এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন তিন মার্কিন বিজ্ঞানী। তারা হলেন জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ দেভোরে এবং জন এম মার্টিনিস। বৈদ্যুতিক সার্কিটে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের টানেলিং ও শক্তির কোয়ান্টাইজেশন প্রমাণ করায় তারা নোবেল পেয়েছেন। সুইডেনের স্টকহোম থেকে গতকাল এ বছরের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে দ্য রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস। সংস্থাটি জানিয়েছে, বৈদ্যুতিক সার্কিটে ‘ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং’ এবং ‘এনার্জি কোয়ান্টাইজেশন’-এর যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তাদের এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

নোবেলজয়ী এ বিজ্ঞানীরা পাবেন একটি মেডেল, একটি সনদ এবং মোট ১১ মিলিয়ন বা ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। যেসব বিভাগে একাধিক নোবেলজয়ী থাকবেন তাদের মধ্যে এই ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা ভাগ হয়ে যাবে। বর্তমান বাজারে এর মান প্রায় ১২ লাখ ডলার, বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একটি সিস্টেমের সর্বাধিক আকার কত হতে পারে, যেখানে এটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রভাব প্রদর্শন করতে পারে। এ বছর নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানীরা এমন একটি ইলেকট্রিক্যাল সার্কিট বা বৈদ্যুতিক বর্তনী নিয়ে পরীক্ষা করেছেন, যা হাতে ধরে রাখা সম্ভব। আর সেই বর্তনীতেই তারা কোয়ান্টাম টানেলিং এবং কোয়ান্টাইজড শক্তি স্তরের মতো কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল প্রভাব প্রদর্শন করে দেখিয়েছেন। এ যুগান্তকারী আবিষ্কার প্রমাণ করে যে কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যগুলো ম্যাক্রোস্কোপিক স্কেলেও বাস্তব করে তোলা যেতে পারে।

সাধারণত যখন প্রচুরসংখ্যক কণা একটি সিস্টেমে জড়ো হয়, তখন কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল প্রভাবগুলো গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু এ বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, অপেক্ষাকৃত বড় সিস্টেমেও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম কার্যকর থাকতে পারে।

এই তিন বিজ্ঞানীর একজন জন ক্লার্ক, ১৯৪২ সালে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৬৮ সালে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন এবং বর্তমানে অধ্যাপনা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আরেকজন মিশেল দেভোরে ১৯৫৩ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিএইচডি করেছেন ১৯৮২ সালে ফ্রান্সের প্যারিস-সুড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

আর জন এম মার্টিনিসের জন্ম ১৯৫৮ সালে। তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৭ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন এবং সেখানেই অধ্যাপক হিসেবে রয়েছেন।

১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ দেভোরে ও জন এম মার্টিনিস সুপারকন্ডাক্টর দিয়ে তৈরি একটি বৈদ্যুতিক সার্কিটে একাধিক পরীক্ষা চালান। সার্কিটে দুটি সুপারকন্ডাক্টরকে পৃথক করেছিল একটি পাতলা অপরিবাহী স্তর, যা ‘জোসেফসন জাংশন’ নামে পরিচিত। এ সার্কিটে প্রবাহিত ইলেকট্রনগুলোর সম্মিলিত আচরণ ছিল এমন, যেন পুরো সিস্টেমটি একটিমাত্র কণার মতো কাজ করছে।

এ সিস্টেম প্রথমে এমন এক অবস্থায় ছিল যেখানে ভোল্টেজ ছাড়াই বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়—এ যেন এক প্রাচীরের পেছনে আটকে থাকা অবস্থা। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা যায়, সিস্টেমটি সেই প্রাচীর পেরিয়ে যায় ‘কোয়ান্টাম টানেলিং’-এর মাধ্যমে এবং ভোল্টেজের উপস্থিতি তার পরিবর্তিত অবস্থার সাক্ষ্য দেয়।

গবেষকরা দেখিয়েছেন, এ সার্কিট কেবল নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি শোষণ বা নির্গত করতে পারে—যা কোয়ান্টাইজড শক্তিস্তরের বৈশিষ্ট্য, ঠিক যেমনটি কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বাণীতে ছিল।

নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ওলে এরিকসন বলেন, ‘এক শতাব্দী পুরনো কোয়ান্টাম মেকানিক্স এখনো আমাদের নতুন নতুন চমক দিচ্ছে। এটি শুধু মুগ্ধকর নয়, অত্যন্ত কার্যকরও। কারণ ডিজিটাল প্রযুক্তির ভিত্তিই হলো কোয়ান্টাম তত্ত্ব। কম্পিউটারের মাইক্রোচিপে ব্যবহৃত ট্রানজিস্টর যেমন বিদ্যমান কোয়ান্টাম প্রযুক্তির উদাহরণ, তেমনি এ গবেষণা ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটার, কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং সেন্সর প্রযুক্তি উন্নয়নের নতুন দিক উন্মোচন করেছে।

এর আগে ২২৬ জন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন। একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে জন বারডিন দুবার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। দুবারই যৌথভাবে এ পুরস্কার পান তিনি।