বিশ্বে সংঘাত ও এর প্রভাব দিন দিন বেড়েই চলেছে। গত তিন বছরে সংঘাতের কারণে বিশ্বের যেসব এলাকা প্রভাবিত হয়েছে, তার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ শতাংশে, যা ভারতের আয়তনের হিসাবে প্রায় দ্বিগুণ। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

বিশ্বব্যাপী ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও পরামর্শবিষয়ক সংস্থা ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফট প্রকাশিত সর্বশেষ কনফ্লিক্ট ইনটেনসিটি ইনডেক্স (সিআইআই) অনুসারে, ২০২১ সাল থেকে ইউক্রেন, মিয়ানমার, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলকে ঘিরে তৈরি হওয়া ‘সংঘাতপূর্ণ করিডোরে’ যুদ্ধ ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে এবং তীব্রতর হয়েছে। কভিড-১৯ মহামারীর সময় বৈশ্বিক সংঘাত কিছু সময়ের জন্য কমেছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১০ বছর ধরে সহিংসতা বাড়ছে এবং অনেক দীর্ঘস্থায়ী সংকট এখনো চলছে।

ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের গবেষণা পরিচালক হিউগো ব্রেনান জানান, সাম্প্রতিক সংঘাত ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় শস্য রফতানি ব্যাহত করেছে এবং ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের আক্রমণ লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে প্রভাব ফেলেছে।

তিনি বলেন, ‘সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে, গত কয়েক বছর তা হয়ে আসছে। বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়ীদের এ বিষয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। আপনি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দিকে তাকিয়ে ভাবতে পারেন যে সুদানে তো আমার কোনো কারখানা নেই। এতে আমার ব্যবসায় কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে সাপ্লাই চেইন প্রভাবিত হওয়ার মধ্য দিয়ে দূরবর্তী স্থানেও সংঘাতের কারণে আপনি ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।’

সিআইআই অনুসারে, বর্তমানে ৬১ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার (২৪ লাখ বর্গমাইল) ভূমি যুদ্ধের কারণে প্রভাবিত হচ্ছে, যা পৃথিবীর মোট আয়তনের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২১ সালের তুলনায় যা ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। এছাড়া সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়েছে ২৯ শতাংশ। ২০২১ সাল থেকে একুয়েডর, কলম্বিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডসহ ২৭টি দেশে উল্লেখযোগ্য হারে ঝুঁকি বেড়েছে।

প্রতিবেদনে মালি থেকে সোমালিয়া পর্যন্ত সাহেল ও আফ্রিকার শৃঙ্গকে (হর্ন অব আফ্রিকা) একটি ‘সংঘাত করিডোর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে গত তিন বছরে সহিংসতা দ্বিগুণ হয়েছে। বুরকিনা ফাসোর ৮৬ শতাংশ এলাকা এখন সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে সুদান ও ইথিওপিয়ায় বড় ধরনের সহিংসতা দেখা দিয়েছে।

এসওএস চিলড্রেনস ভিলেজ ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অ্যাঞ্জেলা রোজালেস বলেন, ‘ইউক্রেন, সুদান, গাজা, লেবাননসহ বিভিন্ন দেশে যুদ্ধের কারণে বিশ্বের প্রায় ৪৭ কোটি শিশু প্রভাবিত হয়েছে। এ প্রভাব মৃত্যু বা আঘাতে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের জীবনে পড়ছে দীর্ঘমেয়াদি গুরুতর প্রভাব।’

অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটার (এসিএলইডি) প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ক্লিওনাড রেলে বলেন, ‘নতুন সংঘাত শুরু হওয়ায় ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে সহিংস ঘটনা বেড়েছে ২৭ শতাংশ। একই সময় পুরনো দ্বন্দ্ব এখনো অব্যাহত রয়েছে। কম দ্বন্দ্ব শেষ হচ্ছে বা কম তীব্র হয়ে উঠছে এ রকম ঘটনা খুবই কম। পাশাপাশি আরো অনেকগুলো সংঘাত শুরু হচ্ছে। মিয়ানমারের মতো দেশ যেখানে একাধিক ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠী লড়াই করছে, সেখানে সবকিছুর সমাধান করে শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন।’

তিনি জানান, সহিংসতা যে বাড়তেই থাকবে এ কারণে তিনি উদ্বিগ্ন। এর পেছনে আংশিকভাবে দায়ী ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা। তিনি এমন একটি প্রবণতার কথাও উল্লেখ করেছেন যেখানে অভ্যুত্থান, গুপ্তহত্যা বা ক্ষমতা দখলের জন্য সহিংসতা ব্যবহার করে মিলিশিয়ারা কোনো পরিণতির মুখোমুখি না হয়েই এসব কর্মকাণ্ড করছে।

অ্যাকশন অন আর্মড ভায়োলেন্সের নির্বাহী পরিচালক ইয়ান ওভারটন বলেন, ‘বিশেষ করে সিরিয়া ও ইরাকে ২০১০ সাল থেকে সহিংসতা বাড়তে থাকে, যা গত দশকের মাঝামাঝি সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তখন ছোট অস্ত্র ও ঘরে তৈরি বিস্ফোরক ব্যবহার করে অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু চলতি দশকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে ড্রোন ও বিমান হামলার মাধ্যমে।