চলতি বছর বেশ কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক সংঘাত বিশ্ব স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলে। ইউক্রেনে যুদ্ধ অব্যাহত থাকে ও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। এসব সংঘাতের ফলে জোটের পরিবর্তন ও তীব্র সামরিক পদক্ষেপ দেখা যায়। এর প্রভাব কেবল স্থানীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত অগ্রাধিকারকে প্রভাবিত করেছে।

২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

ইসরায়েল ইরানের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে, যার মধ্যে হামাস অন্যতম। ইসরায়েলকে সহায়তা করছে বলে সন্দেহের আওতায় থাকা জাহাজগুলোয় আক্রমণ চালায় ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীরা। লেবাননে ইসরায়েল সীমান্তে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলির মধ্যেও সংঘাতের তীব্রতা বেড়েছে।

সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর যোগাযোগ যন্ত্রের মাধ্যমে হামলা চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে। এ ঘটনায় শতাধিক আহত হয়। এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়ে যায়। নভেম্বরে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সংঘাত কমায়। তবে সিরিয়ার বিদ্রোহীরা দ্রুত ইরান-সমর্থিত বাশার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে, যা নতুন সহিংসতার সূত্রপাত ঘটায়।

নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পর ইউক্রেনের জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন সমর্থন কমতে পারে। এটি যুদ্ধের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। একই সময়ে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় ইসরায়েল তার আঞ্চলিক অবস্থান আরো শক্তিশালী করার সুযোগ পেয়েছে।

আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা (এসিএলইডি) প্রতিটি সংঘাত ও সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করে। এ ডাটার ভিত্তিতে কনফ্লিক্ট ইনডেক্স তৈরি করা হয়। ইনডেক্সটি চারটি মানদণ্ডে দেশগুলোর র‍্যাংকিং নির্ধারণ করে। সেগুলো হলো মৃত্যুর সংখ্যা, নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা, সহিংসতা কতটা বিস্তৃত ও সংঘাতে কতগুলো সশস্ত্র দল জড়িত।

২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০টি দেশকে সবচেয়ে উচ্চ সংঘর্ষপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ দেশগুলো হলো ফিলিস্তিন, মিয়ানমার, সিরিয়া, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, ব্রাজিল, লেবানন, সুদান, ক্যামেরুন ও কলম্বিয়া।

বছর শেষ হতে চলেছে। নতুন ও চলমান যুদ্ধগুলোর ফলে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মৃত্যুর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই লাখেরও বেশি মানুষ যুদ্ধ, বিস্ফোরণ, বিক্ষিপ্ত সহিংসতা ও নিরীহ মানুষের ওপর আক্রমণে নিহত হয়েছে। যুদ্ধ ও সহিংসতায় মোট মৃত্যুর প্রায় ৫০ শতাংশই হয়েছে মাত্র তিনটি দেশে। সেগুলো হলো ইউক্রেন, ফিলিস্তিন ও মিয়ানমার।

পূর্ববর্তী বছরগুলোয় আফগানিস্তান যুদ্ধের কারণে অনেক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, বিশেষ করে তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে। তবে গত দুই বছরে ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে মিয়ানমারে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মৃত্যুর পরিসংখ্যান বেড়েছে।

গত এক বছরের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো নাগরিকদের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতার ফলে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৪ সালে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ মানুষ এ ধরনের সহিংসতার ফলে মারা গেছে, যা ২০২৩ সালে ছিল প্রায় ৫ হাজার ৩০০।