বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা ও অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলের বরফ গলনের হার বিজ্ঞানীদের শঙ্কিত করে তুলেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন রেকর্ড স্থাপিত হয়েছে চলতি বছর। বিপজ্জনক তাপপ্রবাহ ইউরোপকে নাকাল করে দিতে পারে আগামী দিনগুলোয়।
বিবিসিতে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, জলবায়ুসংক্রান্ত গবেষণা চলমান থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ভূ-বিজ্ঞানী থমাস স্মিথ বলেছেন, ‘আমি এমন কোনো সময়ের ব্যাপারে জানি না, যখন জলবায়ু সব দিক থেকেই এতটা নেতিবাচক দিকে ঝুঁকে পড়েছে।’ ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের প্রভাষক পাওলো চেপির জানিয়েছেন, পৃথিবী বর্তমানে এক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বেড়েছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা। একই সময় এল নিনোর কারণে আবহাওয়াজনিত পরিবর্তনের স্বাক্ষী হচ্ছে পৃথিবী।
চারটি জলবায়ু রেকর্ড অতিক্রম করতে যাচ্ছে এবারের গ্রীষ্মকাল। উষ্ণতম দিনের রেকর্ড, বৈশ্বিকভাবে উষ্ণতম জুনের রেকর্ড, তীব্র সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ ও অ্যান্টার্কটিকার ন্যূনতম বরফ। জুলাইয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে উষ্ণতম দিন লিপিবদ্ধ হয়েছে। প্রথমবারের মতো গড় তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড অতিক্রম করেছে। ৬ জুলাই গড় তাপমাত্রা ছিল ১৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তেল, কয়লা ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নিঃসরণ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পেছনে প্রধান অনুঘটক। আর এ উষ্ণায়নের ঊর্ধ্বমুখিতার পেছনে শতভাগ দায় মানুষের। এল নিনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বিশেষ করে প্যাসিফিক অঞ্চলে উষ্ণ প্রবাহ তৈরি হয় এর মাধ্যমে। বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে উষ্ণতা। চলতি বছর জুনে তাপমাত্রা ছিল শিল্প বিপ্লবের আগের জুনের তাপমাত্রার তুলনায় ১ দশমিক ৪৭ সেন্টিগ্রেড বেশি। ১৮০০ সালের দিকে শিল্প বিপ্লব শুরু হওয়ার পর থেকে মানুষ বিপুল মাত্রায় গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ করেছে বায়ুমণ্ডলে।
মে, জুন ও জুলাইয়ে সমুদ্রের গড় তাপমাত্রা রেকর্ড অতিক্রম করেছে। ২০১৬ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছর সেটাও অতিক্রম করে গেছে। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি উদ্বেগজনক। কারণ আটলান্টিকের এ অংশে তাপপ্রবাহ সচরাচর দেখা যায় না।
আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে গত জুনে তাপমাত্রা ছিল ৪-৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে। এতকিছুর মধ্যে একটা বিষয় স্পষ্ট, পৃথিবী উষ্ণায়নের পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আর তাপমাত্রা বাড়ার বড় একটা অংশ প্রভাব ফেলেছে সমুদ্রের ওপর। বৈশ্বিক মোট অক্সিজেনের ৫০ শতাংশ উৎপাদন করে সমুদ্র।
জুলাইয়ে অ্যান্টার্কটিকায় বরফ ছিল ন্যূনতম অবস্থানে, যা আরো বেশি উদ্বেগজনক। সামুদ্রিক স্রোত কিংবা স্থানীয় পরিবেশের কারণেও বরফের পরিমাণ কমে যেতে পারে। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়ন পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এর আগে জুলাইয়ে এমন নেতিবাচক অবস্থা দেখা যায়নি। বিজ্ঞানীরা একে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম উদ্বেগজনক প্রভাব হিসেবেই চিহ্নিত করতে চান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা না গেলে আগামী দিনগুলোয় রেকর্ড ভাঙতেই থাকবে। তৈরি হবে উষ্ণায়নের নতুন রেকর্ড। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতি বিপৎসীমা অতিক্রম করে গেছে। বলতে গেলে মানবজাতি এখন নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। হয়তো এখনো কিছুটা সময় আছে সতর্ক হয়ে ওঠার জন্য।










