চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিশ্বজুড়ে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (এমঅ্যান্ডএ) কার্যক্রমে রেকর্ড উত্থান দেখা গেছে। এ সময় এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রমে দেখা গেছে একের পর এক মেগাডিল। মাত্র তিন মাসেই এমঅ্যান্ডএ লেনদেনের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলার। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে বড় আকারের চুক্তি সম্পাদনে করপোরেট জগতে আস্থা ও আগ্রহ ফিরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। খবর এফটি।

গতকাল সমাপ্ত হওয়া প্রান্তিকে শেষ বড় চমক ছিল ৫৫ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে ইলেকট্রনিক আর্টসের (ইএ) লিভারেজড বাইআউট। ম্যাডেন এনএফএল ও ব্যাটলফিল্ড সিরিজের নির্মাতা এ ভিডিও গেম কোম্পানিকে কিনে নিয়েছে সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ), প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম সিলভার লেক ও জ্যারেড কুশনার প্রতিষ্ঠিত অ্যাফিনিটি পার্টনারসের যৌথ কনসোর্টিয়াম।

লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্যানুযায়ী জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বিশ্বজুড়ে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের চুক্তির ঘোষণা এসেছে ১৪টি, যা সামগ্রিকভাবে পুরো বছরের এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাজারে প্রত্যাশা ছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রমে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিতে পারে। কিন্তু এপ্রিলে বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর তিনি বড় আকারের আমদানি শুল্ক ধার্য করলে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। গত প্রান্তিকের একের পর এক মেগাডিল থেকে ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে এমঅ্যান্ডএর বাজারে ব্যাহত আস্থা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিলছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া প্রান্তিকে সবচেয়ে বড় এমঅ্যান্ডএ চুক্তির মূল্য ছিল ৮৫ বিলিয়ন ডলার। বিপুল এ অর্থে রেলপথ জায়ান্ট ইউনিয়ন প্যাসিফিক অধিগ্রহণ করে নরফোক সাউদার্ন। এছাড়া ৫০ বিলিয়ন ডলার চুক্তিতে একীভূত হয় খনন কোম্পানি অ্যাংলো আমেরিকান ও টেক রিসোর্সেস। সাইবার সিকিউরিটি গ্রুপ পালো নেটওয়ার্কসের ২৫ বিলিয়ন ডলারে সাইবারআর্ক অধিগ্রহণ গ্রীষ্ম মৌসুমের সবচেয়ে বড় এমঅ্যান্ডএ চুক্তিগুলোর অন্যতম।

প্রতিবেদন অনুসারে চলতি বছরের তিন প্রান্তিকে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের ৪৭টি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, যা এলএসইজিতে এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রম নথিবদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সংখ্যায় সর্বোচ্চ। ওই সময় কোম্পানিগুলোর ইউনিট-ভিত্তিক বিভাজন বা পুনর্গঠন উদ্যোগ এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রমকে নতুন গতি দিয়েছে। এ প্রবণতায় উল্লেখযোগ্য হলো খাদ্যপণ্য কোম্পানি ক্রাফট হেইঞ্জের বিভাজন এবং জেডিই পিটস অধিগ্রহণের পর কিউরিগ ড. পেপারের কফি ব্যবসা আলাদা করার পরিকল্পনা।

বুটিক ব্যাংক সেন্টারভিউ পার্টনারসের কো-প্রেসিডেন্ট এরিক টোকাট বলেন, ‘এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রমে আগে যা অকল্পনীয় মনে হতো, এখন তা সম্ভব মনে হচ্ছে। যেসব চুক্তিকে একসময় অসম্ভব মনে করা হতো, সেগুলো এখন আবার আলোচনার টেবিলে আসছে।’

ইউনিয়ন প্যাসিফিকের অধিগ্রহণে পরামর্শক ছিলেন আইনি সংস্থা স্ক্যাডেন আর্সের অংশীদার ব্র্যান্ডন ভ্যান ডাইক। তিনি বলেন, ‘অনেক কোম্পানি ভবিষ্যৎ নিয়ে কয়েক বছর আগে যে পরিকল্পনা করেছিল, এখনকার বাস্তবতার আলোকে তা আবার পুনর্মূল্যায়ন করছে।’

ব্র্যান্ডন ভ্যান ডাইকের মতে, পুরনো অধিগ্রহণ পরিকল্পনাগুলো পুনর্বিবেচনার কারণ হলো বাজারের পরিবেশ, নিয়ন্ত্রক নীতি বা ব্যবসায়িক আস্থার পরিবর্তন।

প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি বছরের তিন প্রান্তিক বিশ্বব্যাপী এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রম দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা গত বছরের প্রথম নয় মাসের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালের পর ২০২৫ সাল হতে যাচ্ছে এমঅ্যান্ডএ খাতের জন্য সেরা বছর। অবশ্য এ বছর প্রাইভেট ইকুইটি ডিলের অংশ কিছুটা কমেছে, কারণ সুদহার বেড়ে ঋণ নেয়া ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রম বাড়ায় বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো পাচ্ছে প্রায় রেকর্ড পরিমাণ ফি। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে বৈশ্বিকভাবে ৯ হাজার ৫৪০ কোটি ডলারের ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং ফি আদায় হয়েছে, যা এলএসইজির নথি অনুসারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

নরফোক সাউদার্নকে রেলপথ একীভূতকরণে পরামর্শক সেবা দেয়ার জন্য ব্যাংক অব আমেরিকা ১৩ কোটি ডলার ফি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে ডিলমেকিং ফি বাবদ ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলার নিয়ে রেকর্ড গড়েছিল জেপি মরগান চেজ। তখন ৬ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে অ্যালারগানকে অধিগ্রহণ করে অ্যাবভি।

ইএ, টেক ও সাইবারআর্কের মেগাডিলগুলোয় পরামর্শক সেবা দিয়েছেন ল্যাথাম অ্যান্ড ওয়াটকিনসের করপোরেট বিভাগের গ্লোবাল চেয়ার চার্লস রুক। তিনি জানান, ২০২১ সালের স্পেশাল পারপাস অ্যাকুইজিশন কোম্পানি (এসপিএসি) কার্যক্রমের জোয়ার ওঠে। এর পর থেকে চলতি বছরের মতো এতটা ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়নি তাকে।

চার্লস রুকের মতে, অনেক দিন পর চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানিগুলো লাভবান হচ্ছে, যার কারণে বাজারে উত্তেজনাকর অবস্থা তৈরি হচ্ছে। এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রম অনেকটা সংক্রামক। বাজারে একটি কোম্পানির সিইও বড় চুক্তি করলে অন্য কোম্পানির সিইও ভাবতে শুরু করেন আমাকেও হয়তো কিছু করতে হবে।

ওয়াখটেল লিপটনের এমঅ্যান্ডএ ইউনিটে কো-প্রেসিডেন্ট জ্যাকব ক্লিং বলেন, ‘এ মুহূর্তে এমঅ্যান্ড বাজার পুরোপুরি সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। আমি মনে করি না এ পরিস্থিতি শিগগির বদলাবে। অনেক বছর ধরে বিভিন্ন শিল্পে হয়নি এমন রূপান্তরমূলক অনেক বড় চুক্তি হতে দেখছি এখন।’