এ ঘটনায় অন্তত ৮০ জনের মৃত্যু হয়। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ ভারত সরকারের আমন্ত্রণেই ইরানের এ আধুনিক যুদ্ধজাহাজটি বঙ্গোপসাগরে উপস্থিত হয়েছিল।
জানা যায়, ভারতীয় নৌবাহিনীর আয়োজনে বঙ্গোপসাগরের পূর্ব উপকূলে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক নৌমহড়া ‘মিলন’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ইরানের অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’র আগমনের ছবি শেয়ার করে তাকে স্বাগত জানিয়েছিল ভারতের ইস্টার্ন নেভাল কমান্ড। পোস্টে লেখা হয়েছিল, ভারতীয় নৌবাহিনী বিশাখাপত্তমে ইরানি নৌবাহিনীর ‘আইআরআইএস ডেনা’-কে স্বাগত জানাচ্ছে... যা দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতিফলন।
ভারত আয়োজিত নৌমহড়াটি শেষ হয় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি। এর তিনদিন পর ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে বিদায় নেয়ার পরপরই পরিস্থিতি বদলে যায়। এদিনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বড় ধরনের আক্রমণ চালায়। এর পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা শুরু করে তেহরান।
চলমান যুদ্ধপরিস্থিতির মধ্যে ‘আইআরআইএস ডেনা’ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থান করছিল। ৪ মার্চ সকালে জাহাজটি থেকে একটি বিপৎসংকেত পায় শ্রীলংকান নৌবাহিনী। ১৮০ জন ক্রু সদস্য নিয়ে জাহাজটি যখন আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করছিল, তখনই মার্কিন সাবমেরিন থেকে এটি আক্রান্ত হয়।
শ্রীলংকান নৌবাহিনীর মুখপাত্র কমান্ডার বুদ্ধিকা সম্পথ জানিয়েছেন, জরুরি সংকেত পাওয়ার পর কলম্বো দ্রুত উদ্ধারকারী দল পাঠায়। যদিও ঘটনাটি শ্রীলংকার জলসীমার বাইরে ঘটেছে, তবুও মানবিক কারণে তারা এ অভিযানে অংশ নেয়।
উদ্ধারকৃতদের মধ্যে জাহাজটির কমান্ডার ও বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন। আক্রান্তরা লংকান নৌবাহিনীকে নিশ্চিত করেছেন, কোনো প্রকার সতর্কতা ছাড়াই তারা সাবমেরিন হামলার শিকার হয়েছেন। বর্তমানে উদ্ধারকৃত মরদেহগুলো গলের কারাপিতিয়া হাসপাতালে রাখা হয়েছে। সাগরে এখনো নিখোঁজ নাবিকদের সন্ধানে অনুসন্ধান চলছে।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাহাজটিকে আতিথেয়তা দেয় তারা। ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারত ত্যাগের পর জাহাজটির সঙ্গে ভারতের কোনো আনুষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না। যুদ্ধ ঘোষণার পর ইরান ভারতের কাছে কোনো সহায়তাও চায়নি। তবে বঙ্গোপসাগরে মহড়া দিয়ে ফেরার পথে এমন হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে ভারতকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
নিমজ্জিত জাহাজটি ছিল ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘মৌজ-ক্লাস’ ফ্রিগেট। এটি ভারী কামান, আধুনিক মিসাইল এবং টর্পেডোতে সজ্জিত ছিল। গভীর সমুদ্রে ইরানের সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এ ফ্রিগেটটি ছিল তেহরানের তুরুপের তাস। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম কোনো মার্কিন সাবমেরিন যুদ্ধের সময় সরাসরি টর্পেডো ব্যবহার করে শত্রু জাহাজ ডুবিয়েছে। শেষবার এমন ঘটনা ঘটেছিল ১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট। সে সময় মার্কিন সাবমেরিন ইউএসএস টর্স্ক জাপানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছিল। এর পরবর্তী দশকগুলোয় মার্কিন সাবমেরিনে টর্পেডো থাকলেও তা মূলত গোয়েন্দা অভিযান ও ক্রুজ় মিসাইল হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
এদিকে, শ্রীলংকার স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যম মন্ত্রী নলিন্ডা জয়তিসসা জানিয়েছেন, তাদের জলসীমার ঠিক বাইরে আরেকটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করছে। এছাড়া বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক পোস্টে স্থানীয় সংসদ সদস্য নমল রাজাপক্ষে জানান, শ্রীলংকার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জ়োনে ঢুকে ইরানের আরেকটি জাহাজ বন্দরে জরুরি নোঙর করার অনুমতি চেয়েছে। তবে শ্রীলংকা সরকার এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।










