গাজায় জুলাইয়ের শেষ ১১ দিনে অনাহারে মৃত্যুর সংখ্যা এর আগের ২১ মাসে অনাহারে মোট মৃত্যুর মোট সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৯ জুলাই পর্যন্ত ২১ মাস ধরে চলা সংঘাতে গাজা উপত্যকায় অপুষ্টিজনিত কারণে মারা গেছেন ৬৮ জন। আর ২০ থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত ১১ দিনে অনাহারে মৃত্যু হয় ৮৬ জনের।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন বলছে, গাজার এ মানবিক বিপর্যয়কে আর শুধু খাদ্যসংকট বলে সরলীকরণের সুযোগ নেই, বরং এটি একটি পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাজা সম্ভবত বিশ্বের প্রথম যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে দুর্ভিক্ষ শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং তা যুদ্ধের একটি কৌশলগত অস্ত্র।
২০০৭ সালে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর থেকেই উপত্যকায় কঠোর অবরোধ জারি করে ইসরায়েল। তখন ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থা কোগাট গাজাবাসীর জন্য প্রতিদিনের ন্যূনতম ক্যালরি হিসাব করে খাবার ঢুকতে দেয়ার পরিকল্পনা সাজায়। যাতে করে তারা ভরপেট খাবার না পায়, আবার অনাহারে যেন মারাও না পড়ে। ইসরায়েলি হিসাবে একজন মানুষের দৈনিক দরকার ২ হাজার ২৭৯ ক্যালরি, অথচ খাদ্য প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয় তার তুলনায় অনেক কম। ২০০৮ সালে এ পরিকল্পনা ফাঁস হলে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে।
চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত গাজায় যে পরিমাণ খাদ্য ঢুকেছে, তা চাহিদার মাত্র এক-চতুর্থাংশ। ফলে নিদারুণ ক্ষুধা ও অপুষ্টির শিকার হয়েছে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই। মধ্য গাজার মাঘাজি শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা জামিল মুঘারি বলেন, ‘আমার পাঁচ বছরের মেয়ের ওজন এখন মাত্র ১১ কেজি। দুই সন্তানই কঙ্কালসার। গত কয়েক মাসে আমি নিজেও ৩০ কেজি ওজন হারিয়েছি।’ আরেক নারী খাইবারা বলেন, ‘আগে দিনে তিনবেলা খেতাম। এখন পুরো সপ্তাহে দুই বা তিনদিন খাবার জোটে, তাও খুব কম। বাকি দিন শুধু পানি আর লবণ খেয়ে বেঁচে আছি।’ গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকার আবু ওসামা বলেন, ‘আমার শিশুর বুকের হাড় বেরিয়ে এসেছে। প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে মনে হয়, হয়তো কাল সকালে আমার ছেলে আর ঘুম থেকে জেগে উঠবে না।’ কাল সকালে হয়তো ও আর বাঁচবে না।’
ইসরায়েল গাজায় খাদ্য সরবরাহ কার্যত বন্ধ রেখেছে। মাঝে মাঝে যে ক’টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করে, সেগুলোর আশপাশে দেখা দেয় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা। এসব ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়েই প্রাণ হারাচ্ছে বহু শিশু—কেউ ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে, কেউ সাগরে ডুবে। এমনকি ত্রাণ সংগ্রহের জন্য যাওয়া মানুষের ওপর চালানো হয় গুলি। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরায়েল আকাশপথে সীমিত পরিসরে ত্রাণ পাঠানোর অনুমতি দিতে রাজি হয়েছে। গত ১০৪ দিনে আকাশপথে যত খাদ্য ফেলা হয়েছে, তা গাজার মাত্র চারদিনের প্রয়োজন মেটাতে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) গাজার পরিস্থিতিকে পূর্ণমাত্রার দুর্ভিক্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, কেবল উত্তর গাজাতেই কমপক্ষে পাঁচ লাখ মানুষ চরম খাদ্যসংকটে রয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা বেটসেলেম ও গিশা জানায়, ইসরায়েল ঠিকই জানে গাজার মানুষের জন্য কতটুকু খাদ্য প্রয়োজন, তবুও সেই খাদ্যের খুব অল্প অংশই তারা প্রবেশের অনুমতি দেয়। ইচ্ছাকৃত এ ব্যবধানই প্রমাণ করে, গাজার দুর্ভিক্ষ পূর্বপরিকল্পিত এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা।










