১৯৭১ থেকে ২০০০—এ ২৯ বছর সিরিয়া শাসন করেছেন হাফিজ আল-আসাদ। ২০০০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ২৪ বছর শাসনক্ষমতায় ছিলেন তারই পুত্র বাশার আল-আসাদ। সিরিয়ার মানুষের জন্য এ ৫৩ বছর ছিল দমন-নিপীড়নের ইতিহাস, গণতন্ত্রহীনতার ইতিহাস। ১৩ বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বিদ্রোহী বাহিনীর হাতে রাজধানী দামেস্কের পতন ও প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পলায়নের মধ্য দিয়ে গতকাল সিরিয়ায় আল-আসাদ পরিবারের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটেছে।
সিরিয়ায় ২০১১ সালে শুরু হওয়া বাশারবিরোধী আন্দোলন মাঝে স্তিমিত হয়ে এলেও গত মাসের শেষদিকে বিদ্রোহীরা নতুন করে আক্রমণ শুরু করে। আলেপ্পো, হামা, হোমস জয়ের পর দ্রুতই রাজধানী দামেস্কের দিকে অগ্রসর হয় বিদ্রোহীরা। সম্মিলিত আক্রমণ শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই বিদ্রোহীরা অভাবনীয় বিজয় পায়। বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দিয়েছে হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) নামে সশস্ত্র ইসলামী গোষ্ঠী।
বাশার আল-আসাদ সরকারের অবসান সিরিয়ার ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলে ঘোষণা দেয় এইচটিএস। গতকাল এক বিবৃতিতে বিদ্রোহীরা বলেছে, বাথ পার্টির শাসনের অধীনে ৫০ বছরের দমন-পীড়ন ও ১৩ বছরের অপরাধ, স্বৈরশাসন ও বাস্তুচ্যুতি শেষে দীর্ঘ সংগ্রামের পর সব ধরনের দখলদার বাহিনীর মোকাবেলা করে, আমরা আজ (৮ ডিসেম্বর) সেই অন্ধকার যুগের সমাপ্তি ঘোষণা করছি এবং সিরিয়ার জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা করছি।
সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী জানিয়েছে, ‘নতুন সিরিয়া’ হবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্থান, যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সব সিরীয়র সম্মান বজায় রাখা হবে। বিদ্রোহীরা বিবৃতিতে আরো বলে, আমরা অন্ধকার অতীতের পাতা বন্ধ করে ভবিষ্যতের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছি।
বিদ্রোহী গোষ্ঠী এইচটিএস প্রধান আবু মোহাম্মদ আল-জোলানিসহ বিরোধী নেতারা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জোর দিয়ে বলছিলেন, তারা এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করতে চান যা হবে সব সিরীয়র। এর মাধ্যমে তারা সাম্প্রদায়িক উদ্বেগ ও আল কায়েদার সঙ্গে আগের সম্পর্কের বিষয়ে সিরীয়দের সন্দেহ দূর করতে চেয়েছেন।
বাশার আল-আসাদ পালালেও তার সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ গাজি আল-জালালি দামেস্কেই থেকে যাবেন। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তদারক করবেন। আল-জালালি বিরোধী দলগুলোর প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে বলেছেন, আমি সবার প্রতি আহ্বান জানাই যুক্তিসংগত চিন্তা করতে এবং দেশের কথা ভাবতে। আমরা তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াই যারা তাদের হাত বাড়িয়েছে এবং আশ্বস্ত করেছে, তারা এ দেশের কারো ক্ষতি করবে না। তিনি নাগরিকদের প্রতি সরকারি সম্পত্তি রক্ষার আহ্বানও জানিয়েছেন।
দেশটির সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সামরিক বাহিনীকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আল-জোলানি। তিনি বলেছেন, দায়িত্ব হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত সিরিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশটির সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী আল-জালালির অধীনে থাকবে।
বিদ্রোহী গোষ্ঠী জানিয়েছে, তাদের যোদ্ধারা দামেস্কের কাছে সেদনায়া কারাগারের সব বন্দিকে মুক্ত করেছে। যেখানে সরকারি বাহিনী বন্দিদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়ে আসছিল বছরের পর বছর। কারাগারটিতে কয়েক হাজার মানুষকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বাশার আল-আসাদের দেশত্যাগের খবর জানার পর হাজার হাজার মানুষ গাড়িতে করে ও পায়ে হেঁটে দামেস্কের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সমবেত হয়ে ‘স্বাধীনতা’ বলে স্লোগান দিচ্ছিল। সিরীয়রা উমাইয়াদ স্কয়ারে পরিত্যক্ত একটি সামরিক ট্যাঙ্কের ওপর দাঁড়িয়ে গান গেয়ে উল্লাস প্রকাশ করছে।
