দুই বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর গাজা যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় তৈরি ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশে ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই ইতিবাচক সম্মতি দিয়েছে। ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, ‘এটি শুধু গাজা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত শান্তির পথ তৈরি করবে।’ তবে এ শান্তির সম্ভাবনার মধ্যেও ইসরায়েলি বিমান হামলা বন্ধ হয়নি। গতকাল ইসরায়েলি ট্যাংক ও বিমান হামলায় অন্তত ১৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গতকাল জানিয়েছেন, ‘যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।’ ইসরায়েল ও হামাস দুই পক্ষই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার কিছু অংশে সম্মত হলেও গাজাবাসীর দুর্ভোগের অবসান টানতে পরিকল্পনাটি দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। এনবিসি নিউজের মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে রুবিও বলেন, ‘বন্দি মুক্তির জন্য চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছার সময়সীমা এখনো অনিশ্চিত, তবে আলোচনা “‍সপ্তাহ বা বহুদিন” ধরে চলতে পারে না। এদিকে ইসরায়েল সরকারের এক মুখপাত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ইসরায়েল সম্মত হলেও এখনো যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়নি। সব মিলিয়ে গাজায় শান্তি ফিরছে কিনা তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। জানা গেছে, ইসরায়েল ও হামাসের প্রতিনিধিরা পরোক্ষ আলোচনার জন্য গতকাল মিসরে গেছেন। আলোচনা আজ শুরু হওয়ার কথা। সেখান থেকেই ইঙ্গিত মিলবে গাজা যুদ্ধের অবসান হতে যাচ্ছে কিনা। খবর রয়টার্স ও আল জাজিরা।

ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে রয়টার্স বলছে, যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি স্পষ্ট নয়। হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহারসহ অনেক বিষয় এখনো অনির্ধারিত। এর আগেও বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েছিল, যখন ইসরায়েল আবারো আক্রমণ শুরু করে। ট্রাম্পের আহ্বান ও হামাসের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার পর শনিবারও ৭০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। গতকাল নিহত হয়েছে ১৯ জন। বোমাবর্ষণ বন্ধের স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিতও দেখা যায়নি। যুদ্ধবিরতি কার্যকরে সবার চোখ এখন মিসরের দিকে।

চুক্তি কি যুদ্ধের অবসান আনবে: ট্রাম্প বলেছেন, তার ২০ দফা পরিকল্পনার লক্ষ্য শুধু গাজা নয়, বরং ‘মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করা। তবে এর আগেও ২০২৩ সালের শুরুর দিকে এবং চলতি বছরের শুরুতে দুই দফা যুদ্ধবিরতির চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এবারো অনেক বাধা সামনে রয়েছে। হামাস নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি, যা ট্রাম্প পরিকল্পনার মূল শর্ত এবং ইসরায়েলের প্রধান যুদ্ধলক্ষ্যগুলোর একটি। অন্যদিকে নেতানিয়াহু এ পরিকল্পনায় সম্মতি দিলেও এর মধ্যে একটি সম্ভাব্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের ইঙ্গিত রয়েছে। যেটি তিনি স্পষ্টভাবেই অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করেছিলেন। ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহারের সময়সূচি, সীমানা ও ভবিষ্যৎ প্রশাসনও আলোচনার জটিল ইস্যু হয়ে রয়েছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলফার সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক কৌশল পরিকল্পনাপ্রধান ওরেন সেটার বলেন, ‘সব পক্ষকে আলোচনায় আনাটা ট্রাম্পের বড় অর্জন। কিন্তু এটি প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র, শেষ নয়।’

এরপর কী হবে: ট্রাম্পের পরিকল্পনায় কোনো স্পষ্ট সময়সূচি নেই। এতে বলা হয়েছে, উভয় পক্ষ সম্মত হলে যুদ্ধ সঙ্গে সঙ্গে শেষ হবে। কিন্তু হামাস ২০টি পয়েন্টের সবগুলোতে সম্মতি দেয়নি, বরং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিস্তারিত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রকাশ্য সম্মতির ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জীবিত ও মৃত সব বন্দি মুক্তি পাবে। তবে হামাসের দেরিতে সাড়া দেয়ায় এ ৭২ ঘণ্টা কখন থেকে গণনা শুরু হবে তা স্পষ্ট নয়। হামাস সূত্র বলছে, জীবিত বন্দিদের হস্তান্তর সহজ হলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা মৃতদেহ উদ্ধার করতে সময় লাগতে পারে। ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, হামাস ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলায় ২৫১ জনকে বন্দি করেছিল, যাদের মধ্যে এখনো ৪৮ জন গাজায় রয়েছে এবং ২০ জন জীবিত।

কোন বিষয়ে মতানৈক্য: হামাস পরিকল্পনায় বর্ণিত বিনিময় কাঠামো অনুযায়ী বন্দিদের মুক্তির কথা বলেছে, তবে ‘প্রয়োজনীয় মাঠপর্যায়ের শর্ত’ উল্লেখ করেছে। সেটা কী তাও স্পষ্ট নয়। হামাস ইসরায়েলি সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহার চায়। যেখানে পরিকল্পনায় পর্যায়ক্রমিক প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। হামাস গাজার প্রশাসন ফিলিস্তিনি টেকনোক্রেটিক কর্তৃপক্ষের হাতে ছেড়ে দেয়ার কথা বলেছে, যা আরব ও ইসলামী বিশ্বের সমর্থন পাবে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, প্রশাসন একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা তত্ত্বাবধান করবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন ট্রাম্প এবং অন্যদের মধ্যে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। হামাস নিজেকে ‘সমন্বিত ফিলিস্তিনি জাতীয় কাঠামোর’ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে কিছু বলেনি। যেখানে পরিকল্পনায় হামাসকে ভবিষ্যৎ প্রশাসন থেকে বাদ দিয়ে গাজাকে নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসানে এক নতুন জানালা খুলেছে। কিন্তু সেই জানালা কতটা খোলা থাকবে তা এখন নির্ভর করছে কায়রোর আলোচনার ফলাফল, রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং মাঠের বাস্তবতার ওপর। তবে বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে গাজার আকাশে এখনো ধোঁয়া উড়ছে, আর সেই ধোঁয়ার আড়ালে শান্তির প্রতিশ্রুতি এখনো অস্পষ্ট।

৬১ শতাংশ মার্কিন ইহুদির বিশ্বাস ইসরায়েল যুদ্ধাপরাধী: যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ ইহুদি বিশ্বাস করে, ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধাপরাধ করেছে। তাদের অনেকেরই বিশ্বাস, ইসরায়েল ফিলিস্তিনি উপত্যকায় গণহত্যা চালিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সমর্থন দিচ্ছে বলে মনে করে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মার্কিন ইহুদি। ওয়াশিংটন পোস্টের করা একটি জরিপের ফলাফলে এমনটি জানা যায়। ২ থেকে ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চালানো এ জরিপে ৮১৫ জন মার্কিন ইহুদি অংশ নেয়।

জরিপের বরাত দিয়ে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, মার্কিন ইহুদিদের ৬১ শতাংশ বলেছে, তারা মনে করে গাজায় ইসরায়েল যুদ্ধাপরাধ করেছে। শুধু তাই নয়, তাদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের চারজন বিশ্বাস করে, ইসরায়েল গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, ৬৮ শতাংশ মার্কিন ইহুদি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে অসন্তুষ্ট। ৫৯ শতাংশ মার্কিন ইহুদি চায় যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখুক। ইসরায়েলিদের বড় অংশ যেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতা করে, সেখানে ৫৯ শতাংশ মার্কিন ইহুদি মনে করে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারে।