গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত বিমান ও স্থল হামলায় গতকাল ভোর থেকে কয়েক ঘণ্টায় অন্তত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতাল সূত্রের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, এর মধ্যে ২৭ জনই গাজা সিটির বাসিন্দা। এছাড়া নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ড্রোন হামলায় দুই শিশুসহ মৃত্যু হয়েছে অন্তত চারজনের।
গতকাল সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলার পর আকাশে ঘন ধোঁয়া উঠছে। গাজার পশ্চিম তীরেও বেড়েছে সহিংসতা। বেথলেহেমের পূর্বে কিসান গ্রামে ইসরায়েলি দখলদার বসতি স্থাপনকারীরা স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ও কৃষিজমিতে হামলা চালিয়েছে। নুসেইরাত থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক হিন্দ খুদারি জানান, অনবরত হামলায় আতঙ্কিত মানুষের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। সমুদ্রতীরের হাইওয়ের ধারে, এমনকি আবর্জনার স্তূপের ওপরও তাঁবু ফেলছেন তারা। পানযোগ্য পানি ও খাবারের তীব্র সংকট, জরুরি চিকিৎসাসেবা নেই বললেই চলে।
তীব্র দুর্ভিক্ষের কবলে পড়া গাজায় খাদ্যঘাটতি, মারাত্মক অপুষ্টি ও ক্ষুধাজনিত কারণেও মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, গাজার প্রায় ৩৯ শতাংশ মানুষ দীর্ঘ সময় অনাহারে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। উপত্যকার মাসিক খাদ্যের চাহিদা প্রায় ৬২ হাজার টন হলেও সরবরাহ তার তুলনায় অনেক কম। উত্তর গাজায় সাহায্য পৌঁছানোও ক্রমে কঠিন হয়ে পড়েছে। রয়টার্সের তথ্যে দেখা গেছে, জিকিম রুট বন্ধ থাকায় খাদ্য সরবরাহের অর্ধেক পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় কার্যালয়ের (ওসিএইচএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২-২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মাত্র ৪৩৬টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করতে পেরেছে যা আগের তুলনায় ৫৮ শতাংশ কম। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, গাজায় যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এ দুর্ভিক্ষ আরো প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় গাজা যুদ্ধ থামাতে নতুন ২১ দফা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ প্রস্তাবে গাজা পুনর্গঠন, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কার, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে অন্তর্বর্তীকালীন টেকনোক্র্যাট সরকার গঠনের কথা রয়েছে। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু বরাবরই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা নাকচ করে আসছেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে গাজায় যুদ্ধ দ্রুত বন্ধের আহ্বান জানান। গাজায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক চুক্তির অংশ স্থগিত করার মতো অর্থনৈতিক পদক্ষেপ বিবেচনা করছে ইউরোপীয় কমিশন। তবে বিশ্বজুড়ে কড়া সমালোচনার মধ্যেও শুক্রবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, গাজায় যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে এবং হামাসকে নির্মূল করা হবে। ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্র কয়েকটি দেশ সম্প্রতি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলেও নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক চাপ তার নীতি পরিবর্তন করতে পারবে না।
গত বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের অভিযানে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৬৫ হাজার ৫৪৯ ফিলিস্তিনি নিহত ও ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫১৮ জন আহত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে আরো হাজারো মানুষের মরদেহ।










