ভয়াবহ সংকটে পুরো মিয়ানমার। ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে বিপর্যয়ের একদম তলানিতে নিয়ে গেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে জান্তা সেনাদের সঙ্গে বিদ্রোহীদের সংঘর্ষের কারণে। এ পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ সরবরাহ এগিয়ে নিতে বিদ্রোহীরা সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও তাতে রাজি হয়নি জান্তা সরকার। বরং প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

এর মধ্যে ভূমিকম্পের পাঁচদিন পেরিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় কাজ করছে উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয়রা। সরকারি তথ্য বলছে, গতকাল সকাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৮৬-এ। আহত ৪ হাজার ৬৩৯, এখনো নিখোঁজ রয়েছে অন্তত ৩৭৩ জন। মৃতের সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিস্তৃত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ সরবরাহকারী দলগুলোর কাছে কাজের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জান্তা সেনার সঙ্গে বিদ্রোহীদের সংঘাত। গত রাতে ত্রাণ বহনকারী গাড়িতে গুলির ঘটনাও ঘটেছে।

ঠিক এমন সময় উদ্ধারকাজে সহযোগিতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়া দেশটির জাতিগত সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর জোট থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স জানিয়েছে, উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য তারা এক মাসের যুদ্ধবিরতিতে যাচ্ছে। এ সময়ে কোনো হামলা চালানো হবে না। শুধু নিজেদের প্রতিরক্ষায় কাজ করা হবে।

তবে তাদের এ আহ্বানে সাড়া দেয়নি জান্তা সরকার। দেশটির শীর্ষ জেনারেল মিন অং হ্লাইং বলেছেন, ‘কিছু জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী বর্তমানে সক্রিয়ভাবে লড়াইয়ে জড়িত নয়, তবে তারা আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে একত্রিত হচ্ছে ও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এটি তাদের আগ্রাসনের অংশ হওয়ায় সামরিক বাহিনী প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা অভিযান চালিয়ে যাবে।’

এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিতদের উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে। ধংসাবশেষের নিচ থেকে একের পর এক বের করা হচ্ছে মরদেহ। তবে খুব কমসংখ্যক হলেও এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে পাওয়া যাচ্ছে জীবিতদের। আর যারা বেঁচে গেছেন, তারাও এখন চরম মানবিক সংকটের সম্মুখীন।

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকে অধিকাংশ সময়জুড়ে গৃহযুদ্ধের মধ্যে থাকা মিয়ানমার দশকের পর দশক ধরেই জর্জরিত বিভিন্ন সংকটে। শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর সেই সংকট আরো জটিল হয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, দেশটির ছয় অঞ্চলের ২ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি মানুষ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাবার, আশ্রয় কিংবা অর্থ কোনোটিই নেই তাদের কাছে। দ্রুত বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির কারণে অনেকের পক্ষেই খাবার কেনা অসাধ্য হয়ে উঠেছে।

অনুদানের ঘোষণা এডিবির

মিয়ানমারের বাসিন্দাদের মানবিক সহায়তা দিতে একে একে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ, চীন, মালয়েশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ। বিভিন্ন দেশ উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসক, খাবার, চিকিৎসা সরঞ্জাম, তাঁবু পাঠিয়েছে দেশটিতে।

সেই ধারাবাহিকতায় আজ ৩০ লাখ ডলার অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে এডিবি। শিগগিরই এ অনুদান ছাড় করা হবে, যা জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) মাধ্যমে পৌঁছাবে সেখানকার সাধারণ মানুষের কাছে। এ অর্থ দিয়ে খাদ্যসামগ্রী, পানীয় জল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আশ্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা হবে। নগদ সহায়তার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণ করাই এ অনুদানের লক্ষ্য।

এখনো পাওয়া যাচ্ছে জীবিতদের

ভূমিকম্পের ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হলেও এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিতদের উদ্ধার করা হচ্ছে। বুধবার ভোরে মিয়ানমারের রাজধানীতে একটি হোটেলের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধারকারীরা দুই ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করেছে।

তবে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পাঁচদিন পর বেশির ভাগ দল কেবল মৃতদেহ উদ্ধার করছে এবং উদ্বেগ বাড়ছে যে প্রতিরোধ বাহিনীর ওপর চলমান সামরিক আক্রমণ ত্রাণ প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে।

নেপিদোতে দুর্ঘটনার ১০৮ ঘণ্টা পর একজনকে জীবিত উদ্ধার করেছে তুর্কি এবং স্থানীয় উদ্ধারকারীদের একটি দল। একটি এন্ডোস্কোপিক ক্যামেরা ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত হোটেলের নিচতলায় নাইং লিন টুন নামে এক ব্যক্তিকে খুঁজে পান তারা। এটি এক সময় ওই ব্যক্তির অফিস ছিল। ধসে পড়া মেঝেতে ছিদ্র করে সেখান দিয়ে সাবধানে টেনে বের করে আনা হয় তাকে।

স্থানীয় দমকল বিভাগ প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বের করে আনার সময় ২৬ বছর বয়সের ওই যুবক ছিল শার্টবিহীন, দুর্বল ও ধুলোয় ঢাকা। ১২১ ঘণ্টারও বেশি সময় পর একই ভবন থেকে ২৬ বছর বয়সী আরেকজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের কাছে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল সাগাইং টাউনশিপে একটি ধসে পড়া বাড়ি থেকে একজনকে উদ্ধার করেছে মালয়েশিয়ান এবং স্থানীয় একটি উদ্ধারকারী দল।