দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলকে অভিশংসন করেছে দেশটির পার্লামেন্ট। গতকাল তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে ২০৪ জন আইনপ্রণেতা পক্ষে ভোট দেন। ফলে সুক-ইওল তাৎক্ষণিকভাবে পদ থেকে বরখাস্ত হবেন এবং প্রধানমন্ত্রী হান ডাক-সু ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। খবর বিবিসি ও এপি।

বিরোধী দলগুলোর ইউনকে অভিশংসন করতে অন্তত আটটি ক্ষমতাসীন পিপল পাওয়ার পার্টির (পিপিপি) ভোটের প্রয়োজন ছিল। কারণ ৩০০ আসনবিশিষ্ট একক চেম্বারের পার্লামেন্টে বিরোধীদের আসন ১৯২টি এবং অভিশংসনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। সে অনুযায়ী, প্রয়োজনের চেয়ে চারটি ভোট বেশি পড়েছে ইউন সুক-ইওলকে অভিশংসনের পক্ষে।

ইউনকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে বরখাস্ত করা হবে নাকি তার ক্ষমতা পুনর্বহাল করা হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাংবিধানিক আদালতের হাতে ১৮০ দিন সময় রয়েছে। যদি তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় তাহলে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক আইন জারির কারণে দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসন ভোটের সম্মুখীন হন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল। স্বল্পস্থায়ী সামরিক আইন জারির প্রচেষ্টার কারণে গতকাল তাকে দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসন ভোটের মুখোমুখি হতে হয়। ৩ ডিসেম্বর সামরিক শাসন জারির সিদ্ধান্ত নেয়ার ৬ ঘণ্টার মধ্যেই প্রবল বিরোধিতার মুখে ইউন সেটি প্রত্যাহারে বাধ্য হন। তবে তার এ পদক্ষেপ দক্ষিণ কোরিয়াকে ঠেলে দেয় সাংবিধানিক সংকটের মুখে। আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ইউনের পদত্যাগের দাবি আসতে থাকে চারদিক থেকে। বিরোধী দলগুলো অভিশংসন ভোটের আগে বড় ধরনের বিক্ষোভ আয়োজন করে।

ইউনের রক্ষণশীল পিপিপি এক সপ্তাহ আগে প্রথম অভিশংসন ভোট বয়কট করেছিল। যার ফলে কোরাম পূরণ করা সম্ভব হয়নি। পিপিপি নেতা হান ডং-হুন দলের সদস্যদের এবার অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেয়ার আহ্বান জানান এবং অন্তত সাতজন পিপিপি সদস্য অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেয়ার কথা বলেছিলেন।

পার্লামেন্টের স্পিকার উ ওন-শিক বলেন, ‘ইউনের অভিশংসন গণতন্ত্র, সাহসিকতা ও অঙ্গীকারের জন্য জনগণের দৃঢ় আকাঙ্ক্ষার ফল।’ অভিশংসনের পর কয়েক হাজার মানুষ পার্লামেন্টের কাছে জড়ো হন। তারা ব্যানার ও রঙিন কে-পপ গ্লো স্টিক নেড়ে উচ্চৈঃস্বরে উল্লাস করতে থাকেন। সে সময় একজন চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘আমরা সংবিধান রক্ষা করেছি।’

ইউন এক বিবৃতিতে বলেছেন, তিনি কখনই হাল ছাড়বেন না। প্রেসিডেন্টের পদ থেকে ‘সাময়িক’ বিরতির সময় সরকার সুষ্ঠুভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ইউন আরো বলেন, ‘আমি যেসব সমালোচনা, উৎসাহ ও সমর্থন পেয়েছি তা মনে রাখব। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশের জন্য আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাব।’

৩ ডিসেম্বর জরুরি ভিত্তিতে সামরিক আইন জারির সময় ইউন সুক-ইওল টেলিভিশন ভাষণে বলেন, ‘উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট বাহিনীর হুমকি থেকে উদারপন্থী দক্ষিণ কোরিয়াকে সুরক্ষা দিতে এবং রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন শক্তি নির্মূলে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।’ ডেমোক্রেটিক পার্টির বিরুদ্ধে পার্লামেন্ট নিয়ন্ত্রণ, উত্তর কোরিয়ার প্রতি সহানুভূতি দেখানো ও রাষ্ট্রবিরোধী নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারের কাজকে বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ আনেন তিনি। তবে এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই সামরিক আইন প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। পার্লামেন্ট সদস্যদের বিরোধিতার মুখে তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন। এ বিষয়ে পার্লামেন্টে ভোটের পর তিনি বলেন, ‘সামরিক আইনের অবসান ঘটাতে পার্লামেন্টের অবস্থান তিনি মেনে নেবেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর এ আইন প্রত্যাহার করা হবে।’

এরপর ৪ ডিসেম্বর ইউন সুক-ইওল অভিশংসনের মুখে পড়েন। দেশটির আইনপ্রণেতারা তার বিরুদ্ধে বিল এনে এ প্রক্রিয়া শুরু করেন। ছয়টি বিরোধী দল আগে প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলকে অভিশংসন করতে একটি প্রস্তাব দেয়। এরপর এ প্রস্তাব পরদিন পার্লামেন্টের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে উপস্থাপন করা হয়। নিয়মানুযায়ী, প্রস্তাবের ওপর ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই ভোট হতে হয়। অভিশংসন কার্যকর করতে ৩০০ সদস্যের পার্লামেন্টে প্রস্তাবের পক্ষে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ২০০টি ভোট পড়তে হবে।

সামরিক আইন জারির জন্য ইউন সুক-ইওল জাতির কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন। তখন এ-জাতীয় আর কোনো আদেশ দেয়া হবে না বলেও জানান তিনি। টেলিভিশন ভাষণে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি অত্যন্ত দুঃখিত এবং যারা মর্মাহত হয়েছেন তাদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাচ্ছি। সামরিক আইন জারির বিষয়ে আমি কোনো আইনি বা রাজনৈতিক দায় এড়াব না।’ সামরিক আইন জারির পর জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রথম এ ভাষণে তিনি পদত্যাগ করবেন বলে অনেকেই ধারণা করেছিলেন। কিন্তু তা তিনি করেননি। পরিবর্তে তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার কাজটি তার ক্ষমতাসীন দলের কাছে অর্পণ করবেন। তিনি অভিশংসনের কথাও উল্লেখ করেননি। পরবর্তী সময়ে গতকাল দ্বিতীয় দফায় তিনি অভিশংসনের মুখে পড়েন।