ভয়াবহ ভূমিকম্পে ধসে পড়েছে মিয়ানমারের অগণিত আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, সেতু, ধর্মীয় উপাসনালয়সহ নানা স্থাপনা। বিশেষ করে হাসপাতাল ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভেঙে পড়েছে চিকিৎসা ব্যবস্থা, সময়মতো পৌঁছতে পারছে না প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে আহতদের চিকিৎসা যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি হাসপাতালগুলো থেকে অব্যাহত সেবা দেয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গতকাল দেশটির জান্তা সরকার জানিয়েছে, ভূমিকম্পে প্রাণহানি এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৫৬ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ৩ হাজার ৯০০ মানুষ। প্রায় ৩০০ মানুষের খোঁজ মেলেনি এখনো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, দেশটিতে তিনটি হাসপাতাল পুরোপুরি ধ্বংস এবং ২২টি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশালসংখ্যক আহতদের নিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে দেশটির মধ্য ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হাসপাতালগুলো।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, প্রথম থেকেই চিকিৎসা সরঞ্জাম সংকটে ভুগছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। নেই পর্যাপ্ত বেড, রক্ত, ওষুধ কিংবা চিকিৎসাসামগ্রী।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, ভয়াবহ ভূমিকম্পে অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট ও হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির চিকিৎসা ও ত্রাণ কার্যক্রম চালু রাখতেও বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এরই মধ্যে ১৭টি চিকিৎসা সরঞ্জাম বোঝাই ট্রাক দেশটিতে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। আর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়াদের উদ্ধারে ১২টিরও বেশি বিদেশী উদ্ধারকারী দল কাজ করছে।
এদিকে শুক্রবারের এ ভূমিকম্পের আঘাতের পর পার হচ্ছে ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময়। সাধারণত মানুষ খাদ্য ও পানি ছাড়া আটকে রয়েছে, এমন দুর্যোগের ক্ষেত্রে প্রথম ৩৬ ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন রেসকিউ উইন্ডো’ ধরা হয়। আটকা পড়াদের এ সময়ের মধ্যে উদ্ধার করা না গেলে খাদ্য ও পানির অভাবে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তার ওপর মিয়ানমারের এখনকার আবহাওয়াও বেশ গরম। এর ফলে এরই মধ্যে পচতে শুরু করেছে আটকে পড়া মরদেহগুলো।
উদ্ধারকারী দলের সদস্যরাও এ তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছেন। এক উদ্ধারকর্মী জানান, দুর্যোগে মরদেহ বহনের জন্য পর্যাপ্ত ব্যাগও নেই। আমরা প্রথম উদ্ধার অভিযানেই মরদেহ পেয়েছি। আরো অনেক পাওয়ার আশঙ্কা করছি। যে মরদেহ উদ্ধার করেছি, তা এরই মধ্যেই পচে গেছে। এটি হৃদয়বিদারক। তবে যতজনকে সম্ভব বাঁচানোর চেষ্টা করব।
রয়টার্স বলছে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছে মান্দালয় শহরে ভারী যন্ত্রপাতি না থাকায় উদ্ধারকারীরা খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে জীবিতদের বের করার চেষ্টা করছেন। ভূমিকম্পে রাস্তা ও সেতুধসের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়েছে। বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন, মোবাইল নেটওয়ার্কও সীমিত রয়েছে। প্রচণ্ড গরমে মরদেহ দ্রুত পচে যাচ্ছে।
আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিনে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে। তখন উদ্ধারকর্মীদের কাজ আরো কঠিন হয়ে উঠবে।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, মৃত্যু ও আহতের পরিমাণ এখনো পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ধ্বংসযজ্ঞে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েছে। বাকি হাসপাতালগুলোও আহতদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। বর্তমানে অস্ত্রোপচার, রক্ত সঞ্চালন সরবরাহ, চেতনানাশক, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জরুরি প্রয়োজন। দুর্যোগ মোকাবেলায় এরই মধ্যে ৮ মিলিয়ন ডলার সাহায্যের জন্য জরুরি আবেদন জানিয়েছে ডব্লিউএইচও।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর আজ সোমবার থেকে মিয়ানমারে এক সপ্তাহব্যাপী শোক ঘোষণা করা হয়েছে। প্যারিসভিত্তিক একটি বার্তা সংস্থার বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, ৬ এপ্রিল পর্যন্ত ঘোষিত এ শোকের মধ্যে মিয়ানমারে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে।
২০২১ সালে জান্তা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জর্জরিত দেশটি এক শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পের আঘাতে অনেকটা বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের কারণে গৃহহীন অনেক মানুষের কাছে উদ্ধার কিংবা ত্রাণ পৌঁছানোর প্রচেষ্টা আরো জটিল হয়ে উঠেছে।
একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন সামরিক বাহিনী এখনো বিভিন্ন গ্রামে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ত্রাণ প্রচেষ্টায় সহায়তা করার জন্য অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।










