গতকাল সকালে কাঠমান্ডুতে দেখা গেল ভিন্ন দৃশ্য। কয়েকদিন অস্থিরতা, ধ্বংসযজ্ঞ শেষে চারদিকে প্রাণচাঞ্চল্য। খুলেছে দোকানপাট, বাজার ও শপিং মল। গাড়ি চলছে, রাস্তায় কোনো কোনো স্থানে কিছুটা যানজট দেখা গেছে। মানুষ মন্দিরে পূজায় যাচ্ছে, রাস্তায় সেনাদের উপস্থিতি নেই। দেখে কে বলবে, মাত্র দুদিন আগেও এ নগরী রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভ আর ভাংচুরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল!
সুশীলা কার্কির সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরদিনই যেন ভোজবাজির মতো বদলে গেল সব। এখানে-সেখানে বিভিন্ন পোড়া ভবন আর ধ্বংসস্তূপের চিহ্ন থাকলেও বলা যায় পুরোপুরি আগের পরিস্থিতিতে ফিরে গেছে দেশটি। তুলে নেয়া হয়েছে কারফিউ, সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে আজ থেকে। সেনারা গতকালই ব্যারাকে ফিরে গেছে। আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্ব নিয়ে পুরোদমে মাঠে নেমেছে পুলিশ।
কাঠমান্ডুর প্রধান জেলা কর্মকর্তা প্রেম প্রসাদ লুইটেল জানিয়েছেন, গতকাল সকাল থেকে সেনাবাহিনীকে রাস্তাঘাট থেকে ব্যারাকে ফেরত নেয়া হয়েছে। কারণ নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পরিবেশ অনেকটাই স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠেছে। তার মতে, এখন স্বাভাবিক নিয়মে নেপাল পুলিশই আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম। দায়িত্ব নেয়ার পর পরই অন্তর্বর্তী সরকার ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে।
এমনকি আন্দোলনের সময় বর্তমান ও সাবেক যে মন্ত্রীদের ওপর হামলা হয়েছিল, যাদের বাসভবন ভাংচুরের শিকার হয়েছিল তারাও ঘরে ফিরেছেন। গত কয়েকদিন তারা সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় ছিলেন। সরকারি দপ্তর ও সংসদ ভবন ভাংচুরের ধ্বংসাবশেষ সরাতে শুরু হয়েছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান, যা পুনর্গঠনের বার্তা বহন করছে। আন্দোলনটি শুরু করেছিলেন যে জেনজিরা তাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। তারা পড়াশোনায় ফিরে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন।
কর্মজীবীরা জানাচ্ছেন, তারা আবার কাজকর্ম শুরু করতে প্রস্তুত। নেপাল ক্ষতচিহ্ন এখানো কাটিয়ে ওঠেনি, কিন্তু গতকালের প্রাণচাঞ্চল্যই জানিয়ে দিচ্ছে, স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে।
সুশীলা কার্কি ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার মাত্র একদিনের মাথায় আমূল পরিবর্তন দেখ গেল নেপালে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষয়ক্ষতির দায়ভার নিরূপণ ও তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। নিহতদের পরিবার ও আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এমনকি অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে দেশটি। সহিংস বিক্ষোভে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর একটি পর্যটন ও হোটেল শিল্প। হোটেল অ্যাসোসিয়েশন অব নেপালের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২৫ বিলিয়ন নেপালি রুপির আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। কাঠমান্ডু, পোখারা, ভুটওয়াল, বিরাটনগরসহ বিভিন্ন পর্যটন নগরীর হোটেল ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। বিদেশী পর্যটকের বুকিং বাতিল হয়েছে হাজার হাজার। ফলে পর্যটন খাত বড় ধাক্কা খেয়েছে। এরই মধ্যে এ খাতে কর ছাড়, ব্যাংক ঋণে সহজ শর্ত ও সুদ কমানো, ক্ষতিগ্রস্ত হোটেল মালিকদের জন্য পুনর্গঠন তহবিল গঠনের আলোচনা উঠেছে। পর্যটন নেপালের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হওয়ায় দ্রুত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এ অবস্থায় আবারো পর্যটক ফেরাতে ‘কনফিডেন্স বিল্ডিং’ ক্যাম্পেইন নেয়ার আলোচনা চলছে।
জেনজি আন্দোলনে সরকার পতনের তিনদিনের মাথায় স্পষ্ট হয়েছে যে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই ঘুরে দাঁড়ানোর পথে রয়েছে নেপালে। অর্থনীতির ক্ষতি, বিশেষত পর্যটন খাতে বিরাট আঘাত কাটিয়ে নেপাল শিগগিরই অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা তা সময়ই বলে দেবে। তবে এক্ষেত্রে তাদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে শ্রীলংকা।
প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২২ সালের ১৩ জুলাই ভোরে শ্রীলংকান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। যে আন্দোলন ‘অরাগালায়া’ নামে পরিচিত। বিস্ময়করভাবে এত বড় রাজনৈতিক পালাবদলের পরও শ্রীলংকায় কোনো সহিংসতা, দাঙ্গা বা বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, দ্বীপরাষ্ট্রটিতে ২০২২-২৪ সালের সময় ছিল বিপ্লব-পরবর্তী এক অনন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতার পর্ব; দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উদাহরণের তুলনায় যা ব্যতিক্রম পাঠের দাবিদার।
