দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্র মিয়ানমার দীর্ঘ দুই দশকের প্রচেষ্টার পর অবশেষে পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনের পথে একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। সম্প্রতি সামরিক জান্তা ঘোষণা দিয়েছে, তারা আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই একটি ছোট আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করবে। মূলত রাশিয়ার সহায়তায়ই সামরিক জান্তার দুই দশকের চেষ্টা বাস্তবায়ন হচ্ছে। জান্তার দাবি, বিদ্যুৎ সংকটে ভোগা দেশের জন্য এটি সম্পূর্ণ ‘শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে’ ব্যবহৃত হবে। যদিও সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে বিশ্লেষকদের। কারণ এর আগে ২০০৮ সালে গোপনে উত্তর কোরিয়া সফর করে পরমাণু শক্তি অর্জনের খুঁটিনাটি জানার চেষ্টা চালিয়েছিল দেশটি। ২০১০ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ‘পারমাণবিক ইউনিট’-এর প্রকৌশলী মেজর সাই থেইন উইন প্রকাশ্যে জানান যে উত্তর কোরিয়ার সহায়তায় পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের গবেষণা করছে মিয়ানমার।

থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরাওয়াদ্দির খবরে বলা হয়েছে, মূলত মিয়ানমারের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার যাত্রা শুরু হয় ২০০২ সালে, যখন সামরিক সরকার প্রথমবারের মতো শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক গবেষণা রিঅ্যাক্টর নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। একই বছরের মে মাসে রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তি মন্ত্রণালয় মিয়ানমারে একটি ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র এবং দুটি ল্যাবরেটরি নির্মাণে সহযোগিতার চুক্তি করে।

২০০৪ সালে মার্কিন কংগ্রেসে উত্তর কোরিয়া থেকে মিয়ানমারে পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। যদিও সামরিক জান্তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার কোনো ইচ্ছা নেই বলে দাবি করে। তারা একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণের অধিকার থাকার কথাও জানায়।

২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রায় ৪০০ জন তরুণ সেনা কর্মকর্তাকে পারমাণবিক প্রকৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য রাশিয়ায় পাঠানো হয়। ২০০৭ সালে রাশিয়ার রোসাটম ঘোষণা করে, তারা মিয়ানমারে পরিকল্পিত পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণে সহায়তা করবে। যেখানে কম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে গবেষণা, ওষুধ উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটানো হবে।

পরে ২০০৮ সালে থুরা শোয়ে মানের নেতৃত্বে মিয়ানমারের একটি সামরিক প্রতিনিধি দল গোপনে উত্তর কোরিয়া সফর করে। যেখানে পার্বত্য অঞ্চলে গোপন টানেল, ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষণাগার পরিদর্শন করা হয়। এ সফর মিয়ানমারের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরো বাড়ায়।

২০১০ সালে পরিস্থিতি আরো নাটকীয় মোড় নেয়। ওই বছর জুনে বিরোধী গোষ্ঠী ‘ডেমোক্রেটিক ভয়েস অব বার্মা’ একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করে, যাতে সামরিক বাহিনীর গোপন পারমাণবিক প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে। এ তথ্য সরবরাহ করেন সাই থেইন উইন, যিনি সেনাবাহিনীর ‘নিউক্লিয়ার ইউনিট’ নামে পরিচিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ওয়ার্কশপের প্রকৌশলী ছিলেন। রাশিয়া থেকে পারমাণবিক শক্তিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী উইন দাবি করেন, তিনি বিশেষ যন্ত্র তৈরির কারখানার উপব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন। যা পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। উইনের সরবরাহ করা ছবিতে দেখা যায়, দুটি কারখানায় এমন যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে যা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজে ব্যবহারযোগ্য। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার সাবেক পরিদর্শক রবার্ট কেলি এ তথ্য বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘এ প্রযুক্তি শুধু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়।’ যদিও প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের সক্ষমতা প্রাথমিক পর্যায়ে এবং তাদের প্রকল্প সম্পন্ন করার সামর্থ্য নিশ্চিত নয়।

২০১৬ সালে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকার ‘কমপ্রিহেনসিভ নিউক্লিয়ার টেস্ট ব্যান ট্রিটি’-তে স্বাক্ষর করে। ২০১৮ সালে পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তিও অনুমোদন দেয়। কিন্তু এ প্রচেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

২০২২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমার জান্তা ও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় কোম্পানি রোসাটম পারমাণবিক শক্তি সহযোগিতার একটি রোডম্যাপে স্বাক্ষর করে। এতে মডুলার রিঅ্যাক্টর প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর পরই জান্তা মুখপাত্র মেজর জেনারেল জাও মিন তুন ঘোষণা দেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই একটি ছোট পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইয়াঙ্গুনে প্রথম পারমাণবিক তথ্য কেন্দ্র খোলা হয়। রাশিয়ার সঙ্গে আরো সহযোগিতার রোডম্যাপ স্বাক্ষর হয়। চলতি বছরের মার্চে মিন অং হ্লাইং মস্কো সফর করেন। ১১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর নির্মাণে সহযোগিতা চুক্তি করেন, যা পরবর্তী সময়ে ৩৩০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সম্প্রসারণযোগ্য।

গত বৃহস্পতিবার জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং সপ্তম মাসে চতুর্থবারের মতো রাশিয়া সফর করেন। তিনি ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাটমিক উইক’ ফোরামে অংশ নেন। সেখানে দেয়া ভাষণে জান্তাপ্রধান বলেন, ২০২২ সালে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা শুরুর পর থেকে আমাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যা সম্ভব হয়েছে ত্বরান্বিত উদ্যোগ ও রাশিয়ার বহুমুখী সহায়তার কারণে। তিনি রাশিয়ার আট দশকের পারমাণবিক অগ্রযাত্রার প্রশংসা করেন এবং মস্কোর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক শক্তি বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলার একটি সমাধান হলেও এর আগে মিয়ানমারের পারমাণবিক যাত্রা রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্যকে ঘিরে আবর্তিত হওয়ার পরিস্থিতি দেখা গেছে। এ প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সতর্ক থাকা জরুরি।