মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পমাধ্যম ও জাদুঘরগুলো বড় ধরনের সঙ্কটের মুখে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ন্ত্রণ চেষ্টার পর শিল্পমাধ্যম এবং জাদুঘরগুলোকে টার্গেট করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল- জাদুঘরগুলোকে ‘শেষ বাকি থাকা ওয়োক প্রতিষ্ঠান’ বলে উল্লেখ করেন। এরপর বিভিন্ন প্রদর্শনী ও জাদুঘরে আসে নানা চাপ ও নির্দেশনা। ফলে দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেন্সরশিপের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। খবর সিএনএনের।

যুক্তরাষ্ট্রের সমকালীন চিত্রশিল্পী অ্যামি শেরাল্ড গত জুলাইয়ে ওয়াশিংটনের স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারিতে নিজের বড় প্রদর্শনী বাতিল করতে বাধ্য হন। এর কারণ, একটি ছবি কীভাবে প্রদর্শিত হবে তা নিয়ে কিউরেটরদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব। সেখানে স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ, ট্রান্সজেন্ডার নারী হিসেবে নতুনভাবে কল্পনা করে আঁকা হয়েছিল। শেরাল্ড এ ঘটনাকে শিল্পের উপর সেন্সরশিপ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরে এক নিবন্ধে তিনি লিখেন, ‘ফেডারেল অর্থায়নে পরিচালিত স্মিথসোনিয়ান গ্যালারিতে সেন্সরশিপ চাপ জায়গা করে নিয়েছে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে, যখন সরকার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আনুগত্য দাবি করে, তখন কী ঘটে।’

এর পরপরই ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী আদেশে বলা হয়, জাদুঘরগুলোকে আমেরিকান শ্রেষ্ঠত্ব উদযাপন করতে হবে। এর আওতায় প্রদর্শনী, শিল্পকর্ম বাছাই ও ভবিষ্যৎ আয়োজন সংক্রান্ত তথ্য প্রশাসনের হাতে জমা দিতে বলা হয়। ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারির পরিচালককেও পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। প্রশাসনের এসব চাপ ও চাহিদা সামলানোর জন্য প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে একটি বিশেষ টিম গঠন করেছে ।

আমেরিকান অ্যালায়েন্স অব মিউজিয়ামস (এএএম) ট্রাম্প প্রশাসনের এই হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের জাদুঘরগুলোর বিরুদ্ধে সেন্সরশিপের হুমকি বাড়ছে এবং বাইরের চাপ ক্রমেই জোড়ালো হচ্ছে, যাতে প্রদর্শনী বা কর্মসূচি পরিবর্তন, সীমিত বা পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়।

ক্রমবর্ধমান অস্বস্তি থাকা সত্ত্বেও, দেশটির জাদুঘর পরিচালকরা বেশিরভাগই নীরব। সিএনএন এ বিষয়ে এক ডজনেরও বেশি জাদুঘর পরিচালক ও শিল্পনেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো চুপচাপ। দৃষ্টি আকর্ষণ এড়িয়ে চলছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই প্রদর্শনী বা কর্মসূচি বাদ দিচ্ছে বা পরিবর্তন করছে। যেন সরকারের রোষানলে না পড়তে হয়। অধিকাংশই কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

তবে ‘লেসলাই লোহম্যান মিউজিয়াম অব আর্ট’ উল্টো পথে হাঁটছে। এই জাদুঘরের নির্বাহী পরিচালক অ্যালিসা নিচুন বলেন, ‘অনেক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি এড়িয়ে প্রদর্শনী বাতিল করছে। কিন্তু আমরা সেন্সরশিপের বিপরীতে দাঁড়াচ্ছি।’ প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি এমন এক প্রদর্শনী আয়োজন করেছে, যা ওয়াশিংটনের আরেক জাদুঘর কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বাতিল করেছিল।

একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা

গত আগস্টের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প জগতের পেশাজীবীরা একত্রিত হয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। সেখানে বলা হয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক চাপ থেকে স্বাধীন থাকতে হবে। এই বিবৃতিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫০টি শিল্প-সংগঠন ও শত শত ব্যক্তি স্বাক্ষর করেছেন। তবে বড় জাদুঘরগুলো এতে অনুপস্থিত। মূলত স্বাক্ষর এসেছে আর্টস সেন্টার, সংগঠন এবং আঞ্চলিক কাউন্সিল থেকে।

নিউ স্কুলের ভেরা লিস্ট সেন্টার ফর আর্ট অ্যান্ড পলিটিকস-এর সিনিয়র ডিরেক্টর ক্যারিন কুওনি বলেন ‘এটি আসলে একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা।’ তিনি বড় জাদুঘরগুলো স্বাক্ষর না করায় হতাশা প্রকাশ করেন, তবে একই সঙ্গে এর বিস্তৃত ভৌগোলিক উপস্থিতির দিকেও ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি অঙ্গরাজ্য ও শহরেই একজন না একজন স্বাক্ষরকারী আছেন। পুরো দেশ এই বিবৃতির পাশে দাঁড়িয়েছে—এটি সত্যিই বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ।’