ইরানের তিনটি পরমাণু স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর স্থাপনাগুলোর চারপাশে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ এখনো পায়নি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। ফলে প্রশ্ন উঠেছে তেহরানের ইউরেনিয়ামের মজুদ কোথায় গেল। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার গোয়েন্দা ও স্যাটেলাইট তথ্য বলছে, ইরান ৪০০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গোপন কোনো স্থানে সরিয়ে নিয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য অপরিহার্য। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ নিখোঁজ ইউরেনিয়াম যেন হয়ে উঠেছে ভবিষ্যতের পারমাণবিক হুমকির প্রতীক।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেললেও ইরানের অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে সঞ্চিত জ্ঞান, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ইরানের পারমাণবিক স্বপ্নকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে। এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে ইসরায়েল নেতৃত্বের মধ্যে। অবশ্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরানের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ৪০০ কেজি মজুদের বিষয়ে ইসরায়েলের কাছে ‘গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য’ রয়েছে।

ইরানের এভিন কারাগারে হামলা: এবার ইরানের এভিন কারাগারে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলের বিমান বাহিনী। গতকাল তেহরানের এ কারাগারে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। তবে এ হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা জানা যায়নি। এমনকি ইসরায়েলও এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, এভিন কারাগারে সরকারবিরোধী অনেক রাজনৈতিক নেতাকে রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। এ কারাগারে এমন অনেক বন্দি রয়েছেন, যাদের বিনিময় করার জন্য বিভিন্ন সময় চুক্তি করতে চেয়েছে পশ্চিমারা। তবে কারা সেখানে রয়েছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইসরায়েলি এ হামলায় কোনো বন্দি পালিয়েছেন কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেনি ইরান। তবে দেশটির বিচার বিভাগ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। এ হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলে দীর্ঘতম হামলা ইরানের: গতকাল ইসরায়েলে সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে হামলা চালিয়েছে ইরান। তেল আবিব থেকে আল জাজিরাকে ইসরায়েলের সাবেক বিচারমন্ত্রী জোসি বেইলিন বলেন, ‘হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ এখনো স্পষ্ট নয়।’ খবর আল জাজিরা।

বেইলিন আরো বলেন, ‘দিনের বেলায় হামলা হয়েছে। সাধারণত হামলাগুলো রাতে ঘটে।’

ইসরায়েলের সাবেক এ মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সামরিক বাহিনী স্পষ্টতই ড্রোনের (ইরান থেকে উড়ে আসা) একাংশ অকার্যকর করেছে। কিন্তু এর পরও এটা নিশ্চিত যে ইরানিদের কাছে প্রতিদিন হামলা করার মতো যথেষ্ট ড্রোন আছে।

ইরানের হামলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত: ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুৎ কোম্পানির কৌশলগত স্থাপনার কাছে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে গতকাল। এতে ওই এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়।

টাইমস অব ইসরায়েলের খবর বলছে, দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহে গোলযোগ দেখা দিয়েছে। ইসরায়েল ইলেকট্রিক করপোরেশন বলছে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার কাজ চলছে। অবকাঠামো মেরামত ও ঝুঁকিপূর্ণ সরঞ্জাম সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীও সেখানে কাজ করে যাচ্ছে।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ইরানের হামলার সময় প্রায় ৩৫ মিনিট ধরে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে সাইরেন বেজেছে। সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল থার্টিনের খবর বলছে, ১৩ জুন হামলা শুরুর পর থেকে আজ সবচেয়ে লম্বা সময় আশ্রয় কেন্দ্রে থাকতে হয়েছে ইসরায়েলিদের।

যুদ্ধ ‘শেষের’ ইঙ্গিত ইসরায়েলের: আগামী কয়েকদিন জোর হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করে যুদ্ধ শেষের ইঙ্গিত দিয়েছে ইসরায়েল। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার আরব মিত্রদের মাধ্যমে ইরানের কাছে ইসরায়েলের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। আরব ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে গতকাল মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল-১২-এর খবরে বলা হয়েছে, আগামী কয়েকদিন হামলা জোরদার করে নিজেদের সামরিক লক্ষ্য খুব দ্রুত অর্জন করতে পারবে বলে প্রত্যাশা ইসরায়েলের। হামলা জোরদারের ইঙ্গিত দিয়ে ইরানের বেসামরিক নাগরিকদের সংশ্লিষ্ট অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র, সামরিক ঘাঁটি ও সরকারি নিরাপত্তা সংস্থার স্থাপনা থেকে দূরে থাকতে বলেছে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স। যুদ্ধ শেষে ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুও। গতকাল তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল ধাপে ধাপে তার মূল লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগোচ্ছে। লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান থামানো হবে না। তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধেও জড়াবে না দেশটি। আমরা হুমকি সরিয়ে দিচ্ছি, তাদের পেছনে ঠেলে দিচ্ছি। অভিযান কেবল তখনই শেষ হবে যখন আমাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণরূপে অর্জন হবে।’

চ্যানেল-১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের মতে অভিযান শেষ করার দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, ইসরায়েল একতরফাভাবে ঘোষণা করতে পারে যে তারা তাদের লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করেছে। দ্বিতীয়ত, উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিতে পারে। যদিও ইসরায়েল এটিকে কম গ্রহণযোগ্য হিসেবে মনে করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব দেয়া ছাড়া ইরান এখনই অভিযান শেষ করতে চায় না।