যুদ্ধের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই এ উৎসব পালন করছে ইরানিরা। গতকালও দেশটিতে হামলা চালিয়ে ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডসের এক মুখপাত্রকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। জবাবে ইসরায়েলে মিসাইল হামলা চালাচ্ছে ইরানও। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, আগের মধ্যরাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত অন্তত ১০ দফায় ইরানের মিসাইল হামলা মোকাবেলা করতে হয়েছে দেশটিকে। এছাড়া কুয়েতে মিনা আল আহমাদি নামে একটি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারেও গতকাল হামলা চালিয়েছে ইরান। চলমান সংঘাত দ্রুতই আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে আরো বিস্তৃত আকার ধারণ করার আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা। খবর আরব নিউজ, রয়টার্স ও এপি।
তেহরানের কেন্দ্রস্থলসহ ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা শুরুর কথা জানিয়ে গতকাল বিবৃতি দেয় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। একই সঙ্গে কাস্পিয়ান সাগর-তীরবর্তী নূর অঞ্চলেও আঘাত করেছে তারা। বিবৃতিতে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাইনিকে হত্যা করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে আইডিএফ।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জানিয়েছে, গতকালও দেশটি ইরান থেকে ছোড়া একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে। একই ধরনের হামলার মুখে পড়েছে কুয়েত ও বাহরাইনও। বর্তমানে গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলে সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে উঠেছে বলে সেখানকার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
যুযুধান দুই পক্ষেরই এখন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে জ্বালানি অবকাঠামো। এর পেছনে সামরিক কৌশলের পরিবর্তে পরস্পরের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির উদ্দেশ্য থেকেই এ হামলা চালানো হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এর আগে গত বুধবার ইরানের সাউথ পারস গ্যাস ক্ষেত্রে হামলা চালায় ইসরায়েল। প্রতিক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক জ্বালানি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রফতানি কেন্দ্রগুলোর অন্যতম রাস লাফান। হামলায় রাস লাফানের সরবরাহ সক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আশঙ্কা করা হচ্ছে, কাতার থেকে বিশ্বব্যাপী গ্যাস সরবরাহে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, ওই হামলায় কাতারের এলএনজি রফতানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এর ফলে দেশটিতে বছরে আনুমানিক ২০ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং ইউরোপ ও এশিয়ায় গ্যাস সরবরাহ হুমকির মুখে পড়েছে।
একই দিন সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের একটি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারেও হামলা চালানো হয়। ওই পরিশোধনাগার ব্যবহার করে দেশটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে জ্বালানি তেল রফতানির প্রয়াস নিচ্ছিল। কিন্তু ওইদিনের হামলায় সেই বিকল্প নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল পরিবহন হয় পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে। বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এ প্রণালি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ দিয়ে পণ্য ও জ্বালানিবাহী নৌযান চলাচল এক প্রকার অসম্ভব হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা প্রণালিটি নিরাপদ রাখতে উদ্যোগ নেয়ার কথা বললেও এখনো তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, জাপান ও কানাডা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে সহায়তা করতে দেশগুলো প্রস্তুত। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে উত্তোলন বাড়ানোর ওপরও জোর দেয়া হয়েছে। তবে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মার্জ এরই মধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, চলমান সংঘাতে দেশটির সরাসরি কোনো সামরিক ভূমিকা গ্রহণের পরিকল্পনা নেই এবং যতক্ষণ পর্যন্ত উভয় পক্ষের বন্দুক শান্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ জার্মানি এগিয়ে আসবে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্রাসেলস সম্মেলনের পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা ও উত্তেজনা কমানোই এখন আমাদের পক্ষে সর্বোত্তম কাজ। আমি এখনো কাউকে এ সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী হতে শুনিনি—বরং উল্টোটাই দেখেছি।’
মিত্রদের কাছ থেকে প্রত্যাশামাফিক সমর্থন না পাওয়ায় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দেশটির অভ্যন্তরেও এ যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।










