যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে বিপর্যয় নেমে এসেছে মিয়ানমারে। দেশটিতে অন্তত ১৪৪ জন নিহত হয়েছে বলে জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং জানিয়েছেন। দেশটিতে সহস্রাধিক প্রাণহানির আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মিয়ানমারের প্রতিবেশী থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককেও। দুই দেশেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

ইউএসজিএসের তথ্যমতে, মিয়ানমারের স্থানীয় সময় গতকাল দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় শহর মান্দালয়। প্রায় ১১ মিনিট পর ৬ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প-পরবর্তী কম্পন (আফটার শক) অনুভূত হয়। কম্পন অনুভূত হয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও ভিয়েতনামেও। ঢাকা থেকে উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ৫৯৭ কিলোমিটার।

রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার অত্যন্ত শক্তিশালী এ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল মাটির প্রায় ছয় মাইল গভীরে। কম গভীরতা হওয়ায় কম্পন ভয়াবহভাবে অনুভূত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূমিকম্পের আঘাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারের রাস্তায় ফাটল দেখা দিয়েছে, ভেঙে গেছে বহু সেতু্। বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। দেশটির অন্তত ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি করেছে জান্তা সরকার।

ইউএসজিএস আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, মান্দালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিমের সাগাইং ও এর আশপাশেরে এলাকার ৩৫ শতাংশ স্থাপনা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া নিহতের সংখ্যা পৌঁছতে পারে ১ থেকে ১০ হাজারে। সংস্থাটির প্রাক্কলনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে, যা মিয়ানমারের জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে থাইল্যান্ডেও। সেখানে রাজধানী ব্যাংককে ৩৩ তলা একটি নির্মাণাধীন ভবন ধসে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে অন্তত নয়জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। নিখোঁজ শতাধিক। ব্যাংককে জরুরি অবস্থা জারি করা হলেও রাস্তা-সেতু ভেঙে পড়ায় ব্যাহত হচ্ছে উদ্ধার কার্যক্রম।

মিয়ানমারের যুদ্ধকবলিত গ্রামগুলো থেকে শুরু করে ব্যাংককের উঁচু আকাশচুম্বী ভবন পর্যন্ত কম্পন অনুভূত হয়। মিয়ানমারে বহু ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ধসে পড়েছে, ভেড়ে পড়েছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মান্দালয়, নেপিদো ও পিনমানা এলাকায় কয়েকশ ভবন সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে।

এক টেলিভিশন ভাষণে গতকাল সন্ধ্যায় মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং নিশ্চিত করেছেন যে শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৪৪ জন নিহত ও ৭৩০ জন আহত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নিহত ও আহতের সংখ্যা বাড়তে পারে। উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রয়েছে, আক্রান্ত এলাকাগুলো থেকে নিয়মিতভাবে আরো হতাহতের তথ্য আসছে।’

বিবিসি বার্মিজ সার্ভিসকে মান্দালয় অঞ্চলে কর্মরত উদ্ধারকারী দলের একজন সদস্য বলেছেন, ‘ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি।’

তিনি বলেন, ‘মৃতের সংখ্যাও অনেক বেশি, আমরা এখন শুধু এটুকুই বলতে পারি। কারণ উদ্ধার অভিযান চলছে। হতাহতদের সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায়নি। তবে এটি অন্তত কয়েকশ।’

মান্দালয়ের একজন বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেন, ‘সবকিছু কাঁপছিল, তখন আমরা সবাই বাইরে বের হয়ে আসি। আমি চোখের সামনে একটি পাঁচতলা ভবন ধসে পড়তে দেখেছি। আমার শহরের সবাই বেরিয়ে রাস্তায় এসেছে। কেউ ভবনের ভেতরে ঢুকতে সাহস পাচ্ছে না।’ মান্দালয় জেনারেল হাসপাতালের ডা. কিয়াও জিন বলেন, ‘এখানে অন্তত ২০ জন মারা গেছে। আহত হয়েছে ২০০ জন।’

ইয়াঙ্গুন-মান্দালয় এক্সপ্রেসওয়ের একটি রেলসেতু ও একটি সেতু ধসে পড়েছে বলে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এছাড়া ভূমিকম্পে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোর সড়কে ফাটল ধরেছে। দেশটির সামরিক সরকার অন্তত ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।

মিয়ানমারের সামরিক সরকারের মুখপাত্র মেজর জেনারেল জাও মিন তুন জানিয়েছেন ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মান্দালয়, সাগাইং ও নেপিদো। এসব অঞ্চলের হাসপাতালগুলোয় রক্তের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আহতদের চিকিৎসায় জরুরিভাবে রক্তদাতাদের হাসপাতালে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

রেড ক্রসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এটা নিশ্চিত যে ভূমিকম্পটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে। তবে প্রকৃত চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরো তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।’

এদিকে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ভূমিকম্পের কারণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক উঁচু ভবন কেঁপে ওঠে। বহুতল ভবনের ছাদ থেকে সুইমিং পুলের পানি ছিটকে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে স্থানীয় বাসিন্দাদের আতঙ্কিত হয়ে রাস্তায় ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। ব্যাংককের চাতুচাক জেলায় ৩৩ তলা নির্মাণাধীন ভবন ধসের ঘটনায় অন্তত ৯০ শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

থাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই জানিয়েছেন, একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ে অন্তত আটজন নিহত হয়েছে। কমপক্ষে ৯০ জন এখনো নিখোঁজ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের আঘাতে বহুতল ভবনটি হঠাৎ করেই ধসে পড়ে। ফলে ওপরের অংশে থাকা একটি ভারী ক্রেন নিচে পড়ে যায়, যা পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তোলে। ধ্বংসস্তূপ থেকে ধুলোর বিশাল মেঘ উঠতে দেখা যায়।

উদ্ধারকারীরা জীবিতদের সন্ধান চালিয়ে যাওয়ার কারণে ঘটনাস্থলে একটি অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করেছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যাংককে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। ভূমিকম্পের কারণে থাইল্যান্ডের স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে থাই এনকোয়ারার। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পায়েতংতার্ন সিনাওয়াত্রা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমি সবাইকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি। দয়া করে আতঙ্কিত হবেন না, তবে সতর্ক থাকুন। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছি।’