গাজা উপত্যকায় হামলা আরো জোরদার করেছে ইসরায়েল। একের পর এক এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বাসিন্দাদের। জীবন বাঁচাতে উপত্যকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটছেন তারা। ইসরায়েল বলছে, তারা গাজার ‘বিস্তীর্ণ এলাকা’ দখলে নেবে এবং হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান আরো তীব্র করবে। এ অভিযান ততদিন চলবে, যতদিন হামাস একটি সংশোধিত যুদ্ধবিরতির শর্তে রাজি না হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, তাদের পদক্ষেপ এ অঞ্চলের ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

শুক্রবার জাতিসংঘের ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা-সংক্রান্ত সংস্থা (ওসিএইচএ) জানায়, গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় ফিলিস্তিনিদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে অথবা সেখান থেকে তাদের বের করে দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ গাজার রাফার বড় একটি অংশ। গত ৩১ মার্চ সেখান থেকে ফিলিস্তিনিদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয় ইসরায়েল। উত্তরে গাজা নগরীর বিভিন্ন অংশেও এ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। শুক্রবার সেখানে নতুন করে স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

সম্প্রতি গাজার দক্ষিণাঞ্চলের কিছু অংশ দখলে নেয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল ইসরায়েল। সবশেষ গত শুক্রবার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তাদের সেনারা গাজার উত্তরাঞ্চলের একটি এলাকায় প্রবেশ করেছে এবং নতুন কিছু অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

তবে গাজা উপত্যকায় বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। সেখানে ইসরায়েলি সেনার সংখ্যা বাড়ার তেমন কোনো চিত্র চোখে পড়েনি, বরং উপত্যকাজুড়ে প্রচণ্ড বোমা হামলা চালানো হয়েছে।

গাজায় চলমান সংঘাতে বৃহস্পতিবার ঘটে গেছে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়। লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি নিরাপত্তার খোঁজে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করেছে। ইসরায়েলি বাহিনী রাফাহ শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার পরই গাজার সাধারণ মানুষ নিজেদের ঘর ছাড়তে শুরু করে।

ইসরায়েল রাফাহর কিছু অংশকে নতুন একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং সেটি দখলের পরিকল্পনা করছে। ফলে সেখানকার অসংখ্য মানুষ নিজেদের সম্পদ ও আশ্রয় ফেলে পালাতে বাধ্য হচ্ছে, যা অঞ্চলটির মানবিক সংকট আরো গভীর করেছে।

তারও আগে গত বুধবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘হামাসের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য ইসরায়েল গাজা উপত্যকাজুড়ে একটি নতুন নিরাপত্তা করিডোর স্থাপন করছে, যা রাফা শহরকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে। ইসরায়েল এরই মধ্যে রাফা খালি করার নির্দেশ দিয়েছে।’

ওইদিন এ নতুন নিরাপত্তা করিডোরকে ‘মোরাগ করিডোর’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন নেতানিয়াহু। এ নামকরণ একটি ইহুদি বসতির নামে করা হয়েছে, যার অবস্থান এক সময় রাফা ও খান ইউনিসের মধ্যে ছিল। নতুন করিডোরটিও যে এ দুই শহরের মধ্য দিয়ে যাবে, এটা তারই ইঙ্গিত দেয়। তিনি জানান, এটি হবে দ্বিতীয় ফিলাডেলফি করিডোর। এটি গাজা ও মিসরের সীমান্ত বরাবর অবস্থিত এবং গত মে থেকে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত মাসে নেতজারিম করিডোরের ওপর পুনরায় তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ইসরায়েল। এটি গাজার উত্তরের এক বিশাল অংশকে গাজা শহর ও উপকূলের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। দুই করিডোরই ইসরায়েলি সীমান্ত থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত।

ইসরায়েলের এ পদক্ষেপকে বোঝাতে সাবেক ফিলিস্তিনে সরকারি কার্যক্রমের সাবেক প্রধান কর্নেল (অব.) গ্রিশা ইয়াকুবোভিচ জানান, উত্তর গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর ‘বাফার জোন’ তৈরির শুরুর দিকে ওই এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের নির্দেশনা এসেছিল। সে সময় সেখানে হামাসের শক্ত ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সীমান্ত পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিধি স্থাপন করেছিল ইসরায়েল। দক্ষিণের ক্ষেত্রেও রাফার জনগণকে সরিয়ে নিয়ে এমনই একটি বাফার জোন সম্প্রসারণের চেষ্টা করতে পারে আইডিএফ। এর মাধ্যমে এ সীমান্ত অঞ্চলগুলো দখলে রেখে ইসরায়েলি সম্প্রদায়গুলো রক্ষার পাশাপাশি হামাসের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে তারা।

ফিলিস্তিনে সরকারি কার্যক্রমের প্রাক্তন সমন্বয়কারী মেজর জেনারেল (অব.) এইতান ডাঙ্গট মনে করেন, মোরাগ করিডোর দখলের মধ্য দিয়ে গাজাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনটি বিস্তৃত অংশে ভাগের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এর অর্থ হলো ইসরায়েল বা আইডিএফ একটি খুব স্পষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যাতে অঞ্চলগুলো সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।