আবারো কেঁপে উঠেছে মিয়ানমার। গতকাল বেলা ৩টা ৩৮ মিনিটে মান্দালয়ের অদূরে মাত্তারা টাউনশিপে ৫ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, গত শুক্রবার আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার সেই ভূমিকম্পের আফটার শক ছিল গতকালের কম্পনটি। তারও আগে শনিবার মধ্যরাতের দিকে ওই এলাকায় আরো একটি ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ২।
চার বছর ধরে মিয়ানমারের ক্ষমতা জান্তা সরকারের হাতে। এর মধ্যে দেশটিতে চলছে গৃহযুদ্ধ। জরুরি সেবা ও স্বাস্থ্য পরিষেবারও ভঙ্গুর দশা। এমন পরিস্থিতিতে এত বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় মিয়ানমারবাসীকে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
মিয়ানমারে গত শুক্রবারের ভয়াবহ ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। খোঁজ মেলেনি অন্তত ৩ হাজার ৪০০ জনের। সময় যত যাচ্ছে, তাদের বেঁচে থাকার আশা তত ক্ষীণ হচ্ছে। দেশজুড়ে অসংখ্য বাড়ি, ভবন, ঐতিহ্যবাহী মন্দির-মসজিদ, সেতু ধসে পড়েছে। বিশাল আকারের ফাটল দেখা দিয়েছে বেশ কয়েকটি প্রধান সড়কে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, শুক্রবারের ভূমিকম্পের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ভুলতে পারছে না মিয়ানমারের মান্দালয়ের বাসিন্দারা। আবার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে, আর এমনটা হলে বাকি ভবনগুলো ধসে পড়ে শেষ প্রাণের অস্তিত্বটুকুও মুছে যাবে, এ শঙ্কায় সেখানকার ১৫ লাখ বাসিন্দার অধিকাংশই রাত কাটাচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। তাদের কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানি একেবারে নেই বললেই চলে।
ইউএসজিএস জানিয়েছে, শুক্রবার মিয়ানমারে আঘাত হানা ভূমিকম্প গত শতাব্দীর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী। এর প্রভাবে দেশটির বেশির ভাগ অঞ্চলের বাড়িঘর, অবকাঠামো, মহাসড়ক, সেতু, বিমানবন্দর ও রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গৃহযুদ্ধ চলমান থাকায় দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার এ দেশে উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই আবার বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে জান্তা সরকার।
মিয়ানমারের ভয়াবহ পরিস্থিতির বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আঞ্চলিক পরিচালক আলেকজান্ডার ম্যাথিউ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘এটি কেবল বিপর্যয় নয়; এটি জটিল মানবিক সংকট। এ বিপর্যয়ের মাত্রা ব্যাপক এবং জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা প্রয়োজন। দারিদ্র্যকবলিত দেশটি প্রাকৃতিক এ দুর্যোগ মোকাবেলায় রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।’ এমন পরিস্থিতিতে দেশটির সামরিক জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তার অনুরোধ করেছেন।
জানা গেছে, ভূমিকম্পে মান্দালয়ের সমতল ভূমি থেকে পূর্বের শান পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার কিছু অংশ সম্পূর্ণরূপে জান্তার নিয়ন্ত্রণে নেই। সেখানকার স্থানীয় এক বাসিন্দা রয়টার্সকে জানান, অনেক মানুষ আটকা পড়ে আছে, কিন্তু কোনো সাহায্য আসছে না। এখানে পর্যাপ্ত লোকবল, যন্ত্রপাতি বা যানবাহন নেই। উদ্ধারকারীরা ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে খালি হাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন বলছে, মিয়ানমারের অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনায় প্রাথমিকভাবে স্থানীয়রাই উদ্ধারকাজ শুরু করেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন নিখোঁজদের স্বজনরা। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকাজে যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন বিদেশী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মীরা।
হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো
এদিকে ভূমিকম্পে বিপুলসংখ্যক আহতের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট তীব্র হচ্ছে। আহতদের হাসপাতালের বাইরেই রাস্তার পাশে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। অনেককে স্ট্রেচারে শুইয়ে স্যালাইন দেয়া হচ্ছে, আর স্বজনরা পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। এসবই এখন হাসপাতালগুলোর চারপাশের নিয়মিত চিত্র।
রাজধানী নেপিদোর এক হাজার শয্যার হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আহতরা ব্যথায় চিৎকার করছে। অনেকে আবার নিথর পড়ে আছে। স্বজনরা তাদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছেন, কারো কারো হাতে ইনট্রাভেনাস ড্রিপ লাগানো। অনেকের হাত বা পায়ের কিছু অংশ নেই, মাথাসহ সারা শরীরে ব্যান্ডেজ।
সেখানকার এক চিকিৎসক রয়টার্সকে বলেন, ‘আগে এমন দৃশ্য দেখিনি। আমরা পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছি, তবে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’
বিদেশী সাহায্য ঢুকছে
মান্দালয়ের বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত এবং নেপিদো বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার ধ্বংস হওয়ায় শহরগুলোয় সব বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে। তবে দেশটিতে ধীরে ধীরে পৌঁছাতে শুরু করেছে বিদেশী সহায়তা।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার রাতে দুটি ভারতীয় সামরিক পরিবহন বিমান নেপিদোয় অবতরণ করতে সক্ষম হয়। বিমান দুটি মোবাইল হাসপাতাল ইউনিট এবং প্রায় ১২০ কর্মী নিয়ে গেছে। দলটি পরে উত্তর মান্দালয়ে ৬০ বেডের জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেছে। অন্য ভারতীয় সহায়তা ইয়াঙ্গুনে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া গতকাল চীনা পণ্যবাহী ট্রাকের একটি কনভয় সেখানে পৌঁছার কথা ছিল। তবে ভঙ্গুর সড়ক ব্যবস্থার কারণে ৬৫০ কিলোমিটার পথ যেতে তাদের ১৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে।
একই দিন বাংলাদেশ থেকে সেনা ও বিমান বাহিনীর দুটি পরিবহন বিমান জরুরি ওষুধ, তাঁবু, শুকনো খাবার ও চিকিৎসাসামগ্রী নিয়ে গেছে। অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তাও দেশটিতে পৌঁছাতে শুরু করেছে।










