পূর্ব এশিয়ার উন্নত দেশ দক্ষিণ কোরিয়ায় এখন চরম রাজনৈতিক সংকট। রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে সামরিক আইন জারি করেছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল। যদিও সামরিক আইন জারির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিশংসনের মুখে পড়েছেন তিনি। আজ কিংবা আগামীকাল হতে পারে অভিশংসন ভোট। দক্ষিণ কোরিয়া ও প্রেসিডেন্ট ইউনের এ নজিরবিহীন সংকটে পড়ার পেছনে বড় ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করেছে একটি হ্যান্ডব্যাগ!

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারায় জনপ্রিয়তা কমছিল ইউনের। এর সঙ্গে যোগ হয় তার স্ত্রীর নানা কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি। এ সুযোগগুলোই কাজে লাগায় বিরোধী দলগুলো। সেই চাপ সামাল দিতেই প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে প্রথমবার দেশে সামরিক আইন জারি করে বসেন প্রেসিডেন্ট। এ ঘটনায় তার জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় তার স্ত্রীর ব্যাগ-কাণ্ড। ফার্স্ট লেডি কিম কিওন-হি আমেরিকান-কোরীয় এক যাজকের কাছ থেকে একটি দামি হ্যান্ডব্যাগ উপহার নিয়ে স্বামীকে পতনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। গোপনে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, ডিওর ব্র্যান্ডের ১ হাজার ৮০০ পাউন্ড (প্রায় ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫০০ টাকা) মূল্যের একটি হ্যান্ডব্যাগ উপহার হিসেবে নিচ্ছেন তিনি। ঘটনাটি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের।

ভিডিওটি ধারণ করেন যাজক নিজেই! তিনি তার হাতঘড়িতে গোপনে সেট করা ক্যামেরায় এ ভিডিও ধারণ করেন। যাজক বলেছেন, বামপন্থী ঘরানার ইউটিউব চ্যানেল ‘ভয়েস অব সিউল’ তাকে এ হ্যান্ডব্যাগ আর ক্যামেরা সরবরাহ করে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভয়েস অব সিউল প্রেসিডেন্ট ইউনের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত।

ভিডিও ক্লিপটি গত বছর ইউটিউবে ছাড়া হলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ ঘটনা নিয়ে দেশটিতে ঝড় উঠলেও ইউন দুঃখপ্রকাশ করার প্রয়োজন বোধ করেননি। যাজক যখন হ্যান্ডব্যাগটি দিচ্ছিলেন তখন প্রেসিডেন্টের স্ত্রীকে বলতে শোনা যায়: ‘আপনি এটি কেন এনেছেন? এর কোনো প্রয়োজন ছিল না।’

দুজন যখন কথা বলছিলেন তখন টেবিলে দুজনের মাঝে একটি ডিওর লেখা ব্যাগ রাখা ছিল। যদিও কিম ব্যাগটি নিয়েছেন কিনা তা ফুটেজে দেখা যায়নি।

অভিযোগ উঠেছে ক্লাউড ব্লু রঙা ল্যাডি ডিওর ব্যাগটির মূল্য ১ হাজার ৮০০ পাউন্ড। দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা উপহার হিসেবে এত দামি জিনিস নিতে পারেন না। এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখেও পড়তে হয় প্রেসিডেন্ট পত্নীকে। যদিও তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি কিংবা তিনি কোনো সাজার মুখে পড়েননি।

কিম সাজা না পেলেও আরো বড় সাজার মুখে তিনি ও তার স্বামী। এ হ্যান্ডব্যাগ-কাণ্ডই দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা ডেকে এনেছে। ইউন দুঃখপ্রকাশ করেননি এবং অস্বীকারও করেননি যে তার স্ত্রী ব্যাগটি নিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্যই কৌশল হিসেবে এ ভিডিও ফাঁস করা হয়েছে।

ওই ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর ফার্স্ট লেডির বিরুদ্ধে ‘অনৈতিক’ কাজের অভিযোগ ওঠে। কোরীয় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। এখানেই শেষ নয়। ফার্স্ট লেডির বিরুদ্ধে আরো কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে তিনি কর ফাঁকি দিয়েছেন আর শেয়ার কারসাজিতেও যুক্ত রয়েছেন। তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিসন্দর্ভের জন্য চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় নিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কিমের শেয়ার কারসাজিতে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেছে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, যদিও বাকি দুটি অভিযোগ নিয়ে কিছু বলেনি।

আইনের অধ্যাপক চো হি-কিউং সিএনএনকে বলেছেন, ‘ডিওর ব্যাগটি হলো প্রবাদের সেই সুই, যা উটের পিঠ ভেঙে দিয়েছিল।’ ইউনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে থেকেই নানা বিতর্ক শুরু হয় কিমকে নিয়ে। যদিও ডিওর ব্যাগটি তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যমান প্রমাণ বলে মনে করেন অধ্যাপক চো।

স্ত্রীর ব্যাগ-কাণ্ডের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া ও কোরীয় প্রেসিডেন্টের বিপদ বাড়িয়েছে। এ বছর শুরুর দিকে সরকারের ভর্তুকি মূল্যের বাজারে যে দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছিল, তাকে ‘বাস্তবসম্মত’ বলে প্রশংসা করেন ইউন। তার এ মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা হয়। বিরোধী নেতারা এ নিয়ে হাসিঠাট্টা করেছেন। একজন তো বলেই দিয়েছেন, ‘একটি পেঁয়াজই প্রেসিডেন্টের সর্বনাশ করতে পারে।’

এদিকে সামরিক আইন জারি করায় তোপের মুখে পড়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিম ইয়ং-হিউনকে সরিয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন চৌ বাইয়ুং-হাইউক।

ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, কিম বুধবার তার পদ থেকে সরে দাঁড়ান। সামরিক আইন জারি করার পেছনে তিনি অন্যতম কুশীলব ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক কিম জুনিল বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা এখন হুমকির মুখে।’

আজ কিংবা কাল অভিশংসন। প্রেসিডেন্ট ইউন কি অভিশংসনের চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারবেন, নাকি তার সময় ফুরিয়ে এসেছে? যদি তাকে সরে যেতেই হয়, তবে এ পতনের পেছনে হ্যান্ডব্যাগ-কাণ্ডে তার স্ত্রীকেই সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হবে কি?