শেষ পর্যন্ত গাজাবাসীর কাছে পৌঁছতে পারল না আশার বহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’। মানবিক সহায়তায় পরিপূর্ণ নৌযানের বহরটি ভূমধ্যসাগরের ঢেউ পেরিয়ে যখন অবরুদ্ধ উপকূলের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে সেটিকে ঘিরে ফেলে ইসরায়েলি নৌবাহিনী। হেফাজতে নেয়া হয় গ্রেটা থুনবার্গসহ কয়েকশ আরোহীকে। অবরুদ্ধ গাজার মানুষের কাছে ওষুধ, খাদ্য ও সহানুভূতি পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে গাজার দিকে অগ্রসর হওয়া এ বহর বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজগুলো আটক করায় ইউরোপ থেকে শুরু করে বিশ্বের নানা প্রান্তে নিন্দার ঝড় উঠেছে। রাস্তায় নেমেছে হাজারো মানুষ, চলছে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ। জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস থেকে শুরু করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ অসংখ্য মানবাধিকার সংগঠনও এ ঘটনাকে বেআইনি, অগ্রহণযোগ্য ও মানবিক নীতির পরিপন্থী বলে তীব্র সমালোচনা করেছে। খবর রয়টার্স ও আল জাজিরা।
বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্য, মানবাধিকার কর্মী, চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে বহন করা ৪৪ নৌযানের বহরের একটি জাহাজ বাদে বাকিগুলোকে আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে আটক করে ইসরায়েল। কয়েকটি নৌযান এরই মধ্যে ইসরায়েলের আশদোদ বন্দরে নেয়া হয়েছে। বাকিগুলো সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে জাহাজের আরোহীদের ইউরোপে ফেরত পাঠানো হবে। মেরিন ট্রাফিকের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, আশদোদ বন্দরে থাকা তিন নৌযানের একটি কেপটেন নিকোস। গ্রিসের এ নৌযানের পাশাপাশি সেখানে রয়েছে স্পেনের এস্ট্রেলা ওয়াই মেন্যুয়েল ও আদারা নৌযান দুটিও। তাদের ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলের ওই বন্দরে নিয়ে গেছে দেশটির নৌবাহিনী।
সুমুদ ফ্লোটিলার কেপটেন নিকোস নৌযানে থাকা ইউরোপিয়ান আইনপ্রণেতা রিমা হাসান তাদের ওপর ইসরায়েলের শক্তি প্রদর্শনের একটি ভিডিও ধারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক জলসীমায় ফ্লোটিলায় থাকা অ্যাক্টিভিস্টদের বেআইনিভাবে আটক করেছে ইসরায়েলের সৈন্যরা’। ফ্লোটিলা ট্র্যাকারের তথ্য অনুযায়ী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় মোট নৌযান ছিল ৪৪টি। এতে প্রায় ৪৪টি দেশের ৫০০ মানুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়ামের নাগরিকসহ ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচিত প্রতিনিধি, আইনজীবী, অধিকারকর্মী, চিকিৎসক ও সাংবাদিকও রয়েছেন। বহরের একটি নৌযানে রয়েছেন বাংলাদেশের মানবাধিকারকর্মী ও আলোকচিত্রী শহীদুল আলমও। গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার দিকে ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় নিজের শারীরিক অবস্থা কিছুটা খারাপ হওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি বাদে বাকি জাহাজগুলো আটক করা হয়েছে। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার কোনো নৌযানই সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করতে বা বৈধ নৌ অবরোধ ভাঙতে সফল হয়নি। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যে, সব যাত্রী নিরাপদে আছেন এবং সুস্থ আছেন। তারা নিরাপদেই ইসরায়েলের দিকে আসছেন, সেখান থেকে তাদের ইউরোপে ফেরত পাঠানো হবে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, একটি জাহাজ এখনো সমুদ্রে রয়েছে। যদি সেটি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশের চেষ্টা করে বা অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করে, সেই প্রচেষ্টাও প্রতিহত করা হবে।

শহীদুল আলম
