মার্কিন প্রসিকিউটরদের পক্ষ থেকে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা ২৫৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বড় দুটি চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে কেনিয়া। এর পাশাপাশি শ্রীলংকার সঙ্গে হওয়া আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেডের একটি চুক্তিও পুনর্বিবেচনার আলাপ উঠেছে দেশজুড়ে। তার সঙ্গে আদানি গ্রুপের একটি কয়লা খনির কর্মীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে অস্ট্রেলিয়ায়।

গত বুধবার ভারতীয় ধনকুবের আদানি গ্রুপের চেয়ারপারসন গৌতম আদানি ও তার কয়েকজন সহযোগীর বিরুদ্ধে ঘুস ও প্রতারণার অভিযোগ আনেন নিউইয়র্কের ফেডারেল কৌঁসুলিরা। অভিযোগ ওঠে, আদানি গ্রিন এনার্জির নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ পাওয়ার জন্য ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের ২৫ কোটি ডলার ঘুস দিয়েছিলেন গৌতম আদানি। এ প্রকল্প থেকে ২০ বছরে ২০০ কোটি ডলার মুনাফা আসার কথা রয়েছে। কোম্পানিটি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ঋণ ও বন্ডের মাধ্যমে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে। এসব বন্ডে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মার্কিন ও অন্য দেশের বিনিয়োগকারীরাও রয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিকিউটরদের আনা অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে আদানি গ্রুপ।

এ ঘটনার পর বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে কেনিয়ার প্রধান বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প এবং দেশটির বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন স্থাপনে তাদের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেন দেশটির প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো। তিনি বলেন, ‘আমাদের তদন্ত সংস্থা এবং অংশীদার দেশগুলোর দেয়া নতুন তথ্যের ভিত্তিতে চুক্তিগুলো বাতিল করা হয়েছে। যদি দুর্নীতির বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া যায় বা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য আসে, তাহলে আমরা আরো কঠোর পদক্ষেপ নেব।’

কেনিয়ার প্রধান বিমানবন্দরে ১৮৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিল আদানি গ্রুপ। চুক্তি অনুযায়ী বিমানবন্দরটি ৩০ বছর পরিচালনা করার কথাও ছিল তাদের। এছাড়া বিমানবন্দর প্রকল্পের অধীনে নতুন রানওয়ে এবং জোমো কেনিয়াট্টা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে যাত্রী টার্মিনাল নির্মাণেরও পরিকল্পনা ছিল আদানি গ্রুপের। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন স্থাপনের জন্য দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ৭৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের একটি চুক্তিও ছিল আদানি গ্রুপের।

শুরু থেকেই চুক্তিগুলোর বিষয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আসছিল দেশটির সাধারণ মানুষ। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, কেনিয়ার অনেকেই চুক্তির আওতাধীন প্রকল্পগুলোয় দুর্নীতির আশঙ্কা করছিলেন। এমনকি গত সেপ্টেম্বরে বিমানবন্দরের কর্মীরা চুক্তির বিরুদ্ধে ধর্মঘটও করেছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, এ চুক্তির ফলে অনেক কর্মী চাকরিচ্যুত হতে পারেন।

বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট রুটো চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয়ার পর দেশটির সংসদ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।

যদিও কেনিয়ার জ্বালানি মন্ত্রী অপিও ওয়ানডায়ি বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে নিজ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে আমলে নিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার অঙ্গীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট রুটো।

প্রেসিডেন্ট রুটো জানিয়েছেন, তার সরকার এখন বিমানবন্দর ও জ্বালানি প্রকল্পের জন্য নতুন অংশীদার খুঁজতে শুরু করবে।