জনগণের তীব্র ক্ষোভ, জ্বালানির অভাব, খাদ্য সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে কোনো ধরনের সহিংসতা দেখা যায়নি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা সরকারবিরোধী বড় কোনো আন্দোলন হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর পরই বিক্ষোভকারীরা যে যার কাজে ফিরে গেছেন। দেশ পুনর্গঠনের অংশীদার হয়েছেন। এ শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আহরণের পথকে সহজ করেছে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। বৈদেশিক বিনিয়োগের দরজা খুলে যায়।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসেন বামপন্থী দল জনতা বিমুক্তি পেরামুনার (জেভিপি) নেতা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েক। ক্ষমতায় এসেই অনূঢ়া অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেন মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। তাতে তিনি দারুণ সফলও হয়েছেন। শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, আগস্ট ২০২৫-এ কলম্বো কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্সভিত্তিক বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশে। জুলাইয়ে এ হার ছিল ঋণাত্মক, প্রায় মাইনাস শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৪ সালে শ্রীলংকার অর্থনীতি ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা পূর্বাভাসকৃত ৪ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস করে শুধু দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগণের জন্য টার্গেটেড ক্যাশ ট্রান্সফার চালু করা হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘সেন্ট্রাল অ্যান্টি-করাপশন ইউনিট’ গঠন করে রাষ্ট্রীয় খাত থেকে অপচয় কমানো হয়।
ক্ষমতায় এসেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে পুনরালোচনা ও ঋণ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন অনূঢ়া। রাজাপাকসে আমলের মতো ‘সাদা হাতি’ প্রকল্প এড়িয়ে যান। সংখ্যালঘু তামিল ও মুসলিমদের জন্য পৃথক উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ করেন। তামিলপ্রধান জেলাগুলোয় ভাষা, শিক্ষা ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানো হয়। তরুণদের জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষা, স্টার্টআপ ফান্ড ও কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণ চালু করা হয়। শিক্ষাকে উৎপাদনমুখী করতে কারিগরি প্রশিক্ষণ, সফটওয়্যার স্কিল ও ভাষাশিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ায় সরকার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার জন্য একাধিক সংস্কার চালু করা হয়।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের সঙ্গে দেশটির অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে দেউলিয়া ঘোষণা করা শ্রীলংকা মাত্র তিন বছরের মধ্যেই আন্তর্জাতিক আস্থা পুনরুদ্ধার করে নতুন প্রবৃদ্ধির পথে যাত্রা শুরু করেছে।
যদিও এর ব্যতিক্রম চিত্র দেখা গেছে বাংলাদেশে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে দায়িত্ব গেলেও বাংলাদেশ দ্রুত স্বাভাবিকতায় ফিরতে পারেনি। এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এখনো শ্রীলংকার মতো গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অবস্থায় পৌঁছা সম্ভব হয়নি।
অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল যে অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন হয়নি। অর্থনীতির দিক থেকে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে। উৎপাদনশীল খাতে নতুন বিনিয়োগ না আসায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি থমকে গেছে। বেকারত্বের হার বেড়েছে, দারিদ্র্যের হারও ঊর্ধ্বমুখী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছদ্ম বেকারত্ব, যেখানে মানুষ কাজ করছে বটে, কিন্তু তাদের দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না কিংবা প্রাপ্ত আয়ে ন্যূনতম জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা নেই। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীর সংখ্যা গত এক বছরে বেড়েছে বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।
প্রশাসনিক কাঠামোয় ফ্যাসিবাদী আমলের রূপ এখনো বহাল রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল গণতান্ত্রিক সংস্কার, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কিন্তু বাস্তবে পুরনো ধাঁচের কেন্দ্রীয়কৃত ক্ষমতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। এর ফলে নাগরিক আস্থা গড়ে ওঠার পরিবর্তে হতাশা বাড়ছে।
নাগরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মব ভায়োলেন্স ও গণপিটুনির ঘটনা নিয়মিতভাবে ঘটছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয় অথবা বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এতে জনগণের আস্থা আরো কমছে।
অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কমে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক দুর্নীতির কারণে দেশীয় ব্যবসায়ীরা বড় আকারের নতুন প্রকল্পে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও অপেক্ষা করছেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্পষ্ট সংকেতের জন্য। ফলে শিল্প খাতে উৎপাদনশীলতা কমে গেছে। শিক্ষা খাতেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি, এমনকি শিক্ষাঙ্গনে এখনো পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফেরেনি।
শ্রীলংকা ২০২২ সালে দেউলিয়া হয়ে পড়েও অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীলতার মাধ্যমে মাত্র তিন বছরের মাথায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এনে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে হাঁটতে পেরেছে। নেপাল যেখানে ভয়াবহ বিক্ষোভের পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরছে সেখানে বাংলাদেশ গণ-অভ্যুত্থানের এক বছরের বেশি সময় পেরিয়েও সেই প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতার দুয়ারে পৌঁছতে পারেনি।