ভূমধ্যসাগরে গত বুধবার রাত থেকেই ফ্লোটিলার জাহাজগুলোকে বাধা দিতে শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। সে সময় ত্রাণবাহী অন্তত আটটি জাহাজ থামিয়ে দেয়া হয়। পরে ধীরে ধীরে ফ্লোটিলার বাকি জাহাজগুলোকেও বাধা দেয় তারা। নৌযানগুলোতে থাকা অধিকারকর্মীদের হেফাজতে নেয়া হয়, যাদের মধ্যে সুইডিশ অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও রয়েছেন। পরে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, হামাস-সুমুদ ফ্লোটিলার কয়েকটি নৌযান নিরাপদে থামিয়ে দেয়া হয়েছে। গ্রেটা ও তার বন্ধুরা নিরাপদ ও সুস্থ আছেন। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, কিছু ফ্লোটিলা আয়োজকের সঙ্গে হামাসের যোগসূত্র রয়েছে। যদিও এ দাবির পক্ষে তারা কোনো প্রমাণ দেয়নি এবং কর্মীরা তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা আটকানোর ঘটনায় বিশ্বের বহু দেশে তীব্র বিক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। ইউরোপজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকা, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও মানুষ রাস্তায় নেমেছে। ইতালির রোম, মিলান ও জেনোয়ায় হাজারো মানুষ রেললাইন অবরোধ ও মিছিল করেছে। স্পেনের বার্সেলোনা ও মাদ্রিদে ইসরায়েলের অবরোধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন ও সাধারণ নাগরিকরা। জার্মানির বার্লিন ও বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতির সমালোচনা করে বিক্ষোভ হয়। তুরস্কের ইস্তানবুলে ইসরায়েলবিরোধী সমাবেশে শত শত মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে স্লোগান তোলে। আয়ারল্যান্ড ও গ্রিসেও বিক্ষোভকারীরা ইসরায়েলের নৌ অবরোধ অবৈধ বলে দাবি করে। ইউরোপ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের তিউনিসিয়া ও লিবিয়ার রাজধানীতে ফ্লোটিলার সমর্থনে বিক্ষোভ হয়েছে। এসব বিক্ষোভে অংশ নেয়া মানুষের দাবি—গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ খুলে দিতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আরোপিত নৌ অবরোধ অবিলম্বে তুলে নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে ইসরায়েলের গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার জাহাজ আটকের ঘটনাকে বেআইনি বলে অভিহিত করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস। সংস্থাটির মুখপাত্র থামিন আল-খেতান বলেছে, ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজার জনগণের জন্য খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে অথবা বাধা ছাড়া মানবিক ত্রাণ প্রকল্পে সম্মত হতে হবে। তিনি আরো বলেন, সুমুদ ফ্লোটিলার যেসব অধিকারকর্মীকে ইসরায়েল আটক করেছে, তাদের প্রতি যেন সম্মান দেখানো হয়।
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো ইসরায়েলের ফ্লোটিলার নৌযান আটকের ঘটনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। সেই সঙ্গে জানিয়েছেন, তিনি ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছেন। প্রেভো বলেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় যেভাবে নৌযানগুলোয় অভিযান চালানো হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য। এজন্যই আমি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছি।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার নৌযান আটকের ঘটনাকে বেআইনি ও ইসরায়েলের নির্লজ্জ হামলা বলে উল্লেখ করেছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির মতে, ফ্লোটিলা কর্মীদের আটক করা ইসরায়েলের একটি বেআইনি পদক্ষেপ, যা গাজায় সংহতির কর্মসূচিকে শাস্তি দেয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
এক বিবৃতিতে অ্যামনেস্টির সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার নৌযান জোরপূর্বক থামিয়ে কর্মীদের আটক করা গাজার উপকূলে একটি নির্লজ্জ হামলা। সেখানে থাকা মানবাধিকার কর্মীরা একান্তই শান্তিপূর্ণ ও মানবিক একটি মিশনে ছিল।
তিনি আরো বলেন, এ ঘটনা ঘটেছে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে সপ্তাহব্যাপী হুমকি, উসকানি এবং একাধিক নৌকায় নাশকতার চেষ্টার পর। পাশাপাশি গাজায় অব্যাহত গণহত্যা ও ইসরায়েলের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের মধ্যে অত্যাবশ্যক সাহায্য ঠেকিয়ে দেয়ার এমন পদক্ষেপ আবারো প্রমাণ করল, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বাধ্যতামূলক আদেশ এবং নিজের আইনি দায়িত্বের প্রতি তাদের কোনো শ্রদ্ধা নেই।
এদিকে গতকালও ইসরায়েলের হামলায় গাজায় অন্তত ৫৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দক্ষিণ গাজায় ২৯ জন, মধ্য গাজায় ১৪ জন এবং গাজা সিটিতে ১০ জন নিহত হয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।