বিদ্রোহী বাহিনী প্রথমে সিরিয়ার উত্তরের শহর আলেপ্পো দখল করে নেয়। পরে হোমস ও হামা অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়। দক্ষিণ সিরিয়ার দেরা অঞ্চলেও বিদ্রোহীরা বড় ধরনের সফলতা অর্জন করে। একটি পর্যায়ে সিরিয়ার সামরিক বাহিনী তাদের দখলে থাকা দুর্গগুলো ত্যাগ করে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয়। এতেই বাশার আল-আসাদের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে।
বিদ্রোহী আক্রমণের নেতৃত্ব দেয়া এইচটিএস জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত। সেই সংগঠনটির হাতেই বাশারমুক্ত হলো সিরিয়া। এইচটিএসের সূচনা ২০১১ সালে জাবহাত আল-নুসরা নামে, যা সরাসরি আল কায়েদার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এ গোষ্ঠীর গঠনে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের নেতা আবু বকর আল-বাগদাদিও ভূমিকা রেখেছিলেন। এটি বাশারের বিরুদ্ধে লড়াই করা সবচেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল।
২০১৬ সালে এইচটিএস নেতা আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি আল কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। পরে তিনি জাবহাত আল-নুসরা ভেঙে একটি নতুন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যা এইচটিএস নামে পরিচিত হয়। সংগঠনটি সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইদলিব প্রদেশে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তারা সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকাও পালন করছে। যদিও তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। এ সংগঠনটির নেতৃত্বেই সিরিয়া অবশেষে আল-আসাদ পরিবারমুক্ত হলো।
২০১১ সালের মার্চে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর দেরায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর গণ-আন্দোলনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এ বিক্ষোভ গণতন্ত্রের দাবিতে গড়ে ওঠে। বাশার সরকার এ বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক হামলা ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে। প্রেসিডেন্ট বাশার এ আন্দোলনকে বিদেশী মদদপুষ্ট ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে উল্লেখ করেন। তাতে বিরোধীরা দমে যায়নি। যুদ্ধের এক পর্যায়ে শত শত বিদ্রোহী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এর সঙ্গে যোগ দেয় আইএস। পরে এটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। ১৩ বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটল বাশার আল-আসাদের ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে।
টানা ১৩ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে সিরিয়ায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। উদ্বাস্তু হয়েছে দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় দেশটির সব প্রাচীন নিদর্শন ও স্থাপনা। প্রেসিডেন্ট বাশার অবশ্য এতকিছুর পরও ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছেন যেকোনো কিছুর বিনিময়ে। মিত্র হিসেবে পাশে পান ইরান ও রাশিয়াকে। হিজবুল্লাহও ছিল তার পাশে। কিন্তু কোনো কিছুই বাশারের পতন ঠেকাতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যের এ স্বৈরশাসক বিদ্রোহীদের চতুর্মুখী আক্রমণে অবশেষে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলেন।
সিরিয়া ছেড়ে কোথায় গেছেন বাশার আল-আসাদ, সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। তার মিত্র দেশ রাশিয়া গতকাল বিকালে জানায়, বাশার ‘পদত্যাগ করেছেন’ এবং ‘সিরিয়া ছেড়েছেন’। তবে তিনি কোথায় আছেন, সে ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানায়নি রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাশার আল-আসাদের দেশ ছাড়া নিয়ে এটাই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি। পরে রাশিয়ার সংবাদ সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি ও রয়টার্স জানায়, বাশার ও তার পরিবার মস্কোয় রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন।










