মৌমাছি একদমই দেখতে পারে না বুনো হাতিরা। ছোট্ট এই পতঙ্গগুলোর কামড় তাদের সংবেদনশীল ত্বকে প্রচণ্ড ব্যথা সৃষ্টি করে। হাতির দল যখন মৌমাছির গুঞ্জন শোনে, তখন তারা বিপদের আশঙ্কায় দ্রুত সরে পড়ে। এই তথ্যকে কাজে লাগিয়েই কেনিয়ার গবেষকরা এক নতুন কৌশল তৈরি করেছেন—মৌচাকের বেড়া।

২০০৭ সালে গবেষক লুসি কিং ও তার দল পরীক্ষা চালিয়ে দেখেন, হাতিরা শুধু মৌমাছি এড়িয়ে চলে না, বরং সংকেত পাঠিয়েও পরস্পরকে সতর্কও করে। এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই ২০০৮ সালে কেনিয়ার একটি কৃষি অঞ্চলে প্রথমবারের মতো বসানো হয় মৌচাকের বেড়া। একটি মৌচাকের বেড়া তৈরির জন্য ১০ মিটার অন্তর একেকটি মৌচাক বসানো হয়, যার মধ্যে কিছু আসল ও কিছু নকল। এই কৌশলে হাতিরা বিভ্রান্ত হয় এবং পুরো এলাকাটিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে দূরে সরে যায়। গবেষক লুসি কিং বলেন, ‘অন্ধকারে হাতিরা শুধু মৌমাছির গন্ধই পায় না, বরং চারপাশে ছড়িয়ে থাকা হলুদ বাক্সগুলো দেখে মনে করে প্রতিটি বাক্সেই মৌমাছি আছে। এই ভয় থেকেই তারা ফিরে যায়।’

এই অভিনব পদ্ধতি শুধু হাতি প্রতিরোধই করছে না, বরং কৃষকদের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগও তৈরি করছে। মৌচাক থেকে সংগৃহীত মধু বিক্রি করে কৃষকরা অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করতে পারছেন। কেনিয়ার মওয়াকোমা গ্রামের বাসিন্দা ইমানুয়েল মওম্বা বলেন, ‘আমরা মাত্র দুটি মৌচাকের বেড়া দিয়ে শুরু করেছিলাম, আর এখন আমাদের পুরো তিনটি গ্রামে ৭০০টি মৌচাক রয়েছে। এটা আমাদের কমিউনিটির জন্য বিশাল একটি পরিবর্তন এনেছে।’
হাতি ও মানুষ সংঘর্ষে সাধারণত নারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। কেননা, কেনিয়ার গ্রামীণ সমাজে মূলত নারীরাই কৃষিকাজে যুক্ত থাকেন, ফলে হাতির আক্রমণের সময় তারাই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। নতুন এই পদ্ধতি তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আর্থিক স্বনির্ভরতার দিকেও এক ধাপ এগিয়ে দিচ্ছে। লুসি কিং বলেন, ‘এখন নারীরা নিরাপদে তাদের জমিতে কাজ করতে পারেন, পাশাপাশি মধু বিক্রির মাধ্যমে আয়ও করতে পারেন। ফলে তারা সংসার চালানোর পাশাপাশি নতুন সুযোগের দিকেও মনোযোগ দিতে পারছেন।’

যথেষ্ট কার্যকর হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে এই পদ্ধতিটি। খরার সময় ফুল ফোটার হার কমে যাওয়ায় মৌমাছির সংখ্যা কমে যেতে পারে, যা এই প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের জন্য একটি বড় সমস্যা। ২০১৮ সালে খরার কারণে এক বছর মৌমাছির সংখ্যা কমে গিয়েছিল, ফলে হাতিরা তুলনামূলকভাবে কম বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। তবে গবেষকরা বলছেন, মৌচাকের বেড়ার সঙ্গে অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, যেমন মরিচের ব্রিকেট বা নজরদারি টাওয়ার ইত্যাদি যুক্ত করা হলে এর কার্যকারিতা আরো বাড়ানো যাবে।

কেনিয়ার কৃষকরা এখন হাতিদের সঙ্গে যুদ্ধ না করে সহাবস্থানের পথ খুঁজে পেয়েছেন। ইমানুয়েল মওম্বা বলেন, ‘আগে হাতিরা আমাদের ফসল ধ্বংস করত, কিন্তু এখন আমরা সহজেই একসঙ্গে থাকতে পারছি, ভয় ছাড়াই।’