সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া সফরকালে শুক্রবার সিউলের ইয়োনসেই ইউনিভার্সিটিতে দেয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের উচিত হবে না এ দুই শক্তির ‘ভেসেল’ বা আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া।

দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ব্রাজিল, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশকে আন্তর্জাতিক আইন, গণতন্ত্র ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার মতো অভিন্ন লক্ষ্যের ভিত্তিতে একটি ‘স্বাধীন জোট’ গড়ে তোলার আহ্বান জানান মাখোঁ। তিনি বলেন, ‘দশকের পর দশক ধরে আমরা এ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে একটি তথাকথিত স্থিতিশীলতা উপভোগ করে আসছিলাম। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি অনেকটাই ওলটপালট হয়ে গেছে। এ নতুন বিশৃঙ্খলায় আমাদের নিষ্ক্রিয় থাকলে চলবে না। আমাদের একটি নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো দুই পরাশক্তির ভেসেল রাষ্ট্রে পরিণত না হওয়া। আমরা চীনের আধিপত্যের ওপর নির্ভরশীল হতে চাই না আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চয়তার কাছেও নিজেদের অতিমাত্রায় নির্ভরশীল করতে রাজি নই।’

মাখোঁর এ কড়া অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপড়েন। ইরান ইস্যু এবং ন্যাটোর ভূমিকা নিয়ে দুই নেতার মধ্যে বিরোধ এখন তুঙ্গে। ট্রাম্প যখন ন্যাটোকে ‘কাগুজে বাঘ’ বলে উপহাস করছেন তখন মাখোঁ পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলছেন, কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ বা বোমাবর্ষণ করে বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

বিশেষ করে ইরান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের সরাসরি বিরোধিতা করেছে ফ্রান্স। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক পদক্ষেপের মার্কিন প্রস্তাবের বিপক্ষে ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন একাট্টা হয়ে অবস্থান নিয়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্যারিস ওয়াশিংটনের অন্ধ অনুসারী হতে নারাজ।

এর আগে মাখোঁ যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে প্রত্যাহারের হুমকি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যেরও জবাব দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বারবার সন্দেহ প্রকাশ করা জোটটির মৌলিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। এ ধরনের বক্তব্যের ক্ষেত্রে বিশ্বনেতাদের আরো দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মাখোঁ বলেন, ‘ন্যাটোর মতো জোট কেবল আনুষ্ঠানিক চুক্তি দিয়ে টিকে থাকে না, বরং পারস্পরিক আস্থা ও অঘোষিত প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।’ তার ভাষায়, প্রতিদিন যদি সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তাহলে জোটের মূল শক্তিই ক্ষয় হতে থাকে।

তবে কৌশলগত স্বাধীনতার কথা বললেও নিজের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতেও পিছিয়ে নেই ফ্রান্স। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সাবমেরিন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোতে নেতৃত্ব জোরদারের অংশ হিসেবে জার্মানিসহ অন্যান্য দেশকে ফ্রান্সের পারমাণবিক সুরক্ষার আওতায় আনার প্রস্তাবও দিয়েছেন ইমানুয়েল মাখোঁ।