দক্ষিণ কোরিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হান ডাক-সুকে শুক্রবার পার্লামেন্টে অভিশংসিত করা হয়েছে। দায়িত্ব নেয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় তাকে অভিশংসিত করা হলো। ১৪ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে পরপর দুটি অভিশংসনের ঘটনায় দেশটিতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সাংবিধানিক আদালতে ইউন সুক-ইওল ও হান ডাক-সুর অভিশংসনের মামলা বর্তমানে চলতে থাকবে। এ অবস্থায় ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন দেশটির অর্থমন্ত্রী চোই সাং-মোক। তিনি দেশকে স্থিতিশীল করতে সম্ভাব্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

৩ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় রাত ১১টার দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো অপ্রত্যাশিতভাবে সামরিক আইন জারি করেন। নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় তিনি ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি’ ও উত্তর কোরিয়ার হুমকির কথা উল্লেখ করেন। তবে দ্রুতই স্পষ্ট হতে শুরু করে যে সিদ্ধান্তটি বাইরের হুমকির কারণে নয়, বরং তার নিজের গুরুতর রাজনৈতিক সমস্যার কারণে নেয়া হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পরই আইনটি প্রত্যাখ্যান করা হয়। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে বেশ কয়েকটি ঘটনার সূত্রপাত হয়, যা দক্ষিণ কোরিয়াকে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার দিকে পরিচালিত করে।

বিরোধীদলীয় নেতা পার্লামেন্টে আইনটি প্রত্যাখ্যানের জন্য বিক্ষোভ ও ভোটাভুটির ডাক দেন। কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ পার্লামেন্টের বাইরে জড়ো হয়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন এবং আইনপ্রণেতারা ভোট কক্ষে পৌঁছার জন্য ব্যারিকেড টপকাতে বাধ্য হন।

পরদিন বুধবার পার্লামেন্টে ভোটের মাধ্যমে সামরিক আইন ঘোষণার প্রত্যাখ্যান করা হয়। ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক আইন জারি করা হয়। সামরিক আইন প্রত্যাহার করে নেয়ার পর ইউন তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের অভিশংসন ও সরকারের বাজেট হ্রাস করার বিরোধীদের পদক্ষেপসহ ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়াতেই মূলত ইউন মরিয়া হয়ে সামরিক আইনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন।

প্রেসিডেন্ট ইউনের পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া দ্রুতই দেখানো হয়। হাজার হাজার বিক্ষোভকারী তার অভিশংসনের দাবি জানিয়েছে এবং জরিপে দেখা গেছে যে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন-চতুর্থাংশ নাগরিক তার পদত্যাগ করতে চেয়েছিল। বিরোধী দলীয় আইনপ্রণেতারা পার্লামেন্টে একটি অভিশংসন প্রস্তাব দাখিল করেন। যাতে প্রয়োজনীয় ২০০ ভোটে পৌঁছতে ইউনের ক্ষমতাসীন দলের আটটি ভোটের প্রয়োজন ছিল। তবে ইউনের দল ভোটাভুটি বয়কট করে। বিরোধীরা তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে এবং ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে তারা সফল হন। সেদিন ইউন অভিসংশিত হন। প্রধানমন্ত্রী হান ডাক-সুকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট করা হয়। কিন্তু পরে তাকেও অভিশংসিত করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়া গণতান্ত্রিক হওয়ার পর থেকে প্রথমবারের মতো কোনো ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হলেন।

বর্তমান মূল ইস্যু প্রেসিডেন্ট ইউনের অভিশংসন। দক্ষিণ কোরিয়ার সাংবিধানিক আদালতের নয়জন বিচারকের মধ্যে ছয়জনকে তার অপসারণের বিষয়ে একমত হতে হবে। বর্তমানে মাত্র ছয়জন বিচারক রয়েছেন। তাই কেবল একটি প্রত্যাখ্যানই ইউনকে বাঁচাতে পারে। বিরোধীরা তাদের সম্ভাবনা উন্নত করার জন্য আরো তিনজন বিচারক চেয়েছিল। হান এ নিয়োগ আটকে দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় হান অভিশংসন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব করছেন দাবি করে বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব দাখিল করে। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের জন্য প্রয়োজন মাত্র ১৫১টি ভোট। গত শুক্রবার ১৯২ জন আইনপ্রণেতা হানকে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেন। তাকেও অভিশংসিত করা হয় দায়িত্ব নেয়ার দুই সপ্তাহের মাথায়। এ অবস্থায় দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই অনিশ্চিত। বিবিসি অবলম্বনে