প্রতি বছর ৩০ মার্চ ফিলিস্তিনিরা ‘‌ভূমি দিবস’ বা ‘‌ইওম আল-আর্দ’ পালন করে। ১৯৭৬ সালের এই দিনে ফিলিস্তিনের ভূমি দখলের প্রতিবাদের সময় ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ছয়জন নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি নিহত এবং শতাধিক আহত হন।

সেসময় গ্যালিলি অঞ্চলে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মালিকানাধীন ২ হাজার হেক্টর জমি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছিল ইসরায়েল। এটি ছিল মূলত ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পর গ্যালিলি অঞ্চলকে ‘‌জুডাইজ’ বা ইহুদি অধ্যুষিত করার রাষ্ট্রীয় নীতির একটি অংশ।

ভূমি বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়াটি সমগ্র গ্যালিলি অঞ্চল জুড়ে প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৭৬ সালের সেই ঐতিহাসিক প্রতিবাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ফিলিস্তিনি শহর সাখনিন, আররাবাহ এবং দেইর হান্না। বাজেয়াপ্ত করা সেই বিশাল ভূখণ্ডের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ হাজার ফুটবল মাঠের সমান। আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের মানচিত্রের সঙ্গে তুলনা করলে এটি ম্যানহাটনের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে সেন্ট্রাল পার্কের শুরু পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকার সমপরিমাণ।

ভূমি দিবসে ফিলিস্তিনির যা করে

এদিনে ফিলিস্তিনিরা ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে বিভিন্ন জাযগায় প্রতিবাদ সমাবেশ করে। এদিনে গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসবাসরত ফিলিস্তিনিরা বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি ও মোমবাতি প্রজ্বলনের মাধ্যমে তাদের ইতিহাস স্মরণ করেন। এদিনে তারা ব্যাপকভাবে জলপাই গাছ রোপণ করেন, যা তাদের ঐতিহ্যের প্রতীক এবং ভূমির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। তবে ফিলিস্তিনিদের এ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ প্রায়শই ইসরায়েলি বাহিনীর কঠোর ও সহিংস বাধার সম্মুখীন হয়।

ইসরায়েল এখনো ভূমি দখল অব্যাহত রেখেছে

ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখলের প্রক্রিয়াটি আজও থেমে নেই। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইসরায়েল বিভিন্ন কৌশলে বিপুল পরিমাণ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিচ্ছে। কখনো সামরিক এলাকা ঘোষণা করে, আবার কখনো রাষ্ট্রীয় ভূমি হিসেবে নাম দিয়ে তারা একের পর এক এলাকা দখল করে চলেছে। বিশেষ করে, ২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা অধিকৃত পশ্চিম তীরে তাদের ক্ষমতা আরো বাড়ানোর লক্ষ্যে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ অনুমোদন করেছে। এ নতুন ব্যবস্থার ফলে ফিলিস্তিনিদের জমি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের কাছে বিক্রি করা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইসরায়েলের এ ভূমি দখলের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং অনেক রাষ্ট্র এ পদক্ষেপকে সরাসরি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পথে এক বড় অন্তরায় এবং 'ডি ফ্যাক্টো অ্যানেক্সেশন' বা কার্যত ভূখণ্ড দখল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা মনে করেন, এটি একটি পরিকল্পিত ও সরাসরি আক্রমণ, যা ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ এবং তাদের সার্বভৌমত্বের অস্তিত্বকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এ পদ্ধতিগত দখলদারিত্ব আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, কারণ এটি কেবল ভূমি নয় বরং একটি জাতির বাঁচার অধিকারকেও সংকুচিত করে তুলছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর পরবর্তী সময়ে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়াকে নজিরবিহীনভাবে ত্বরান্বিত করেছে। ইসরায়েলি বসতিবিরোধী সংগঠন 'পিস নাউ'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ১২ হাজার ৩৪৯টি এবং ২০২৪ সালে ৯ হাজার ৮৮৪টি আবাসন ইউনিটের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। তবে গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ২৭ হাজার ৯৪১টি নতুন আবাসন ইউনিটের অনুমোদন দেয় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। বসতি সম্প্রসারণের এ উগ্র রূপটি ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

গত ডিসেম্বরে ইসরায়েলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা অধিকৃত পশ্চিম তীরের ১৯টি অবৈধ বসতিকে বৈধতা দেয়ার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। মূলত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনি ভূমিতে নির্মিত এ ইহুদি জনপদগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ। বিস্ময়কর ও উদ্বেগের বিষয় হলো, নতুন অনুমোদিত এ বসতিগুলোর একটি বড় অংশই ফিলিস্তিনিদের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক চলাচল যেমন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ভূমি দখলের এ আগ্রাসী নীতি কেবল ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎকেও মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার উপক্রম করছে।

একই সময়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিযান, ঘরবাড়ি উচ্ছেদ এবং নির্বিচার গ্রেফতারের ঘটনা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে এবং তাদের সহায়-সম্পত্তির ওপর তাণ্ডব চালাচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের পরোক্ষ সমর্থনে এ অপরাধীরা সম্পূর্ণ দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে এ বসতি স্থাপনকারীদের হামলার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৮৫২টি হামলা রেকর্ড করা হলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮২৮টিতে—অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে অন্তত পাঁচটি করে হামলা সংঘটিত হচ্ছে।

জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সৈন্য এবং বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ১ হাজার ৯৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ধারাবাহিক সহিংসতা কেবল ফিলিস্তিনিদের জীবনকেই বিপন্ন করছে না, বরং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বসতি স্থাপনকারীদের এ ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কঠোর অবস্থান ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবনকে এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভূখণ্ড দখলের প্রক্রিয়াটি এখন কেবল আইনি মারপ্যাঁচে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রক্তক্ষয়ী এক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।

-আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার অবলম্বনে