এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তার দেশ ইরানের প্রতি সীমাহীন ধৈর্য দেখাবে না। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত আরো কয়েক হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েনের কথা ভাবছেন বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সূত্রগুলোর দাবি, ইরানের ওপর পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক কয়েকটি বিকল্প তৈরি করতে মধ্যপ্রাচ্যে সেনা মোতায়েন বৃদ্ধির কথা ভাবছেন ট্রাম্প। খবর রয়টার্স, এপি, আলজাজিরা ও আরব নিউজ।
ইরানের দক্ষিণ পারস গ্যাস ক্ষেত্রে বুধবারের ইসরায়েলি হামলার পর গতকাল উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা জোরদার করে ইরান। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির রাজধানী রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলে গতকাল ছয়টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। পরে লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু শহরের স্যামরেফ পরিশোধনাগারে ইরানের হামলার কথা স্বীকার করে বক্তব্য দিয়েছে দেশটি। বর্তমানে এ হামলাসৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন চলছে বলে আরো জানিয়েছে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর বিকল্প রুট হিসেবে লোহিত সাগরকে ব্যবহারের জন্য পরিশোধনাগারটিকে কাজে লাগানোর কথা ভাবছিল সৌদি আরব।
ক্রমবর্ধমান এসব হামলার মুখে সৌদি আরব সীমাহীন ধৈর্য দেখাবে না বলে ইরানের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান। রিয়াদে গতকাল মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি মুসলিম দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক জরুরি বৈঠক শেষে তেহরানের উদ্দেশে এ হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তার এ হুঁশিয়ারিকে ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিতবাহী হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, ‘সৌদি আরব ও তার অংশীদারদের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে এবং আমরা এখন পর্যন্ত যে ধৈর্য দেখিয়েছি, তা সীমাহীন নয়। একদিন, দুইদিন বা এক সপ্তাহ—কতদিন এ ধৈর্য ধরে রাখা যাবে, আমি নির্দিষ্ট করে বলব না।’
তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন মনে করলে সৌদি আরব সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে। ইরানের পক্ষ থেকে ক্রমাগত উত্তেজনা বাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক ও নৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে। ২০২৩ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর তেহরানের সঙ্গে যেটুকু আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। আরো হামলা হলে এ সম্পর্ক রক্ষার মতো প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান, আজারবাইজান ও লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এ বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠক শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর হামলা চালানো বন্ধে ইরানের প্রতি আহ্বান জানান তারা। এতে বলা হয়, পরস্পরের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার ওপরই নির্ভর করছে ইরানের সঙ্গে দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ।
জ্বালানি তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর, আবাসিক এলাকা ও কূটনৈতিক স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নিন্দা জ্ঞাপন করে এতে আরো বলা হয়, কোনোভাবেই এসব কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেয়া যায় না।
আক্রান্ত দেশগুলোর আত্মরক্ষার অধিকারের কথা উল্লেখ করে বিবৃতিতে ইরানকে আন্তর্জাতিক আইন পরিপালন ও উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানানো হয়।
সৌদি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, উত্তেজনা শুরুর পর থেকে অন্তত ৪৫৭টি ড্রোন, ৪০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাতটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা প্রতিহত করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী।
বিশ্ববাজারে অন্যতম শীর্ষ গ্যাস সরবরাহকারী দেশ কাতার জানিয়েছে, রাস লাফানে অবস্থিত দেশটির বৃহত্তম এলএনজি স্থাপনায় গতকাল এক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যা দমকল বাহিনী নিয়ন্ত্রণে আনে। এর আগে ঘটে যাওয়া এক হামলার পর থেকে সেখানে উৎপাদন বন্ধ ছিল। রাষ্ট্রীয় কোম্পানি কাতার এনার্জি জানিয়েছে এবারের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রাস লাফান বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রফতানি কেন্দ্র। এ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও এখান থেকে এলএনজির সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে।
এ হামলার পর গতকাল জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৮ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়। ইরানে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশের বেশি।
কুয়েতের মিনা আল-আহমাদি পরিশোধনাগারে গতকাল এক ড্রোন হামলার পর আগুন ধরে যায়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কুনা জানিয়েছে। এ হামলার কিছুক্ষণ পর কাছাকাছি অবস্থিত মিনা আবদুল্লাহ পরিশোধনাগারেও আগুন ধরে যায়।
ইরানি হামলার মুখে হাবশান গ্যাস স্থাপনা ও বাব তেল ক্ষেত্রে কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে হয়েছে বলে জানিয়েছে আবুধাবি কর্তৃপক্ষ।
কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে। আর আরব লীগের মহাসচিব আহমেদ আবুল গেইত জ্বালানি স্থাপনাগুলোয় হামলার ফলে উত্তেজনা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
ইসরায়েলে গতকাল কয়েক দফায় হামলা চালিয়েছে ইরান। এ সময় সেখানকার বাসিন্দারা ইসরায়েলজুড়ে বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নেয়। এসব হামলায় বেশকিছু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বড় ধরনের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
এর আগে বুধবার ইরানের সাউথ পারস গ্যাস ক্ষেত্রে হামলা চালায় ইসরায়েল। এটি বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্র। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাস ক্ষেত্রটিতে হামলা ইরানের বিদ্যুৎ সরবরাহকে সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
এ হামলার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সতর্ক করে বলেছেন, এর পরিণতি হতে পারে নিয়ন্ত্রণহীন, যা গোটা বিশ্বকে গ্রাস করে নিতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইসরায়েল আর সাউথ পারসে হামলা করবে না। তবে তিনি হুমকি দিয়ে বলেছেন, কাতারের জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরান হামলা চালাতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা আঘাত হানবে এবং পুরো ক্ষেত্রটিকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমি এমন সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ অনুমোদন করতে চাই না, কারণ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ইরানের ভবিষ্যতের ওপর পড়বে।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন শক্তি বাড়াতে কয়েক হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক অভিযান আরো বিস্তৃত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে বাড়তি বিকল্প তৈরি করতে বিষয়টি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন যেসব বিকল্প বিবেচনা করছে, তার মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। এটি নিশ্চিত হবে মূলত মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনীর মাধ্যমে। তবে প্রণালিটি সুরক্ষিত করতে গেলে ইরানের উপকূলে মার্কিন সেনা মোতায়েনের প্রয়োজনও হতে পারে বলে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, যার মধ্যে দুজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়েছেন।
এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের খারগ দ্বীপে স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও বিবেচনা করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানান, ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি তেল রফতানি এ দ্বীপটিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্য হলো এমন অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে। কারণ ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে সহজেই এ দ্বীপে হামলা চালাতে সক্ষম।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিশেষজ্ঞদের দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের মার্কিন স্থলবাহিনী ব্যবহার—এমনকি সীমিত মাত্রায় হলেও ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ, ইরান যুদ্ধের প্রতি মার্কিন জনগণের সমর্থন কম এবং ট্রাম্প নিজেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ থেকে দূরে রাখার কথা বলেছিলেন।
এ বিষয়ে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে হোয়াইট হাউজের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এ মুহূর্তে স্থলবাহিনী পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব বিকল্পই খোলা রেখেছেন।’
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ৭ হাজার ৮০০টিরও বেশি হামলা চালিয়েছে এবং এ পর্যন্ত ১২০টির বেশি ইরানি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, তার লক্ষ্য শুধু ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা নয়; এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখাও অন্তর্ভুক্ত।










