নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারের হাল ধরলেন দেশটির সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি। এর মধ্য দিয়ে দেশটির প্রথম নারী সরকারপ্রধান হলেন তিনি। স্থানীয় সময় গতকাল রাত পৌনে ৯টায় প্রেসিডেন্টের দপ্তর শীতল নিবাসে এক অনুষ্ঠানে শপথ নেন তিনি। তাকে শপথবাক্য পাঠ করান প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল। তার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশটিতে নির্বাচন আয়োজন করা।
চলতি সপ্তাহে জেনারেশন জেড বা জেন-জিদের তীব্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি। হামলা-ভাংচুরের শিকার হয় সংসদ, সরকারি-বেসরকারি ভবন, মন্ত্রীদের বাড়িসহ নানা স্থাপনা। এর পর থেকে দেশটিতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হয় অচলাবস্থা। দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভের মধ্যে কে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হবেন তা নিয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল ও সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিগদেল।
ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন বলছে, প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল এবং সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিগদেলের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এ ঐকমত্যে পৌঁছানো গেছে। এতে আরো বলা হয়, সুশীলা কার্কির অধীনে একটি ছোট মন্ত্রিসভা করা হয়েছে। এ মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক গতকাল রাতেই অনুষ্ঠিত হয়।
নেপালের প্রবীণ আইন বিশেষজ্ঞ কার্কি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য জনপ্রিয়। তিনি নেপালের সুপ্রিম কোর্টের প্রথম এবং একমাত্র নারী প্রধান বিচারপতি ছিলেন। দুর্নীতির মামলায় এক মন্ত্রীর কারাদণ্ডসহ একাধিক ঐতিহাসিক রায়ের জন্য দেশটিতে ব্যাপক পরিচিত তিনি। ২০১৬ সালে নেপালের প্রথম নারী প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন কার্কি। সততা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য নির্ভীক বিচারক হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। ১৯৭৯ সালে বীরাটনগরে আইনজীবী হিসেবে তার পেশাজীবন শুরু হয়।
এরপর পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি পেয়ে ২০০৯ সালে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হন এবং পরবর্তী সময়ে ইতিহাস গড়েন। তার নিয়োগের সময়টি নেপালের জন্য প্রতীকী মুহূর্ত ছিল। কারণ সেই সময় নেপালের তিনটি সর্বোচ্চ পদ—রাষ্ট্রপতি, সংসদের স্পিকার ও প্রধান বিচারপতি—সবই নারীদের হাতে ছিল।
নেপালের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির দায়িত্ব পালনের সময় কার্কি বেশকিছু ঐতিহাসিক রায় দেন; যা তাকে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত করে তোলে। দুর্নীতির দায়ে দেশটির ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রী জয়া প্রকাশ গুপ্তকে দোষী সাব্যস্ত করেন তিনি। নেপালের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্ষমতাসীন কোনো মন্ত্রীকে দুর্নীতির মামলায় কারাগারে পাঠানোর ঘটনা ছিল এটি।
তিনি শান্তিরক্ষী মিশনে দুর্নীতি থেকে শুরু করে বিতর্কিত নিজগড় ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মামলার রায় ঘোষণা করেছিলেন। পাশাপাশি নারীদের সন্তানের নাগরিকত্ব দেয়ার অধিকার সম্পর্কিত প্রগতিশীল রায়ও দিয়েছেন তিনি।
সুশীলা কার্কি ১৯৭৫ সালে ভারতের বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় (বিএইচইউ) থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেন।
২০১৭ সালে কিছু রায়ের কারণে সরকারের বিরাগভাজনে পরিণত হন তিনি। সেই সময় ক্ষমতাসীন জোট দেশটির পার্লামেন্টে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপন করে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু বলছে, এ অভিশংসন প্রস্তাবে তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও নির্বাহী ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ আনা হয়েছিল। বিশেষ করে পুলিশপ্রধান নিয়োগসংক্রান্ত এক বিরোধের কারণে তিনি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন।