অন্যদিকে ২০২৩ সালে শ্রীলংকার বিদ্যুৎ খাতে ৪৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে আদানির প্রতিষ্ঠান আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেড। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিকিউটরদের পক্ষ থেকে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর আলাপ উঠছে শ্রীলংকার সঙ্গে হওয়া চুক্তিটি পুনর্বিবেচনারও। দেশটির অ্যাক্টিভিস্টরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে তদন্ত করে চুক্তিটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। কলম্বোভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ভেরিটে রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক নিশান দে মেল সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে বলেছেন, ‘শ্রীলংকা সরকারের উচিত তাদের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান আরো শক্ত করা, যেন আমরা দুর্নীতিমূলক চুক্তিগুলো থেকে মুক্তি পাই।’

চুক্তিটি হয় গোতাবায়া রাজাপাকসের আমলে। ওই সময় শ্রীলংকান সরকারি প্রতিষ্ঠান সিলন ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের (সিইবি) একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছিলেন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর চাপে গোতাবায়া রাজাপাকসে সরকার আদানি গ্রুপকে প্রকল্পটি দিয়েছে। অবশ্য কিছুদিন পর ওই কর্মকর্তা বক্তব্য প্রত্যাহার করে পদত্যাগ করেছিলেন। পরে রাজাপাকসে সরকারের পতন হলে রণিল বিক্রমাসিংহে এ প্রকল্পটি এগিয়ে নিয়ে গেছেন। সম্প্রতি দেশটির জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেন আনুরা কুমার দিশানায়েকে। নির্বাচনের আগে তিনি বলেছেন, ‘আমরা ক্ষমতায় এলে আদানির সঙ্গে হওয়া দুর্নীতিমূলক চুক্তিটি বাতিল করে দেব।’

আদানির সঙ্গে শ্রীলংকার চুক্তিটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল আগেই। শুরু থেকেই পরিবেশগত নেতিবাচক প্রভাব ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে অভিযোগ ছিল। কলম্বোভিত্তিক নিউজ পোর্টাল ইকোনমিনেক্সটের পরামর্শক সম্পাদক শিহার আনিজ বলেছেন, ‘আদানির সঙ্গে হওয়া চুক্তিটি সরকারের সঙ্গে সরকারের নাকি এটি শুধুই বেসরকারি খাতের একটি বিনিয়োগ, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। সংসদেও আমরা এ নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় দেখেছি।’

এদিকে অস্ট্রেলিয়ায় আদানির কয়লা খনির কর্মীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের নাগানা ইয়ারবাইন ওয়াঙ্গান এবং জাগালিংগু কালচারাল কাস্টোডিয়ানস নামে দুটি সংস্থা আদানির কর্মীদের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেছে। তাদের অভিযোগে বলা হয়েছে, আদানির কারমাইকেল কয়লা খনির কর্মীরা স্থানীয় আদিবাসী গোষ্ঠীকে তাদের উৎসব উদযাপনে মৌখিক ও শারীরিকভাবে বাধা দিয়েছে এবং বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছে।

নাগানা ইয়ারবাইনের সিনিয়র কালচারাল কাস্টোডিয়ান আদ্রিয়ান বুরাগুব্বা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা বছর বছর ধরে আদানির বৈষম্যের শিকার হয়েছি। আর সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। গত বছরও আমাদের আইনজীবীরা আদানির কর্মীদের আচরণে উদ্বেগ জানিয়ে নোটিস দিয়েছেন। কিন্তু তারা তা আমলে নেয়নি। আমরা মনে করি, এখন আইনি ব্যবস্থাই একমাত্র সমাধান।

আদিবাসী গোষ্ঠীটি চাইছে, আদানির প্রতিষ্ঠান তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার পাশাপাশি তাদের কাছে ক্ষমা চাইবে। এর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা নেতিবাচক কনটেন্ট মুছে ফেলবে এবং প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক, ব্যবস্থাপক ও কর্মীদের সাংস্কৃতিক সচেতনতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেবে।

তবে খনি কর্তৃপক্ষ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, ‘এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমরা কুইন্সল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ান আইনের অধীনেই আদিবাসীদের ভূমি ব্যবহার বিষয়ে চুক্তি করেছি। স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল সম্পর্ক বজায় রেখে আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’