাষিক মানুষরা সহজে নতুন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে পারেন। এমনকি বার্ধক্যে মানসিক দুর্বলতা বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও কম থাকে। বিশ্লেষণী চিন্তা, মনোযোগ, সহনশীলতা ও শেখার মানসিকতা সবই তৈরি হয় ভাষা শেখার মাধ্যমে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি নতুন ভাষা শেখা সেই ভাষায় কথা বলা মানুষের মনের দরজা খুলতে পারে। যেন অন্যের চোখ দিয়ে জগৎকে চিনতে শেখা।

দ্য কনভারসেশন অবলম্বনে